ধরা যাক, উপকূলের একটি পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা পেল। বার্তাটি সময়মতো এলেও কোথায় যেতে হবে, কোন পথ নিরাপদ কিংবা বাড়ির প্রবীণ সদস্যকে কীভাবে নিতে হবে, তা পরিষ্কার হলো না। তথ্য পৌঁছাল, কিন্তু সেই তথ্য কাজে লাগানোর সামর্থ্য তৈরি হলো না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার সাফল্যও এভাবেই বিচার করা দরকার: মানুষের কাছে কী পৌঁছাল এবং তিনি তা দিয়ে নিজের জীবন কতটা বদলাতে পারলেন।
আগামীকাল ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়েছিল। ২০২৬ সালে এর ৮১ বছর পূর্ণ হচ্ছে। যুদ্ধের বিপর্যয় থেকে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিতে ছিল শান্তি, মানবমর্যাদা, অধিকার এবং রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার অঙ্গীকার। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের প্রতি শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি এখন প্রয়োজন সেই অঙ্গীকারের বাস্তব হিসাব চাওয়া।
জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে একই পরিসরের কোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আমাদের হাতে নেই। এর মাধ্যমে ছোট রাষ্ট্রও নিজের দাবি তুলে ধরার একটি মঞ্চ পায়। তবে সব রাষ্ট্রের কণ্ঠ সমানভাবে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না। নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটোক্ষমতা সেই অসমতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। শান্তি রক্ষার সিদ্ধান্ত শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বার্থে আটকে গেলে তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। জাতিসংঘের সংস্কার নিয়ে আলোচনা তাই মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আবার নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থার দায় দিয়ে মাঠপর্যায়ে জাতিসংঘের সব কাজের মূল্যায়ন করাও ভুল হবে। বাংলাদেশে উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তায় জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব রয়েছে। জাতীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংগঠন ও মানুষের সঙ্গে কাজ করা কর্মীদের অবদান স্বীকার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন উদ্যোগ মানুষের অধিকার ও সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, আর কোথায় প্রত্যাশিত ফল আসছে না, তার স্বাধীন মূল্যায়নও দরকার।
রোহিঙ্গা সংকট এই প্রয়োজনকে আরও স্পষ্ট করে। গত ২০ মে জাতিসংঘ ও সহযোগীরা রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা মেটাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তার আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই আবেদন আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ ছোট এবং জীবনরক্ষাকারী সহায়তার ন্যূনতম প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি। চাহিদা বাড়ার সময়ে সহায়তার পরিসর সংকুচিত হওয়া আন্তর্জাতিক সংহতির জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা।
খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সচল রাখার পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের সেবা ও জীবিকার ওপর চাপও বিবেচনায় নিতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কেন্দ্রে থাকতে হবে মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ। বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্বের প্রশংসার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অর্থায়ন ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।
এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’-এর সঙ্গে রয়েছে ‘গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’। ডিজিটাল সহযোগিতা ও ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থা নিয়ে এসব অঙ্গীকার বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে দেশের প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।
বিশ্ব তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলনের ২০ বছর পূর্তির পর্যালোচনা, অর্থাৎ ডব্লিউএসআইএস প্লাস ২০-এর পরও একই বাস্তবায়নের প্রশ্ন সামনে এসেছে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মধারাগুলোর রূপরেখায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্টের অঙ্গীকারের সঙ্গে যোগসূত্র এবং অগ্রগতি মাপার সূচক রাখার কথা। এই কাজের ফল ২০২৭ সালে জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উন্নয়ন কমিশনে উপস্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশেরও নিজের বাস্তবতা ও প্রমাণ নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে।
এখানে আমাদের পরিমাপের পদ্ধতি বদলানো জরুরি। ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া মানুষের সংখ্যা জানার পাশাপাশি জানতে হবে, কতজন নিজের ভাষায় প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারছেন। অনলাইনে সরকারি সেবার আবেদন করতে কত সময় ও খরচ হচ্ছে? নারী কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সহায়তা ছাড়াই সেবা নিতে পারছেন কি? ভুল তথ্য বা অন্যায় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলে কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন কি? উন্নয়নের হিসাব এসব প্রশ্নের উত্তরও দাবি করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। গত ৬ ও ৭ জুলাই জেনেভায় জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনার ব্যবহারিক প্রশ্ন হলো, জনসেবায় এআই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং ভুল হলে জবাবদিহি করবে কে। দক্ষতা, সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিশ্চিত করার আগে প্রযুক্তি এলে বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে।
আমার মতে, সরকারি সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা, তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহজ অভিযোগব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। সিদ্ধান্তে মানুষের জীবিকা বা অধিকার প্রভাবিত হলে মানবিক পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকতে হবে। বাংলায় সাবলীল উত্তর দেওয়া কোনো ব্যবস্থার নির্ভুলতা বা ন্যায্যতার প্রমাণ নয়।
এসব অঙ্গীকার এগিয়ে নিতে সরকারের বিদ্যমান সমন্বয়ব্যবস্থা ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয়ের সহযোগিতায় একটি প্রকাশ্য জাতীয় বাস্তবায়ন-হিসাব তৈরি করা যেতে পারে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা, অর্থায়ন ও প্রত্যাশিত ফল চিহ্নিত করা সম্ভব। এরপর বছরে অন্তত একবার সহজ বাংলায় অগ্রগতি প্রকাশ ও উন্মুক্ত পর্যালোচনা করা উচিত। কোথায় কাজ এগোয়নি, সেই তথ্যও সেখানে থাকতে হবে।
এই পর্যালোচনায় নাগরিক সমাজ ও কমিউনিটি গণমাধ্যমকে নিয়মিত অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে পৌঁছানোর ব্যবস্থা চাই। যাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না, তাঁদের মতামত গ্রহণের জন্য রেডিও, সরাসরি আলোচনা ও অন্যান্য সহজ যোগাযোগপথ রাখতে হবে। স্থানীয় সংগঠনকে দায়িত্ব দিলে সেই কাজের উপযুক্ত অর্থায়নও দিতে হবে।
নারী ও তরুণদের নিরাপদ ডিজিটাল অংশগ্রহণ এই সহযোগিতার একটি অগ্রাধিকার হতে পারে। অনলাইন সহিংসতার অভিযোগে দ্রুত সহায়তা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং স্থানীয় ভাষায় অধিকারবিষয়ক তথ্য প্রয়োজন। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। ভুল তথ্য মোকাবিলার নীতি যেন সরকারের সমালোচনা বা ভিন্নমত দমনের সুযোগ না দেয়, সে জন্য স্বাধীন তদারকি দরকার।
বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের কাজের কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক অঙ্গীকারের এই সংযোগ। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের বিশেষ পরামর্শক মর্যাদাসম্পন্ন সংগঠন হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব হলো মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, নিজের কাজের ফল যাচাই করা এবং নীতির ঘাটতি নিয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলা। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে যে জবাবদিহি চাই, নিজেদের কাজেও তার চর্চা থাকতে হবে।
জাতিসংঘ দিবসে তাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা হওয়া উচিত আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তার সাফল্যের সাক্ষ্য পাওয়া যাবে মানুষের জীবনে: উপকূলের পরিবারটি নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পারল কি না, শরণার্থী শিশুটির পড়াশোনা চলল কি না, কিংবা গ্রামের নারীটি প্রয়োজনীয় সেবা পেলেন কি না। ৮১ বছরের অঙ্গীকারের পরবর্তী অধ্যায় লেখা হোক এই মানুষগুলোর অভিজ্ঞতা দিয়ে।
লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি),
সদস্য, জাতিসংঘের তথ্যসমাজবিষয়ক গোষ্ঠীর (ইউএনজিআইএস) মাল্টিস্টেকহোল্ডার কনসালটেশন গ্রুপ।















