গত ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা। বিশ্বের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব ও আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৫ হাজারের বেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এ সভায় অংশ নেন। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সভায় যোগ দেয়।
বিশ্ব জুড়ে চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য উত্তেজনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর নীতি প্রণয়ন ছিল এই বার্ষিক সভার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বাড়তে থাকা ঋণের চাপ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এবারের সভায় আলোচনা হয়েছে।
সভা চলাকালে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নতুন ঋণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত নীতিগত শর্ত নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় বিভিন্ন খাতের সংস্কার গুরুত্ব পায়।
আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণসহায়তা প্যাকেজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও চূড়ান্ত পর্যায়ের দরকষাকষি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরেই এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ঋণ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজেট-পরবর্তী অগ্রগতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে নতুন ঋণ নিতে হলে বাংলাদেশকে সংস্থাটির শর্ত পূরণ করতে হবে। সরকার জানিয়েছে, এসব শর্ত পূরণে সংস্কার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল আর্থিক খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
আইএমএফের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আলোচনায় উঠে আসা সংস্কারের বিষয়গুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইএমএফের ঋণসহায়তার পাশাপাশি এবারের বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সভার একটি বিশেষ অধিবেশনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি সম্প্রসারণ এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান অবস্থা থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে ঋণ নিতে হলে শর্ত থাকবে এবং সেগুলো পূরণ করতে হবে। কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষকে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত, কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশেরও সম্মতি আছে। এরই মধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল দেশের শিল্প খাতের বিকাশ, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে কীভাবে এই বড় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব, তা বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরে।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের অবস্থান
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সংস্কার কৌশলের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করছে। এতে দেশের পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস সাধারণত কিছুটা সংরক্ষণশীল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয় বলে মনে করে আইএমএফ। এর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি।
আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কারও প্রয়োজন। বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতি— এই তিন ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, আর্থিক খাতের সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল প্রয়োজন। কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা না গেলে টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।
রাজস্ব আয় বাড়ানোও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি। উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি করব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আইএমএফের কর্মকর্তারা জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ নতুন কর্মসূচির জন্য অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে।
ওই সফরে আলোচিত সংস্কারগুলোর সঙ্গে চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশগুলোর ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য রয়েছে। জুলাইয়ের সফরের পর থেকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে সংস্থাটি আগ্রহী।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সম্ভাব্য ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা নিয়ে অগ্রগতির কথা জানা যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং পরবর্তী সময়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ নিয়ে আগাম আশাবাদী হওয়ার চেয়ে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা ও ব্যবহারের ক্ষেত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা জরুরি।
ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হলে এবং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির প্রয়োজনীয় সংস্কারে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া সম্ভব। তবে ঋণ নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণ জনগোষ্ঠী: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বিপুলসংখ্যক তরুণের এই জনমিতিক সুবিধা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চাপে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এ অবস্থান তুলে ধরেন। আইএমএফ জানায়, উন্নত অর্থনীতি ও কয়েকটি উদীয়মান দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। এসব অঞ্চলে জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ হওয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথাযথ বিনিয়োগ প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অঞ্চলে ৩৪ কোটির বেশি কিশোর-কিশোরী এবং ২৪ বছরের কম বয়সী ৭০ কোটির বেশি মানুষ রয়েছে।
বাংলাদেশেও তরুণ জনগোষ্ঠীর আকার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রায় চার কোটি ৬০ লাখ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।
এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি না হলে এই জনমিতিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
আইএমএফ বলেছে, তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে এমন দেশগুলোকে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
শুধু নির্দিষ্ট কিছু চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে কর্মীদের নতুন কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। এ জন্য শ্রমবাজার আধুনিক করা, শ্রমশক্তিতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কাজের প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মতে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময় কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারেন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।
টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রাণবন্ত বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এ খাতের বিকাশে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সুশাসন শক্তিশালী করা এবং অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি কার্যকর করব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতিতে নতুন শিল্প ও ব্যবসার বিকাশ, উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। তাই তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের দ্রুত বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে পরিবর্তন আনতে পারে এবং আয়বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
প্রযুক্তির সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি এমন নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে, যেন প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল সমাজের বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজে লাগে। অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই হবে না, এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া সুযোগ যেন নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আইএমএফ সরকারগুলোকে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক খাতে ব্যয় সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তর করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী নয়, বরং তাদের মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। তা না হলে এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশের সামনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ঋণদাতার শর্ত পূরণ করা। দ্বিতীয়ত, দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করা।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটানো এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর অগ্রগতি দেখাতে হবে।
সম্মেলনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও তা ধরে রাখতে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যুদ্ধের কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, ঋণের চাপ ও এআইয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রভাব সামলাতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঋণসহায়তার সাফল্য বিচার করতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাবের ভিত্তিতে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসার এবং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে ঋণ কতটা অবদান রাখছে, তা হিসাব করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েও অর্থনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব হবে না।
সম্ভাব্য ঋণের প্রতিটি টাকা যেন জনস্বার্থে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে। এ জন্য ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রস্তুতি থাকতে হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে।
বিদেশি ঋণ অর্থনীতিকে সাময়িক সহায়তা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে হবে।
তাই ব্যাংককের সম্মেলনে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে অর্থনীতির ভিত শক্ত করা। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে এসব সংস্কারের সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঋণের শর্ত পূরণে সরকার ধাপে ধাপে এগোতে চায়। সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও অঙ্গীকারের সঙ্গে সংস্কারের সমন্বয় করা প্রয়োজন।
তবে সংস্কার হতে হবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে। শুধু ঋণদাতার শর্ত পূরণ করাই সংস্কার নয়।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ
























