কেন রাজপথে নামছে ইউরোপের মানুষ?

কেন রাজপথে নামছে ইউরোপের মানুষ? লেখক: মো. কাফি খান। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম
কেন রাজপথে নামছে ইউরোপের মানুষ? লেখক: মো. কাফি খান। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

গত ২০ অক্টোবর জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম— ‘জনরোষে পুড়ছে ইউরোপ!’

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সে সহিংস আন্দোলনের শুরু, সেখানকার আন্দোলনের ‘আগুন’ ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ফ্রান্সের পাশাপাশি বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায়।

গত ১৭ অক্টোবর আল জাজিরা জানায়, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতে বিক্ষোভ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বেগবান হতে পারে।

অ্যাথেন্সে শিক্ষার্থীরা পার্লামেন্টের সামনের একটি চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে আবাসন ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এনেছেন। লিসবনে আবাসন অধিকার কর্মীরা দুটি কেন্দ্রীয় চত্বরে শিবির গড়ে তুলেছিলেন। পরে পুলিশ সেগুলো সরিয়ে দেয় এবং ৫৫ জনকে আটক করে। দক্ষিণ ইতালিতে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের প্রতিবাদে ট্রাকচালকরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে খাদ্য উৎপাদক ও দোকানগুলোতে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়।

এসব ঘটনা দেখায়, ভিন্ন ভিন্ন চাপ মানুষকে প্রতিবাদে নামাতে পারে। সেই প্রতিবাদের প্রভাব আন্দোলনে অংশ না নেওয়া মানুষের জীবনেও পড়তে পারে। তবে এসব ঘটনা থেকে বলা যায় না যে ইউরোপ জুড়ে একই কারণকে কেন্দ্র করে একটি অভিন্ন আন্দোলন চলছে।

ফ্রান্সের অস্থিরতা ছিল সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ধ্বংসাত্মক। শিক্ষকের স্বল্পতা ও বিদ্যালয়গুলোর খারাপ অবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষে বিস্তৃত হয়। ১৭ অক্টোবর কয়েকটি শহরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিমোজ শহরের একটি ঐতিহাসিক নগর ভবন আগুনে ধ্বংস হয়।

কর্তৃপক্ষ জানায়, দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে আটকের সংখ্যাও পরিবর্তিত হয়েছে। এসব সংখ্যা অস্থিরতার ব্যাপ্তি বোঝালেও প্রত্যেক ব্যক্তি কেন বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন বা তাদের সবার দাবি কী ছিল, তা ব্যাখ্যা করে না।

ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রাথমিক দাবিগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শিক্ষকসংকট এবং জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিবাদ করেন। সরকার জানায়, বর্তমানে কর্মরত নন— এমন যোগ্য প্রায় তিন হাজার শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরে বিক্ষোভে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা নিয়েও উদ্বেগ যুক্ত হয়। বিদ্যালয়গুলো বৃহত্তর অসন্তোষ প্রকাশের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবার দাবি বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল না।

পর্তুগালের আবাসন আন্দোলন অনিশ্চয়তার আরেকটি চিত্র তুলে ধরে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএইচডি গবেষক ক্যারোলিনা ক্রুজ ও তার সঙ্গী লিসবন এলাকায় তাদের বাসার জন্য মাসে ৭১৬ ইউরো ভাড়া দিতেন। ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি আসায় তারা আশঙ্কা করছিলেন, নতুন চুক্তিতে মাসিক ভাড়া ১,২০০ ইউরোর বেশি হতে পারে, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে।

শিক্ষা খাতের সংস্কারের দাবিতে অবাহত আন্দোলন পরে ফ্রান্সের জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষা খাতের সংস্কারের দাবিতে অবাহত আন্দোলন পরে ফ্রান্সের জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। ছবি: সংগৃহীত

এটি একটি নথিভুক্ত অভিজ্ঞতা, সব ভাড়াটিয়ার অবস্থার পরিমাপক নয়। তবু ঘটনাটি দেখায়, বছরের পর বছর পড়ালেখা ও পেশাগত প্রস্তুতির পরও স্থিতিশীল আবাসন নিশ্চিত করা কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবাদী শিবিরগুলো আবাসনসংকটের এই চাপকে দৃশ্যমান করে তোলে। লিসবনের রসিও চত্বরে প্রায় ২০০টি তাঁবু খাটানো হয়েছিল। পোর্তোর একটি চত্বরে আন্দোলনকারীরা প্রায় ১০ দিন অবস্থান করেন।

পুলিশ জানায়, শিবিরগুলো অবৈধ বলে তারা আগে থেকেই সতর্ক করেছিল এবং উচ্ছেদ অভিযান শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়েছে। তবে লিসবনের শিবিরের একজন মুখপাত্র এর বিপরীত বর্ণনা দেন এবং জানান, প্রতিবাদ আবার শুরু হবে।

দুপক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য থাকলেও বিরোধের বিষয়গুলো স্পষ্ট— উচ্ছেদের নিয়ম ও ভাড়ার সীমা নিয়ে প্রস্তাবিত পরিবর্তন এবং প্রতিবাদের অংশ হিসেবে জনপরিসরে অবস্থান করার অধিকার।

স্পেনের আবাসনসংকট ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে। মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে বাসা থেকে উচ্ছেদের পর প্রতিবাদ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে শিবির গড়ে তুলে সমাধানের দাবি জানান। আবাসনসংক্রান্ত দাবিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো ১১ নভেম্বর দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনও আহ্বান করা হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, স্পেনে গড় বাড়িভাড়া একজন তরুণের গড় মাসিক বেতনের কাছাকাছি। জাতীয় গড় প্রত্যেক ভাড়াটিয়ার বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে না। তবে এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে— আবাসন ব্যয় একজনের আয়ের কতটা কেড়ে নিলে কাজ করে স্বাধীনভাবে জীবন গড়ার নির্ভরযোগ্য পথ আর অবশিষ্ট থাকে না?

ইতালিতে প্রতিবাদ মিছিলের বাইরেও সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাহত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের প্রতিবাদে ট্রাকচালকরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে কারখানা ও পাইকারি বাজারে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পাস্তা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রুম্মো জানায়, কাঁচামালের অভাবে তারা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

লোক্রি শহরের বাসিন্দা জিনেব বুতিমাহ সরবরাহ কমতে দেখে অন্য শহরে গিয়ে ময়দা ও প্রয়োজনীয় খাবার কিনে মজুত করেন। তার অভিজ্ঞতা একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আনে— প্রতিবাদ অর্থনৈতিক চাপের জবাব হতে পারে, আবার সেই প্রতিবাদ এমন মানুষের ওপরও নতুন ব্যয় চাপাতে পারে, যাদের এই বিরোধের ওপর খুব সামান্যই নিয়ন্ত্রণ আছে।

ইতালির শিক্ষার্থী বিক্ষোভের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। কয়েকটি শহরের শিক্ষার্থীরা ‘নো মেলোনি ডে’ নামে পরিচিত কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বিদ্যালয়ের অবস্থা ও সরকারের শিক্ষানীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ব্রাসেলসে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং এমন কিছু সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, যা তাদের আশঙ্কায় উচ্চশিক্ষাকে আরও অপ্রাপ্য করে তুলতে পারে। বেলজিয়ামের রাজধানীতে সংঘর্ষের পর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। শিক্ষা নিয়ে এসব কর্মসূচিতে মিল থাকলেও নীতিগত বিরোধ এবং আন্দোলনকারীদের আচরণ সব জায়গায় এক রকম ছিল না।

আলবেনিয়ার বিক্ষোভে আরও নানা উদ্বেগ একত্র হয়েছে। বিলাসবহুল উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণের বিরোধিতা থেকে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লবের’ সূচনা হয়। সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভে দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ বছর বয়সী সংসদ সদস্য মারজানা কোচেকু, যিনি পরে স্বতন্ত্র সদস্য হন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। তিনি দেশের ভূমি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার অভিজ্ঞতা আন্দোলনটির মানবিক দিক সামনে আনে। অন্যদিকে বৃহত্তর ঘটনাপ্রবাহ সতর্ক করে যে একে কেবল একটি অর্থনৈতিক অভিযোগে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

এই দেশগুলোতে আবাসন, শিক্ষা, পরিবহন ব্যয় ও জনসেবা নিয়ে উদ্বেগ বারবার দেখা যাচ্ছে। তবে বিষয়গুলোর মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেই একটি অভিন্ন কারণ প্রমাণিত হয় না। ফ্রান্সের শিক্ষকসংকট, পর্তুগালের ভাড়াবিরোধী আন্দোলন, স্পেনের উচ্ছেদবিরোধী প্রতিবাদ, ইতালির পরিবহন অবরোধ এবং আলবেনিয়ার উপকূলীয় উন্নয়নবিরোধী আন্দোলন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। আন্দোলনকারীরা অন্য দেশের কর্মসূচি থেকে অনুপ্রেরণা পেলেও স্থানীয় ইতিহাস তাদের দাবি ও সরকারের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

অস্থিরতা রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে তা কোনো নির্দিষ্ট ফল নিশ্চিত করে না। বিক্ষোভ কোনো বিষয়কে জনআলোচনায় আনতে পারে, নির্বাচনি বিতর্কে প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা নির্দিষ্ট দাবি আদায়ে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তা জনসমর্থনে বিভাজন তৈরি করতে, সেবা ব্যাহত করতে এবং সরকারকে জনশৃঙ্খলার দিকে বেশি মনোযোগী করে তুলতে পারে।

ফ্রান্সে সরকার অক্টোবরের সহিংসতা মোকাবিলায় নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করেছে। পার্লামেন্টও বিক্ষোভের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে। এই তদন্ত তাৎক্ষণিক কারণগুলো স্পষ্ট করতে পারে। তবে বিদ্যালয়, পারিবারিক ব্যয় ও জনআস্থা নিয়ে গভীরতর প্রশ্নগুলোর সমাধান শুধু তদন্তের মাধ্যমে হবে না।

ইতালির মিলানে বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহী
ইতালির মিলানে বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহী

ইউরোপের বিক্ষোভ থেকে শিক্ষা

ইউরোপের এসব বিক্ষোভ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকারগুলোর জন্যও কিছু শিক্ষা তুলে ধরে। অর্থনৈতিক সূচক মূল্য, ভাড়া ও সরকারি অর্থব্যবস্থার পরিবর্তন দেখাতে পারে। কিন্তু মানুষ দৈনন্দিন জীবনে এসব চাপ কীভাবে অনুভব করে, তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীর কথা শোনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জনআস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সহিংসতার অভিযোগ ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা উচিত। মানুষ কেন মনে করছে যে প্রচলিত পথগুলো তাদের উদ্বেগের সমাধান করছে না— সরকারগুলোকে এ প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা কররত হবে। স্থানীয় অভিযোগ ভিন্ন হলেও এসব নীতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রযোজ্য।

বিক্ষোভগুলো একটি পুনরাবৃত্ত উদ্বেগকে দৃশ্যমান করেছে— কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিশ্বাসযোগ্য পথ কি না। মানুষ এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মিছিল, অবস্থান ও ধর্মঘটের মাধ্যমে। কোথাও সহিংসতাও ঘটেছে, যার জবাবদিহি প্রয়োজন। এরপর কী হবে, তা নির্ভর করবে সরকারগুলো মানুষের সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং জনআলোচনা প্রতিবাদের পেছনের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের পরিণতি—দুটিকেই কতটা গুরুত্ব দেয়, তার ওপর।

লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad