প্যারিস কি আসলেই মুসলিম শহর হয়ে যাচ্ছে?

প্যারিস কি সত্যিই মুসলিম শহরে পরিণত হতে যাচ্ছে? নাকি বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও বহুত্ববাদী নগরীকে ঘিরে নতুন করে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। গত ১৯ অক্টোবর হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেছেন, প্যারিস খুব শিগগিরই একটি মুসলিম শহরে পরিণত হবে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতার জন্যও তিনি দেশটির অভিবাসননীতিকে দায়ী করেছেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য কেবল একটি শহরের ভবিষ্যৎ জনমিতি সম্পর্কে মন্তব্য নয়, এর মধ্যে অভিবাসী জনগোষ্ঠী, বিশেষত মুসলমানদের প্রতি তার দীর্ঘদিনের সন্দেহপ্রবণ ও বৈরী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা যেন এমন— একটি শহরে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই সেই শহরের পরিচয়, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হওয়া।
কিন্তু ইতিহাস, জনমিতিক গবেষণা ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা কি এমন ধারণাকে সমর্থন করে? উত্তর খুঁজতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের আবেগ থেকে বেরিয়ে ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে।
অভিবাসীদের শ্রমে গড়ে ওঠা আধুনিক ফ্রান্স
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত ইউরোপের পুনর্গঠনে অভিবাসী শ্রমিকদের অবদান ছিল অপরিসীম। ফ্রান্সও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে দেশটির শিল্পকারখানা, নির্মাণ খাত, পরিবহনব্যবস্থা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন হয়েছিল। সেই প্রয়োজন মেটাতে আলজেরিয়া, মরক্কো ও তিউনিসিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য শ্রমিক ফ্রান্সে আসেন।
এসব শ্রমিকের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন মুসলমান। তারা ফরাসি অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে শ্রম দিয়েছেন, শিল্পায়নে অবদান রেখেছেন এবং আধুনিক ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণে অংশ নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে পরিবার পুনর্মিলন, স্থায়ী বসবাস এবং নতুন প্রজন্মের জন্মের মধ্য দিয়ে তাদের অনেক পরিবার ফরাসি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।
এখানে একটি ঐতিহাসিক সত্য স্মরণ করা প্রয়োজন। উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক কেবল অভিবাসনের নয়; ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিশেষত ১৯৬২ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগে আলজেরিয়া দীর্ঘকাল ফরাসি শাসনের অধীনে ছিল। কাজেই উত্তর আফ্রিকার মানুষের ফ্রান্সে আগমনকে দেশটির ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
যে অভিবাসীদের শ্রম একসময় ফরাসি অর্থনীতির প্রয়োজন মিটিয়েছে, তাদের উত্তরসূরিদের আজ ফ্রান্সের জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসের প্রতি চরম অবিচার।
প্যারিসে মুসলিম জনসংখ্যার প্রক্ষেপণ নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে?
ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো— এতে জনমিতিক পরিবর্তনের বাস্তব চিত্রের পরিবর্তে আশঙ্কাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১৭ সালে প্রকাশিত ইউরোপ’স গ্রোয়িং মুসলিম পপুলেশন গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৫৭ লাখ, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
একই গবেষণায় ২০৫০ সালের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। নতুন অভিবাসন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। নিয়মিত অভিবাসন অব্যাহত থাকলে তা প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং উচ্চ অভিবাসনের পরিস্থিতিতে প্রায় ১৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ, সবচেয়ে উচ্চ অভিবাসনের পরিস্থিতিতেও গবেষণাটি ২০৫০ সালে ফ্রান্সের মুসলিম জনসংখ্যাকে মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের নিচে দেখিয়েছে। এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং নির্দিষ্ট অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি একটি জনমিতিক প্রক্ষেপণ।
ফ্রান্সের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা আইএনএসইই ও জনমিতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএনইডির ২০১৯-২০২০ সালের যৌথ জরিপেও দেখা যায়, দেশটির মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষের প্রায় ১০ শতাংশ নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান অবশ্য সমগ্র জনসংখ্যার নয়, নির্দিষ্ট বয়সসীমার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এসব গবেষণা থেকে প্যারিস শহর অদূর ভবিষ্যতে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে— এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সমগ্র ফ্রান্সের জনমিতিক প্রক্ষেপণকে প্যারিসের ভবিষ্যৎ হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে— নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান যেখানে এমন আশঙ্কাকে সমর্থন করছে না, সেখানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কেন এমন বক্তব্য দিচ্ছেন?
মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি কি কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস?
ট্রাম্পের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো— একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বৃদ্ধিকে তিনি নেতিবাচক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু একটি শহরে মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইহুদি, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা ধর্মহীন মানুষের অনুপাত পরিবর্তিত হলে সেটি নিজে কোনো সামাজিক বিপর্যয়ের প্রমাণ নয়। জনসংখ্যার ধর্মীয় বৈচিত্র্য এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দুটি ভিন্ন বিষয়।
একটি শহরের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক সংহতির ওপর। নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নয়।
প্যারিসের পরিচয়ও কোনো একক ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই শহর ইউরোপীয় সভ্যতা, ফরাসি বিপ্লব, মানবাধিকার, শিল্প-সাহিত্য এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। প্যারিসে বসবাসকারী একজন মুসলমান যেমন শহরটির নাগরিক জীবনের অংশ, তেমনি একজন খ্রিষ্টান, ইহুদি কিংবা ধর্মহীন মানুষও তার অংশ।
ফরাসি সমাজের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত— কীভাবে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ সমান অধিকার, দায়িত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বসবাস করতে পারে। কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের সংখ্যা কতটা বাড়ছে, সেটিকে আতঙ্কের বিষয় বানানো নয়।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে ট্রাম্প যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। অভিবাসন যেকোনো দেশের জন্য নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। অভিবাসননীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ বৈধ।
কিন্তু কোনো দেশে বিক্ষোভ, ভাঙচুর বা অপরাধ সংঘটিত হলেই তার জন্য অভিবাসী কিংবা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নয়।
ফ্রান্সের সামাজিক অস্থিরতার পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের মতো নানা বিষয় থাকতে পারে। এসব সমস্যার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও তদন্ত প্রয়োজন।
একজন অপরাধীর পরিচয় দিয়ে একটি গোটা জনগোষ্ঠীকে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি একটি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয়কে অপরাধের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উপস্থাপন করাও বিপজ্জনক। এই ধরনের বক্তব্য সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায়। একই সঙ্গে তা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে দুর্বল করে এবং চরমপন্থী শক্তিগুলোর বিভাজনমূলক প্রচারণাকে উৎসাহিত করতে পারে।
অভিবাসীবিরোধী রাজনীতির পুরোনো কৌশল
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যে অভিবাসন দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং অভিবাসনকে কেন্দ্র করে তিনি জনমত সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন।
রাষ্ট্রের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। অভিবাসননীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয় ও সন্দেহ তৈরি করা এক বিষয় নয়। ট্রাম্পের বক্তব্যে প্রায়ই এই দুটি বিষয় একাকার হয়ে যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানে সামনে আসে— কোনো শহরে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে কেন রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হবে? মুসলমানেরা কি স্বাভাবিক নাগরিক জীবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক উন্নয়নে অংশ নিতে পারেন না?
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি জনগোষ্ঠীর নাগরিক অবদানকে আড়াল করে শুধু তাদের সংখ্যাগত বৃদ্ধিকে সামনে আনা যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আর এই আবেগ যখন ভয় ও বিদ্বেষের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় পরিচয় নয়, নাগরিকত্বই আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ধারণা হলো, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান। একজন মানুষের ধর্ম, বর্ণ কিংবা পারিবারিক উৎস তার নাগরিক অধিকারের মানদণ্ড হতে পারে না। ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় আদর্শ— স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব— এই নীতিরই প্রতিফলন। ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে নিজস্ব নীতিগত কাঠামো তৈরি করেছে। এই কাঠামো নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের নাগরিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়।
প্যারিসে একজন মুসলমানের উপস্থিতি যেমন ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক পরিচয়ের বিরোধী নয়, তেমনি একজন খ্রিষ্টান বা ধর্মহীন মানুষের উপস্থিতিও নয়। বরং একটি বহুত্ববাদী সমাজে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবার জন্য সমান সুযোগ, নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা। ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিক দায়িত্ব, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক সংহতিকে গুরুত্ব দেওয়াই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তি।
জনসংখ্যার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রক্রিয়া। জন্মহার, মৃত্যুহার, অভিবাসন, নগরায়ণ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অনুপাত সময়ের সঙ্গে বদলায়। মুসলিম জনসংখ্যার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক মানুষ পরবর্তী জীবনে একই মাত্রায় ধর্মীয় অনুশীলন করবে— বিষয়টা এমন না। অনেকে ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখেন, কেউ ভিন্নভাবে ধর্ম পালন করেন, আবার কেউ ধর্মহীন পরিচয় গ্রহণ করেন। ফ্রান্সের আইএনইডির গবেষণাতেও অভিবাসী বংশোদ্ভূত নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ধর্মীয় পরিচয়কে কেবল পূর্বপুরুষের উৎস বা বর্তমান জন্মহারের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না।
প্যারিসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শহরের আবাসনব্যয়, নগরায়ণ, শহরতলিতে স্থানান্তর, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের পরিবর্তন ভবিষ্যৎ জনমিতিকে প্রভাবিত করবে। সুতরাং প্যারিসের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দায়িত্বশীল আলোচনা করতে হলে অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, মানবপাচার, অবৈধ শ্রমবাজার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি কিংবা সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ— এসব বাস্তব নীতিগত সমস্যা হতে পারে। এসব মোকাবিলায় কার্যকর আইন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা সমাধানের প্রথম শর্ত হলো সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা।
অভিবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখা সমস্যার সমাধান নয়। বরং এতে প্রকৃত নীতিগত চ্যালেঞ্জ আড়াল হয়ে যায়। একইভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যের প্রতিবাদ করার অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বেআইনি কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়। অপরাধের বিচার হবে আইনের ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। এই নীতিই একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি হওয়া উচিত।
প্যারিসের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের আতঙ্ক কেন অমূলক?
ট্রাম্পের বক্তব্যে মনে হতে পারে, প্যারিসের মুসলিম জনসংখ্যা এমন গতিতে বাড়ছে যে অল্প সময়ের মধ্যেই শহরটি তার ঐতিহাসিক পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু জনমিতিক গবেষণা এমন সিদ্ধান্ত সমর্থন করে না।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালেও সমগ্র ফ্রান্সে মুসলিমরা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে প্যারিস শহরের জন্য এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত ধর্মভিত্তিক পূর্বাভাস নেই, যার ভিত্তিতে বলা যায় শহরটি শিগগিরই মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে।
অবশ্য জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান দিয়ে প্যারিসের স্থানীয় জনমিতি পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় বৈচিত্র্যকে পুরো শহরের ভবিষ্যৎ হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ট্রাম্পের বক্তব্যকে তথ্যসমর্থিত পূর্বাভাসের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একটি অতিরঞ্জিত আশঙ্কা হিসেবে মূল্যায়ন করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
শেষ কথা
প্যারিস কেবল ফরাসিদের ঐতিহাসিক রাজধানী নয়, এটি বিশ্বসভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের অবদানে শহরটির বর্তমান পরিচয় গড়ে উঠেছে। প্যারিসের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তার নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংহতির মাধ্যমে। কোনো একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগত উপস্থিতি দিয়ে নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতার কাছ থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্বশীল বক্তব্য, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ মুসলমানদের সংখ্যাগত বৃদ্ধিকে আতঙ্কের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— অভিবাসীরা শুধু নতুন দেশে আশ্রয় নেন না; তারা শ্রম, জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে সেই দেশকে সমৃদ্ধও করেন। ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাসেও তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
তাই প্রশ্নটি প্যারিস মুসলিম শহরে পরিণত হবে কি না, শুধু সেটি নয়। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো— আমরা কি এমন একটি পৃথিবী চাই, যেখানে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় তার নাগরিক মর্যাদাকে নির্ধারণ করবে? নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ সমান অধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বসবাস করবে?
প্যারিসের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের অধিকার সবার আছে। কিন্তু সেই উদ্বেগকে ধর্মীয় বিদ্বেষের হাতিয়ারে পরিণত করার অধিকার কারও নেই। প্যারিসের পরিচয় তার মানুষের বহুত্বে, কোনো একটি ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা সংখ্যালঘুত্বে নয়। মুসলমানের উপস্থিতি প্যারিসের জন্য হুমকি নয়; বরং ধর্মীয় বিদ্বেষ, বৈষম্য এবং বিভাজনের রাজনীতিই তার মানবিক ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জন্য প্রকৃত হুমকি।
লেখক: কলামিস্ট ও গল্পকার



-10b8d5.jpg)
-a70378.jpg)
















