টঙ্গীর মাদরাসায় শিশুকে যৌন নিপীড়নের সত্যতা মিলেছে, বাবাকে গ্রেপ্তারের তথ্য ভুয়া

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০: ২৮
শিশুটির অভিভাবক শাহজালাল রুমির চড় মারার মুহূর্ত (বাঁয়ে) এবং অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহমদ (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
শিশুটির অভিভাবক শাহজালাল রুমির চড় মারার মুহূর্ত (বাঁয়ে) এবং অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহমদ (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় ক্বরিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। মাদরাসাটি পরিদর্শন করে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া খবরকে বিভ্রান্তিকর বলে ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। তার ভাষ্য, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং এ নিয়ে কোনো অভিযানও চালানো হয়নি।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনারের মো. ইসরাইল হাওলাদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন বলে জানান রাশেদ। ফেসবুকে তিনি আরও লেখেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকেও গ্রেপ্তারের কোনো পরামর্শ পুলিশকে দেওয়া হয়নি। কতিপয় মিডিয়াতে শাহজালাল রুমির গ্রেপ্তারের অভিযানের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।’

শনিবার (২৪ অক্টোবর) মাদরাসাটি পরিদর্শন করে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে পুলিশ। টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। এতে প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা (শিশুকে নিপীড়ন করা হয়েছে) পাওয়া গেছে। এখনও তদন্ত চলমান আছে।’

এর আগে শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিশুটির জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। ওই দিন মামলার আসামি মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মোসলেম আহমদকে (৩০) গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘শিশুটি গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর মহানগর হাকিম আদালতে বিচারকের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে। একই দিন শিক্ষককে শিশুটির বাবার করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।’

পরিবারের অভিযোগ, গত ১৯ অক্টোবর মাদরাসার নিচতলার সিঁড়িতে প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ঘটনার পর শিশুটি মাদরাসায় যেতে চাইছিল না। প্রথমে পরিবারের সদস্যদের কিছু না বললেও পরে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছে ঘটনার কথা জানায়।

এরপর গত ২১ অক্টোবর দুপুরে শিশুটির স্বজনরা মাদরাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে শিক্ষককে মারধর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। ওই ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দেশ জুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

মামলার এজাহারের বরাতে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি কাউকে না জানালে শিশুটিকে মারধরের হুমকিও দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে শিশুটি টানা তিন দিন মাদরাসায় যাওয়া বন্ধ রাখে। পরে পরিবারের কাছে ঘটনার কথা জানালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

এদিকে শিক্ষককে মারধর, মাদরাসায় ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগ নিয়ে শিশুটির পরিবার ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে পালটাপালটি বক্তব্য পাওয়া গেছে।

মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাস হোসেনের অভিযোগ, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল মাদরাসায় ঢুকে শিক্ষককে মারধর করে। তাকে বাঁচাতে গেলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও মারধরের শিকার হন। এ সময় কার্যালয় ভাঙচুরের পাশাপাশি ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুট করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ থানায় পৃথক অভিযোগ দিয়েছে।

তবে শিশুটির বাবা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদরাসায় গিয়েছিলেন, কোনো ধরনের মব সৃষ্টি করতে নয়। মাদরাসায় ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও নাকচ করেছেন তিনি।

শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে শাহজালাল রুমি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। একই সঙ্গে মেয়ের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চান তিনি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad