জবিতে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা, গরুভোজের পালটা কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের

গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নায় মন্দিরের ইট ব্যবহারের ঘটনার জেরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে উত্তেজনা নতুন রূপ নিয়েছে। ওই ঘটনার পর ক্যাম্পাসে সব ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছিল জবি প্রশাসন। সে নির্দেশনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। একই সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ক্যাম্পাসে গরুভোজ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক মো. আজম খানের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়। নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
নির্দেশনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
জবি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বুধবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতাসহ একদল শিক্ষার্থী। এ সময় তাদের ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন রুখে দাও’, ‘তোমার আমার অধিকার, রুখে দেওয়ার সাধ্য কার’ এবং ‘বিজেপির দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতারাও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। জকসুর সমাজসেবা ও শিক্ষার্থীকল্যাণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘৯২ শতাংশ মুসলিমের দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই নিষিদ্ধ করে উপাচার্য কাকে খুশি করতে চান? আপনার এসব দালালি পাশের দেশে গিয়ে করেন। আগামীকালই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু কোরবানি হবে, ইনশাআল্লাহ। ডিসিশন ফাইনাল।’
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান আকাশও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, পূজার আগেই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে গরু নিয়ে মিছিল করে জবাই করে গরুভোজের আয়োজন করবেন, ইনশা আল্লাহ। পারলে প্রশাসন ঠেকিয়ে দেখাক।
এক দিন এগিয়ে গরুভোজ, চলছে অর্থ সংগ্রহ
প্রথমে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গরুভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও পরে তা এক দিন এগিয়ে বৃহস্পতিবার আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ জন্য অর্থ সংগ্রহও চলছে। আয়োজকদের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। কর্মসূচিতে অংশ নিতে জনপ্রতি ৭০ টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে বুধবার রাতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের পরিচালকের সই করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠান উদ্যাপনের অধিকার সবার রয়েছে। তবে একটি উদ্যাপন যেন অন্য কোনো উদ্যাপনের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইয়ের সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি প্রক্টরের নজরে আসে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়া বা ধর্মীয় সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে তিনি এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে ওই আহ্বানকে কেন্দ্র করে নতুন করে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছে প্রশাসন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ১২ অক্টোবর রাতে ক্যাম্পাসে খিচুড়ি রান্নাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা হয়। পরদিন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনা ও বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টির আরও সন্তোষজনক নিষ্পত্তি হয়। এ ছাড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার অভিযোগও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
মন্দিরের ইট ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার (১২ অক্টোবর) রাতে। স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ হওয়া উদ্যাপন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের সামনে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। স্থানটির পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির। রান্নার চুলা তৈরিতে ব্যবহৃত ইট মন্দিরের বলে অভিযোগ তোলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় তারা রাতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন।
পরে রান্নার আয়োজকরা এক বিবৃতিতে ইট ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তাদের বক্তব্য, প্রথমে ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইটগুলো মন্দিরের বলে তারা জানতেন না। বিষয়টি জানার পর ইট সরিয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে আনা লোহার চুলায় রান্না শেষ করেন তারা।
এ ঘটনায় মন্দির পরিচালনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা পৃথক বিবৃতি দিয়ে ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, কয়েকজন শিক্ষার্থী মনে করেন, ক্যাম্পাসে কে কী খাবেন, তা কোনো একক গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে দিতে পারে না। এ অবস্থায় পশু জবাইসংক্রান্ত প্রশাসনিক নির্দেশনা ঘিরে শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রতিবাদ এবং পালটা কর্মসূচির ঘোষণা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

















