ধর্ষণ, র‌্যাগিং ও গরুভোজ

খায়রুল আনোয়ার
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ২৩: ২৬
ধর্ষণ, র‌্যাগিং ও গরুভোজ। লেখক: খায়রুল আনোয়ার। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম
ধর্ষণ, র‌্যাগিং ও গরুভোজ। লেখক: খায়রুল আনোয়ার। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

দেশের বিভিন্ন শহর, মফস্বল বা গ্রামের কিছু মাদরাসা মাঝেমধ্যেই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। তবে ভালো খবরের জন্য নয়, এসব শিরোনাম হচ্ছে একেবারে নেতিবাচক খবর নিয়ে। কিছু শিক্ষকের দুষ্কর্ম মাদ্রাসাকে শিরোনামে নিয়ে আসছে। বালকের ওপর বলাৎকার, ছাত্রীকে ধর্ষণ অথবা ধর্ষণ চেষ্টা মাদরাসাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

চলমান পরিস্থিতি বলছে, মাদরাসায় ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগিংয়ের ঘটনা গুরুতর মাত্রায় পৌঁছেছে। র‌্যাগিংয়ের শিকার অনেক ছাত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তবে র‌্যাগিংয়ের ঘটনা গণমাধ্যমে খবর হয় কম। ফলে বিষয়টি অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়।

যৌন-নিপীড়ন ও র‌্যাগিং যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না, তেমনি দুর্গাপূজার সময়কে বেছে নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজের আয়োজনও এক শ্রেণির শিক্ষার্থীর উসকানিমূলক তৎপরতা বৈকি।

মাদরাসায় যৌন হয়রানি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ তা স্পষ্ট হবে। পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের নূরানী মহিলা মাদরাসার এক শিক্ষক গভীর রাতে এক ছাত্রীকে জোর করে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। ছাত্রীটি কৌশলে মাদরাসার ওই কক্ষ থেকে বেরিয়ে স্থানীয়দের ঘটনা জানায়। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ লোকজন মাদরাসায় ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযুক্ত শিক্ষক মাদরাসাটির পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত।

গাজীপুর সদরের একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসার ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষকসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মাদরাসার স্টোর রুমে নিয়ে দুই রাত শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। এখানেও মাদরাসার অভিযুক্ত শিক্ষক ছাড়াও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি ছিলেন।

অন্য একটি মাদরাসায় ছয় বছরের ছাত্রকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বলাৎকার করা হয়। শিশুটিকে ভয় দেখিয়ে ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বিষয়টি চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়।

টঙ্গীর আউচপাড়ায় ক্বারিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার এক শিক্ষকের যৌন নিপীড়নের শিকার সাত বছরের এক ছাত্রী। মাদরাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত শিক্ষককে ভুক্তভোগী ছাত্রীর অভিভাবকের থাপ্পড় মারার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এসব ঘটনা শুধু এক মাসে (অক্টোবর) বিভিন্ন মাদরাসায় ঘটেছে (দৈনিক সমকাল)। বিভিন্ন মাদরাসায় মাঝেমধ্যেই ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি সালিশের মাধ্যমে ঘটনার নিষ্পত্তি করেন। এর মাধ্যমে গুরুতর অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। দুর্বল অভিভাবকরা প্রভাবশালী ব্যক্তির সালিশ মেনে নিতে বাধ্য হন।

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, দেশের মাদরাসা শিক্ষা আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে নগরে, শহরে এবং গ্রামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মাদরাসার লেখাপড়ার বিষয়টি অজানাই থেকে যাচ্ছে। রাজধানীর চারপাশে ও ভেতরে এ ধরনের মাদরাসার সংখ্যা যে কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও জানা নেই— এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়!

শুধু মোহাম্মদপুরের একটি ওয়ার্ডেই ৭৯টি মাদরাসা গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল প্রতিবেদন প্রচার করেছে। অথচ বিপরীত ওই এলাকার স্কুলের সংখ্যা অর্ধেক। গাজীপুর, উত্তরা, উত্তর খান, দক্ষিণ খান, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, বাড্ডাসহ অলিগলি সবখানেই মাদরাসার নাম ফলক।

রাজধানীর অভিজাত কয়েকটি এলাকা বাদ দিলে যত্রতত্র চোখে পড়বে এসব মাদরাসা। একটু দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, অনেক জায়গায় গলির ভেতরে মাত্র ২/৪টি রুম নিয়ে এ ধরনের মাদরাসা গড়ে উঠেছে। এসব মাদরাসার অধিকাংশ রুম অন্ধকার ও স্যাঁতস্যাঁতে। কারা এসব মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কী পড়ানো হয়, লেখাপড়ার মান কেমন Ñ এসব বিষয়ে কর্তাব্যক্তিদের জানা আছে বলে মনে হয় না।

মাদরাসা শিক্ষার সুস্পষ্ট নীতিমালা, নিবন্ধন ছাড়া কোনো মাদরাসা গড়ে উঠতে না দেওয়া, শিক্ষকদের যোগ্যতা নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও জবাবদিহিতা মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে যৌন হয়রানির জন্য দায়ী শিক্ষক ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ও বলাৎকার বন্ধ করা সম্ভব হবে।

এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে বলা যাক। সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে গবেষণার তথ্য উদ্বৃত্ত করে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুতর মাত্রায় র‌্যাগিংয়ের শিকার ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। গবেষণা তথ্য বলছে, জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭৪ শতাংশ কখনো না কখনো র‌্যাগিং বা বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

গবেষণায় কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন— বনভোজনের কথা বলে নবীন ছাত্রীদের একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে সিনিয়র ছাত্রীরা অহেতুক ধমক দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চতুষ্পদ প্রাণীর মতো ডাক দিতে বলেন। একপর্যায়ে একজন ছাত্রীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা ওই গবেষণা র‌্যাগিং বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিয়েছেন ৯ হাজার ৪৭৪ জন। এর মধ্যে সাত হাজার ১১ জনেরই ছিল তিক্ত অভিজ্ঞতা। তাদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতরের র‌্যাগিংয়ের কথা জানিয়েছেন। গবেষণা উত্তরদাতাদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন চার হাজার ৯৮৫ জন অর্থাৎ ৭১ দশমিক ১ শতাংশ। নারী দুই হাজার ২৬ জন বা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। নারীদের মধ্যে গুরুতর বুলিং বেশি।

যৌন হয়রানির পাশাপাশি শারীরিক হয়রানি, সাইবার বুলিং, চেহারা বা শরীরের গঠন নিয়ে উপহাস বা বিদ্রুপ করার কথা জানিয়েছেন অনেকে। তাছাড়া ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ, সংখ্যালঘু পরিচয় বা ধর্মীয় কারণে র‌্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন গবেষণার উত্তর দেওয়া শিক্ষার্থীরা।

ভুক্তভোগী ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকে একবার-দুইবার নয় অসংখ্যবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। এদের কেউ কেউ ছয় মাস ধরে, আবার অনেকে এক বছর ধরে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

র‌্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা উদ্বেগের মধ্যে থাকেন। অনেকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। শুধু তাই নয়, গুরুতর বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফল করেন, যার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। শিক্ষাগত ফল খারাপ হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।

‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের র‌্যাগিং: মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণাটিতে দেশের ৫৭ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৮ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়েত হোসেন এই গবেষণা নেতৃত্ব দেন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিং নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনো কখনো এটি অতিমাত্রায় হয়ে থাকে। এই গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর র‌্যাগিংয়ের শিকার, সংখ্যাটিকে ভয়াবহই বলতে হবে। গবেষণায় উঠে এসেছে, র‌্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। কেউ কেউ এই চাপ নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এদিকে র‌্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর প্রতিকারও পান না। অনেকে আরও মানসিক নির্যাতনের শঙ্কায় কর্তৃপক্ষকে কোনো অভিযোগ না করে র‌্যাগিং সহ্য করার চেষ্টা করেন। আর অভিযোগ জানালেও অভিযুক্তদের নামমাত্র শাস্তি দেওয়ার ঘটনাই বেশি।

এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষকে স্থায়ীভাবে র‌্যাগিং বন্ধের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। বিদ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা বা আচরণবিধি যথেষ্ট কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। র‌্যাগিংয়ের শিকার যে সব শিক্ষার্থী আরও অপমানের ভয়ে মুখ খুলতে চান না, তারা কীভাবে প্রতিকার পাবেন, সেই উপায়ও ভেবে দেখতে হবে।

মাদরাসায় ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগিংয়ের পাশাপাশি সম্প্রতি আরেকটি ঘটনা গণমাধ্যমে খবর হয়ে বেশ সমালোচনার জন্ম দেয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর দুদিন গরুভোজের আয়োজন করা হয়। সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে।

প্রথম দিন ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ নামে কর্মসূচির আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু), যার নেতৃত্বস্থানীয়দের অধিকাংশই ছাত্র শিবিরের নেতা। পরদিন খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গরুভোজ ও কাওয়ালি সন্ধ্যা আয়োজন করে।

দুর্গাপূজার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজের আয়োজন যে উদ্দেশ্যমূলক, তা সহজেই অনুমান করা যায়। সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হয়েও যদি মনমানসিকতায় সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনার উর্ধ্বে ওঠা না যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার মূল্য কোথায় থাকে?

এ প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটিয়ে মারার একাধিক ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক উৎসব, বিতর্ক প্রতিযোগিতার খবর তেমন আর আসে না। এর জায়গায় স্থান করে নিয়েছে মাদরাসায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগিং, উদ্দেশ্যমূলক গরুভোজ, পিটিয়ে হত্যার মতো অমানবিক ঘটনা।

সুষ্ঠু ছাত্র রাজনীতির চর্চাও অনুপস্থিত। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়— সহসা এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে, এমনটি মনে করার বাস্তব কোনো কারণ নেই।

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad