এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহারে আমাদের জন্য যে চ্যালেঞ্জ

কাজী আহমেদ শামীম
এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহারে আমাদের জন্য যে চ্যালেঞ্জ। লেখক: কাজী আহমেদ শামীম। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম
এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহারে আমাদের জন্য যে চ্যালেঞ্জ। লেখক: কাজী আহমেদ শামীম। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা যদি অল্প মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, উৎপাদনশীলতা বাড়লেও তার সুফল সমানভাবে সবাই পাবে না। বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে তাই অবকাঠামো, দক্ষতা ও ন্যায্য সুযোগকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের অসম সুযোগ বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে— আলজাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে আসা এমন সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন হলো— এআইয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন সুযোগে কারা অংশ নিতে পারবেন এবং কারা পিছিয়ে পড়বেন।

নতুন প্রযুক্তির সুফল যে সমভাবে বণ্টন হয় না তার অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের সূচনার পর বাষ্পশক্তি ও যন্ত্রনির্ভর উৎপাদন অর্থনীতির গতি বদলে দেয়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র শিল্পায়নে এগিয়ে যায়। ওই সময় যেসব দেশ নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় পুঁজি, দক্ষতা, অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছিল, তারা উৎপাদন ও বাণিজ্যে বাড়তি সুবিধা অর্জন করে।

অন্যদিকে বহু উপনিবেশ ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি একই গতিতে এগোতে পারেনি। প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার পার্থক্য এভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। তবে এই বৈষম্যের পেছনে প্রযুক্তির পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শাসন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভূমিকাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা বা ডব্লিউআইপিওর ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রিপোর্ট ২০২৬ এই অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। বিদ্যুৎ, রেলপথ ও স্থির টেলিফোনের মতো প্রযুক্তি যেসব দেশ আগে গ্রহণ করেছিল, তারা কয়েক দশক ধরে উৎপাদনশীলতার বাড়তি সুবিধা সঞ্চয় করতে পেরেছে।

আবার কোনো দেশে প্রযুক্তির আগমন ঘটলেই সবার মধ্যে তার ব্যবহার সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। প্রযুক্তি কত আগে এসেছে, তার পাশাপাশি কত মানুষ কত কার্যকরভাবে সেটি ব্যবহার করতে পেরেছে, সেটিও উন্নয়নের ব্যবধান নির্ধারণ করেছে।

দেশের ভেতরেও একই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ পৌঁছানোর অর্থ শুধু ঘরে আলো জ্বলা নয়; এর সঙ্গে সেচ, ক্ষুদ্রশিল্প, পণ্য সংরক্ষণ এবং পড়ালেখার সুযোগ যুক্ত। ফলে কোনো অঞ্চল আগে বিদ্যুৎ পেলে এবং অন্য অঞ্চল দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকলে উৎপাদন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগেও ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশে বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রযুক্তির সুবিধা পিছিয়ে থাকা এলাকায় পৌঁছাতে সুস্পষ্ট সরকারি নীতি, উদ্যোগ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বিস্তারের পর বৈষম্যের এই প্রশ্ন নতুন রূপ নিয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি যন্ত্র কেনার সামর্থ্য, শিক্ষা, ভাষাজ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৬: ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ দেখিয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি দ্রুত ছড়ালেও তার উন্নয়নগত সুফল একইভাবে ছড়ায়নি, বরং সেই সুফলের বণ্টন ছিল অসম। গ্রাম ও শহরের ব্যবধানও এখনো দৃশ্যমান।

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) ২০২৫ সালের হিসাবে, বিশ্বে শহরের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যেখানে গ্রামের ক্ষেত্রে হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। এটি বৈশ্বিক হিসাব, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট চিত্র নয়, তবে প্রযুক্তিতে ভৌগোলিক বৈষম্যের স্থায়িত্ব বোঝায়।

এই ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো— নতুন প্রযুক্তি এলেই পুরোনো বৈষম্য আপনাআপনি দূর হয় না। আগে থেকে পুঁজি, শিক্ষা ও অবকাঠামোয় এগিয়ে থাকা মানুষ নতুন সুযোগও দ্রুত কাজে লাগাতে পারেন। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকলে সেই প্রাথমিক সুবিধা ক্রমে আরও বড় ব্যবধানে পরিণত হতে পারে।

এআইয়ের ক্ষেত্রেও তাই শুরু থেকেই দেখতে হবে, একজন শহুরে পেশাজীবী ও একজন গ্রামের শিক্ষার্থী, কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কতটা কার্যকরভাবে এর সুবিধা পাচ্ছেন। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি বিস্তারের সঙ্গে ন্যায্য অংশগ্রহণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের কম্পিউটার, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে এআই ব্যবহার করতে পারেন, তার শেখা ও কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। একই বয়সের আরেক শিক্ষার্থী যদি পরিবারের একটি মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভর করেন, ব্যয়বহুল ডেটা কিনে পড়ালেখা করেন এবং কার্যকর নির্দেশনা না পান, তাহলে একই প্রযুক্তি তাদের ব্যবধানও বাড়াতে পারে। এটি একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট, কিন্তু বাংলাদেশের এআই প্রস্তুতির নীতিগত প্রশ্নটি এর মধ্যেই স্পষ্ট।

এআইয়ের যুগে ইন্টারনেট হাইওয়েতে সংযুক্ত থাকা এবং সুযোগ কাজে লাগাতে পারা দুটি পৃথক সক্ষমতা। ইন্টারনেট সংযোগ প্রথম দরজা খুলে দেয়। এরপর প্রয়োজন উপযুক্ত যন্ত্র, ভাষাগত সুবিধা, ব্যবহারিক দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা এবং প্রযুক্তির খরচ বহনের সামর্থ্য। এসবের কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলেও একজন মানুষ কার্যত পিছিয়ে থাকতে পারেন।

বাংলাদেশে এআই প্রস্তুতি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউএনডিপি ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এখন আমাদের যা করতে হবে তা হলো— এআই প্রস্তুতি মূল্যায়নকে বাজেট, বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বা চালু হওয়া সফটওয়্যারের হিসাবের পাশাপাশি দেখতে হবে, কার আয় বাড়ল, কার সেবাপ্রাপ্তি সহজ হলো এবং কোন জনগোষ্ঠী এখনো সুবিধার বাইরে থাকল।

এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি চাকরি হারানোর আশঙ্কা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও পোল্যান্ডের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নাস্কের ২০২৫ সালের গবেষণা বলছে, বিশ্বে প্রতি চারটি চাকরির একটি জেনারেটিভ এআইয়ের প্রভাবের আওতায় আসতে পারে। তবে এই প্রভাবকে সরাসরি চাকরি বিলোপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, গবেষণায় কাজের ধরন পরিবর্তনকেই বেশি সম্ভাব্য ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি গণমাধ্যম, সফটওয়্যার ও অর্থসংক্রান্ত কিছু পেশায় প্রভাব বেশি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই বৈশ্বিক হিসাবকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য চাকরি হারানোর হার হিসেবে ব্যবহার করা সঠিক হবে না। বরং বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণ— কোন কাজের কোন অংশ প্রযুক্তি করতে পারবে, কোথায় মানুষের তত্ত্বাবধান থাকবে এবং কর্মীদের কী নতুন দক্ষতা লাগবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাথমিক খসড়া লেখা, সাধারণ অনুবাদ, তথ্য সাজানো কিংবা নিয়মিত গ্রাহকসেবার কিছু কাজের বাজার বদলাতে পারে। এসব কাজে নিয়োজিত তরুণদের সামনে তখন দুটি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে— আগের কাজের মূল্য কমে যাওয়া এবং উন্নত কাজের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন। শুধু এআই ব্যবহারের সাধারণ প্রশিক্ষণ দিয়ে এই চাপ সামলানো কঠিন। ভাষা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, সমস্যা সমাধান এবং ফলাফল যাচাইয়ের দক্ষতাও শেখাতে হবে।

উৎপাদন খাতেও প্রযুক্তির ধরন আলাদা করে বোঝা দরকার। জেনারেটিভ এআই, শিল্পযন্ত্রের স্বয়ংক্রিয়করণ ও রোবট একই প্রযুক্তি নয়। তৈরি পোশাক খাতে এআই দিয়ে নকশা, ক্রয়াদেশ বিশ্লেষণ কিংবা উৎপাদন পরিকল্পনার সম্ভাবনা থাকলেও সেখান থেকে সরাসরি কত শ্রমিকের চাকরি যাবে— এমন সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছানো সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে নীতির ভিত্তি হতে হবে স্থানীয় তথ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মূল্যায়ন।

বাংলাদেশে এআইয়ের সুফল ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রধান শর্ত বাংলা ভাষার নির্ভরযোগ্য ব্যবহার। ইংরেজিতে দক্ষ মানুষ যদি উন্নত সেবা পান, আর বাংলাভাষী ব্যবহারকারী অস্পষ্ট বা ভুল উত্তর পান, তাহলে প্রযুক্তির মধ্যে ভাষাভিত্তিক সুযোগের ব্যবধান তৈরি হবে।

বাংলা লিখতে পারাই একটি ব্যবস্থার যথেষ্ট যোগ্যতা হতে পারে না। কৃষকের আঞ্চলিক উচ্চারণ, স্থানীয় রোগবালাইয়ের বিবরণ, ভূমিসংক্রান্ত পরিভাষা কিংবা সরকারি সেবার নিয়ম সঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতাও পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি ও আইনসংক্রান্ত উত্তরে ভুলের পরিণতি গুরুতর হতে পারে।

এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত বাংলা তথ্যভাণ্ডার, স্থানীয় বাস্তবতায় কার্যকারিতা যাচাই ও নিয়মিত ত্রুটি সংশোধনের ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এখানে কাজে আসতে পারে। ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রেখেই গবেষণার জন্য উপযোগী তথ্য ব্যবহারের পথ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষার প্রস্তুতিতেও একই গুরুত্ব প্রয়োজন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশবিষয়ক একটি গবেষণায় ৫৯ জন অংশীজনের সাক্ষাৎকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পুরোনো পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও কম্পিউটিং সুবিধার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ নয়, তবে শিক্ষা ও কর্মবাজারের সংযোগে কোথায় আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন, তার ইঙ্গিত দেয়।

স্কুল-কলেজ ও কারিগরি শিক্ষায় তাই এআই সাক্ষরতার অর্থ হবে প্রযুক্তি দিয়ে উত্তর তৈরি করার পাশাপাশি সেই উত্তর যাচাই করতে শেখা। শিক্ষক প্রস্তুত না থাকলে শিক্ষার্থীর হাতে নতুন সফটওয়্যার তুলে দিয়েও শেখার মান নিশ্চিত করা কঠিন।

এআই নিয়ে আলোচনায় সফটওয়্যার ও দক্ষতার পাশাপাশি বিদ্যুতের বিষয়টিও সামনে আনা জরুরি। ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটিং অবকাঠামো চালাতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৫ সালের হিসাব, ২০২৪ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। সংস্থাটির মূল পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে তা প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। এই হিসাব সব ডেটা সেন্টারের, শুধু এআইয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহার নয়।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো— ডিজিটাল বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ, গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা ও জ্বালানি দক্ষতার পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে। বড় ডেটা সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্তে বিদ্যুতের খরচ, শীতলীকরণের প্রয়োজন, পানি ব্যবহার এবং অন্যান্য গ্রাহকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা দরকার।

পাশাপাশি দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বড় অবকাঠামো তৈরির পথে যেতে হবে— এমনও নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ক্লাউডসেবা, যৌথ গবেষণা সুবিধা ও কম সম্পদে কার্যকর প্রযুক্তির ব্যবহার বিবেচনা করা যেতে পারে। বিনিয়োগের মাপকাঠি হওয়া উচিত বাস্তব প্রয়োজন ও জনস্বার্থ।

সরকারি সেবায় এআইয়ের সম্ভাবনা বিবেচনার সময় নাগরিকের অধিকারকে শুরুতেই গুরুত্ব দিতে হবে। আবেদন যাচাই, নথি খোঁজা কিংবা তথ্য দেওয়ার কাজ সহজ করা যেতে পারে। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগী নির্বাচন বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত তথ্য অসম্পূর্ণ হলে যোগ্য মানুষও বাদ পড়তে পারেন।

তাই এ ধরনের ব্যবস্থায় মানুষের তত্ত্বাবধান, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা, অভিযোগ জানানো ও ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকতে হবে। ডিজিটাল সেবা চালু হলেও সহায়তাপ্রাপ্ত ও সরাসরি সেবার পথ রাখা প্রয়োজন। একজন নাগরিকের প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা যেন তার অধিকার পাওয়ার বাধা না হয়।

ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সমান সুযোগের প্রশ্ন রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ও উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারলেও ক্ষুদ্র ব্যবসার পক্ষে সেই ব্যয় বহন কঠিন হতে পারে। সাশ্রয়ী সেবা, স্থানীয় ভাষায় প্রশিক্ষণ ও ব্যবসার বাস্তব সমস্যাভিত্তিক সহায়তা তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পিছিয়ে থাকা এলাকার মানুষের জন্য কর্মসূচির নকশায় প্রবেশগম্যতা এবং সময় ও ব্যয়ের বাধা বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশের এআই অগ্রগতির মূল্যায়নে তাই প্রযুক্তি কেনার পরিমাণের সঙ্গে সুযোগের বণ্টনও দেখতে হবে। একটি প্রকল্প কত দ্রুত কাজ করছে, তার পাশাপাশি জানতে হবে দরিদ্র নাগরিকের সময় ও খরচ কতটা কমছে। একটি প্রশিক্ষণ কতজন শেষ করেছেন, তার পাশাপাশি জানতে হবে তারা কাজ বা আয় বাড়াতে পারছেন কি না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও জনসেবার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে বিস্তৃত সামাজিক সুফলে রূপ দিতে হলে নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, বাংলা ভাষায় কার্যকর সেবা, কর্মীদের প্রস্তুতি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আজকের বিনিয়োগ ও নীতির সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এআই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সুযোগের ব্যবধান কমাবে, নাকি আরও বাড়াবে।

লেখক: কলামিস্ট ও গল্পকার

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad