অন্যায়ের প্রতিকার ন্যায়বিচার না প্রতিশোধে?

এ এম কামরুল ইসলাম
অন্যায়ের প্রতিকার ন্যায়বিচার না প্রতিশোধে? গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম
অন্যায়ের প্রতিকার ন্যায়বিচার না প্রতিশোধে? গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে। আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বলছে, দীর্ঘ ১৭ বছর তারা অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

প্রশ্ন হলো— অন্যায়ের প্রতিকার কী? ন্যায়বিচার, নাকি প্রতিশোধ?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার লড়াইয়ে রাজনৈতিক নেতারা অনেক সময় নিরাপদ দূরত্বে থাকেন, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। কখনো জীবন দিয়ে, কখনো জীবিকা হারিয়ে, কখনো মিথ্যা মামলার আতঙ্কে, আবার কখনো সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে।

ইতিহাসের প্রতিশোধ, নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো— ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, প্রশাসনিক আচরণ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়।

এক দল ক্ষমতায় থাকলে অন্য দল অভিযোগ করে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে। বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে তার বিরুদ্ধেও কখনো কখনো একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। যে দল একসময় নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। যে দল ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছিল, তার কোনো কোনো নেতা যখন প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায় আচরণ করেন, তখন সেই দাবির নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এভাবেই গড়ে ওঠে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি— ক্ষমতায় থাকলে প্রতিপক্ষকে দমন, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে নিজেদের নির্যাতিত হিসেবে উপস্থাপন।

অথচ গণতন্ত্রের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিপরীত। গণতন্ত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, কিন্তু নাগরিকের অধিকার পরিবর্তন হবে না। সরকার বদলাবে, কিন্তু আইনের শাসন বদলাবে না। রাজনৈতিক পরিচয় বদলাবে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলাবে না।

একটি দল অন্যায়ের শিকার হয়েছিল বলে সেই দলের পরবর্তী অন্যায় ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। আবার কোনো দলের অতীতের অপরাধের অজুহাতে তার প্রত্যেক সমর্থককে অপরাধী ভাবাও ন্যায়বিচার নয়।

আওয়ামী লীগের প্রতি প্রশ্ন— নির্যাতনের অভিজ্ঞতা কি প্রতিশোধের অনুমতি দেয়?

আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের নেতাকর্মীরা অন্যায় ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্দিষ্ট ঘটনা, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

কোনো নিরপরাধ নেতাকর্মী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গ্রেপ্তার, হয়রানি, হামলা, সম্পত্তির ক্ষতি কিংবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হলে তার প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কারও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে না।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অতীত শাসনামলে যেসব ব্যক্তি ও পরিবার গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক নিপীড়ন কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন, সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের বিচার হওয়া প্রয়োজন।

এখানে আওয়ামী লীগের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে— অতীতে অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকলে তারা কি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করবে, যেখানে ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও নিরাপদ থাকবে? নাকি ক্ষমতায় ফেরার পর অতীতের ক্ষোভ মেটাতে প্রতিপক্ষকে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করবে?

দ্বিতীয় পথ বেছে নেওয়া হলে অতীতের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ ন্যায়বিচার দাবি করা এক বিষয়, আর প্রতিশোধের অধিকার দাবি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বিএনপি ও জামায়াতের প্রতি প্রশ্ন— নির্যাতিত হওয়ার অভিজ্ঞতা কি ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা?

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ ১৭ বছর রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের বাধার শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছে। এসব অভিযোগের যেসব অংশ প্রমাণিত, সেগুলোর প্রতিকার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

কিন্তু নির্যাতনের অভিজ্ঞতা কোনো রাজনৈতিক দলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভুল করে তোলে না। অতীতে নির্যাতিত হওয়া একজন মানুষকে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার দেয়, একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিএনপি কিংবা জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অন্য কারও ওপর হামলা করলে, জমি দখল করলে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাধা দিলে, চাঁদাবাজি করলে কিংবা প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই নীতি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন অপরাধীর বিচার হবে তার অপরাধের ভিত্তিতে, দলের নামের ভিত্তিতে নয়। আইনের চোখে সবাই সমান— এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের নামান্তর হয়ে থাকবে। যে দল ক্ষমতায় এসে নিজের সমর্থকদের অপরাধ ক্ষমা করে এবং প্রতিপক্ষের নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়, সে গণতন্ত্র নয়, দলীয় স্বার্থের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের অপরাধ কী?

এই প্রশ্নটিই আজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

একজন কৃষক সারা দিন মাঠে কাজ করেন। তার কাছে রাজনীতির চেয়ে ধানের ফলন, সারের দাম ও পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন শ্রমিক দিন শেষে মজুরি নিয়ে ঘরে ফিরতে চান। তার কাছে রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া বড় দায়িত্ব।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে দোকান চালান। রাজনৈতিক সংঘাত, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার কারণে তার দোকান বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের জীবিকা বিপন্ন হয়। একজন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চান। রাজনৈতিক অস্থিরতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে কিংবা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হলে তার হারিয়ে যাওয়া সময় কে ফিরিয়ে দেবে?

একজন চাকরিপ্রার্থী মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি চান। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হলে সেই ক্ষতির প্রতিকার কী?

এই মানুষগুলোর প্রত্যেকেই কি আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত? তাদের সবাই কি কোনো রাজনৈতিক অপরাধ করেছেন? অবশ্যই নয়। তবু রাজনৈতিক সংঘাতের বড় একটি অংশের মূল্য তাদেরই দিতে হয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো— কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় তার পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্য মানুষের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ আইনের মৌলিক নীতি হলো— ব্যক্তির দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না।

সাধারণ মানুষের অপরাধ একটাই— তারা এমন একটি রাষ্ট্রে নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে ও শান্তিতে বাঁচতে চায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মানুষের অধিকারই হবে প্রধান বিবেচ্য। এ অপরাধ নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

প্রতিশোধের রাজনীতি চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?

ধরা যাক, আওয়ামী লীগ কখনো আবার ক্ষমতায় ফিরল। এরপর যদি অতীতের ক্ষোভ থেকে বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর নির্বিচার নির্যাতন শুরু হয়, তাহলে কী ঘটবে?

যারা আজ নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করছেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রতিশোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকবেন। তাদের ক্ষোভ নতুন রাজনৈতিক প্রতিশোধের বীজ বপন করবে। পরবর্তী নির্বাচনে আবার ক্ষমতার পরিবর্তন হলে সেই ক্ষোভ নতুন করে বিস্ফোরিত হতে পারে।

এভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে পালাক্রমে প্রতিশোধ গ্রহণের মাধ্যমে। আজ যে পরিবার মামলা ও নির্যাতনের শিকার হবে, আগামীকাল সেই পরিবারের কেউ ক্ষমতায় গিয়ে অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাইতে পারেন। আজ যে নেতা প্রতিপক্ষকে দমন করবেন, আগামীকাল তাকেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

কিন্তু এই চক্রে রাষ্ট্রের কী লাভ হবে?

বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়বেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। মেধাবী তরুণেরা হতাশ হবেন। রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার নৈকট্য যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য সত্যের চেয়ে ক্ষমতাবান পরিচয় বেশি প্রয়োজন, তখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাবে। আর যে রাষ্ট্রে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধ এক নয়

প্রতিশোধ না নেওয়ার অর্থ এই নয় যে অতীতের অপরাধ ভুলে যেতে হবে, অপরাধীদের ক্ষমা করে দিতে হবে কিংবা বিচার বন্ধ রাখতে হবে। বরং প্রকৃত ন্যায়বিচারের জন্য অতীতের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত আরও জরুরি।

কেউ যদি গুম, হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তবে তার পরিচয় ও পদমর্যাদা যা-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, ন্যায্য বিচার পাওয়ার সুযোগ এবং নিরপরাধ প্রমাণিত হলে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।

বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য এখানেই। প্রতিশোধের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে কষ্ট দেওয়া। ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য সত্য উদ্‌ঘাটন, অপরাধের দায় নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।

প্রতিশোধে আবেগ বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করে, ন্যায়বিচারে আইন ও প্রমাণ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। প্রতিশোধে অপরাধীর সঙ্গে নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ন্যায়বিচার নিরপরাধকে সুরক্ষা দেয় এবং অপরাধীকে জবাবদিহির আওতায় আনে।

তাই অতীতের অপরাধের বিচার করতে হবে, কিন্তু সেই বিচারের নামে নতুন অপরাধ সংঘটন করা যাবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কয়েকটি প্রশ্ন

আমি কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থক নই। একজন নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার উদ্বেগ রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখতে চাই।

  • প্রথমত, যে দল ক্ষমতায় যাবে, তারা কি নিশ্চিত করবে যে বিরোধী দলের কোনো নিরপরাধ নেতাকর্মী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার হবেন না?
  • দ্বিতীয়ত, অতীতের গুম-হত্যা, নির্যাতন-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার কি নিশ্চিত করা হবে?
  • তৃতীয়ত, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দলীয় পরিচয় কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
  • চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, চাঁদাবাজি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা কিংবা প্রশাসনকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে দলগুলো কি কার্যকর ব্যবস্থা নেবে?
  • পঞ্চমত, পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা কি রাজনৈতিক নির্দেশের পরিবর্তে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করতে পারবে?
  • ষষ্ঠত, নির্বাচনে পরাজিত দল কি বিজয়ী দলের শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনার অধিকারকে সম্মান করবে? আর বিজয়ী দল কি পরাজিত দলের আইনসম্মত রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তৃতায় নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে দিতে হবে। কারণ জনগণ এখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়।

সমাধানের পথ কোথায়?

বাংলাদেশকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের করে আনতে কয়েকটি বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: অপরাধের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক পরিচয় কারও দায়মুক্তির কারণ হবে না, আবার রাজনৈতিক পরিচয় কারও অপরাধী হওয়ার প্রমাণও হবে না।

বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা: বিচারক, তদন্তকারী সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে।

রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান: যে দলের লোকই হামলা, ভাঙচুর, দখলদারি কিংবা নির্যাতনে জড়িত থাকুক, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার: অতীতে কিংবা বর্তমানে রাজনৈতিক কারণে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিপূরণ ও আইনানুগ প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধা: বিরোধী দল রাষ্ট্রের শত্রু নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের সমালোচনা, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি: দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে, কোনো নেতাকর্মী অপরাধ করলে তাকে দলীয় পরিচয়ের কারণে রক্ষা করা হবে না।

নাগরিক ঐক্য: সাধারণ মানুষকে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শত্রুতে পরিণত করা বন্ধ করতে হবে। একজন মানুষের রাজনৈতিক মতাদর্শ তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ হতে পারে, কিন্তু তা তাঁকে অন্যের অধিকার হরণ করার অনুমতি দেয় না।

এই পরিবর্তনগুলো রাতারাতি আসবে না। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নাগরিক সচেতনতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে এর সূচনা সম্ভব। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল কোন দল ক্ষমতায় আছে, কেবল তা নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা দল কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা দল কতটা গণতান্ত্রিক আচরণ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষমতায় থাকা দলের পরীক্ষা হয় বিরোধীমত ও নাগরিক অধিকারকে কতটা সম্মান করে, তার মাধ্যমে। আর বিরোধী দলের পরীক্ষা হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, আইনের শাসন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আচরণের প্রতি তার অঙ্গীকারের মাধ্যমে। যে দল ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, সে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। আবার যে দল বিরোধী দলে থেকে সহিংসতা ও প্রতিহিংসাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, সেও গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।

অতএব, বাংলাদেশের সংকটের সমাধান কেবল ক্ষমতার হাতবদলে নয়, ক্ষমতার চরিত্র বদলানোর মধ্যে। আমি চাই, আওয়ামী লীগ তার অতীত ও বর্তমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি দাবি করুক, কিন্তু প্রতিশোধের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করুক। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের নেতাকর্মীদের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিচার দাবি করুক, কিন্তু ক্ষমতার সুযোগে অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিক। অন্য সব রাজনৈতিক দলও একই নীতি অনুসরণ করুক।

যে অন্যায় আজ আমার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হচ্ছে, আগামীকাল তা আমার বিরুদ্ধেও হতে পারে— এই উপলব্ধি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে তৈরি হওয়া জরুরি। কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। পুলিশ, প্রশাসন, আদালত, সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদও কোনো দলের একক অধিকারভুক্ত নয়। এগুলো জনগণের আমানত। তাই জনগণের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানোর অধিকার কারও নেই।

প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চাই

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘাত, অনিশ্চয়তা ও বিভাজনের মূল্য দিয়ে আসছে। তারা আর এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে চায় না, যেখানে প্রতিটি ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন করে শত্রুর তালিকা তৈরি হবে।

তারা চায় নিরাপদে ঘুমাতে, নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে, যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পেতে, সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে এবং রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পেতে। তারা চায়, অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিচার হোক। নিরপরাধ মানুষ যে দলেরই হোক, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।

রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে, জনগণ কোনো দলের প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি।

রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে, জনগণ কোনো দলের প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি।

একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন— অতীতের অন্যায়ের বিচার না হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না, কিন্তু অতীতের অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নতুন অন্যায় শুরু হলে ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠিত হয় না।

আজ যদি আওয়ামী লীগ নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে, তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দল অতীতে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকলে তাদেরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে কোনো দলের নাম ব্যবহার করে কেউ নতুন করে অন্যায় করলে তারও বিচার হোক।

কেউ যেন বলতে না পারে, ক্ষমতায় থাকলে বিচার নেই, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে নিরাপত্তা নেই।

আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ প্রয়োজন, যেখানে সরকার বদলাবে, কিন্তু নাগরিকের অধিকার বদলাবে না; রাজনৈতিক দল বদলাবে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলাবে না; ক্ষমতার পালাবদল হবে, কিন্তু প্রতিশোধের পালাবদল হবে না।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখার আগে প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে না, আর কোনো নাগরিককে বেঁচে থাকার জন্য ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়— বাংলাদেশই আমাদের সবার ঠিকানা।

দেশ বাঁচলে রাজনীতি থাকবে, মানুষ বাঁচলে দল থাকবে। কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে যদি দেশ ও মানুষের ভবিষ্যৎ পুড়ে যায়, তাহলে ক্ষমতার সিংহাসনে বসে লাভ কী? ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু অন্যায়ের ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী। তাই প্রতিশোধ নয়— ন্যায়বিচার চাই; দলীয় আধিপত্য নয়— আইনের শাসন চাই; বিভাজন নয়— মানুষের মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad