জাহাঙ্গীর-মান্নানের অর্থায়নে তাদের গুণ্ডাবাহিনী শ্রমিক সেজে তাণ্ডব চালাচ্ছে: রাশেদ

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচির অর্থায়নে তাদের লোকজন শ্রমিক সেজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন। পোস্টে রাশেদ লেখেন, “গাজীপুরে ফ্যাসিস্ট মেয়র (সাবেক) জাহাঙ্গীর আলমের অর্থায়নে ও তার গুণ্ডাবাহিনী শ্রমিক সেজে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আর মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভার অঞ্চলে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচির অর্থায়নে শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা চালানো হচ্ছে।”
রাশেদ খাঁন জানান, আজকে (বুধবার) সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কার্যকর হবে। জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন মজুরি পাবেন শ্রমিকরা। এ বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ একমত হয়েছে।
তিনি লেখেন, “এরপরও যদি কোনো আন্দোলন চলে, তবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে সেই আন্দোলন থামানো সরকারের দায়িত্ব। গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার জনগনের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হলো শিল্পকারখানার নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।”
রাশেদ খাঁন আরও লেখেন, “প্রকৃত শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার পরেও শ্রমিক আন্দোলনের নামে ফ্যাসিস্টদের যেকোনো ষড়যন্ত্র ও আস্ফালন মোকাবিলা ও দমন করতে বিএনপি সরকার বধ্যপরিকর।”
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে বিক্ষোভ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ করছেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে। মিরপুর ও সাভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আন্দোলনে সহিংসতার অভিযোগে বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের সময় সোমবার আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশের তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে সীমান্তের ওপার থেকেও আন্দোলনে উসকানি ও অর্থায়ন দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, আন্দোলনে বহিরাগত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্যরা শ্রমিকের ছদ্মবেশে অংশ নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বার্তা ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর
শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যেই আজ বুধবার নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভায় আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে বর্ধিত মজুরি পাবেন শ্রমিকরা।
নতুন চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানীর সভাপতিত্বে সভায় মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে চেয়ারম্যান জানান, পরবর্তী সভায় মালিক ও শ্রমিকপক্ষের পাশাপাশি নিরপেক্ষ সদস্যও মজুরি প্রস্তাব দেবেন। এরপর এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।
গত রোববার মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে নিরপেক্ষ সদস্য করা হয়েছে। স্থায়ী মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন আসিফ আইয়ুব ও আনোয়ার হোসেন। পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার।
এর আগে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ আশফাকুর রহমানকে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) পদে বদলি করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন সৈয়দ আজাদ সুবহানী। তবে বদলির কারণ সম্পর্কে প্রজ্ঞাপনে কিছু বলা হয়নি।
সাভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন, গাজীপুরে সংঘর্ষ
আজ বুধবার সকালে সাভারের হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। একপর্যায়ে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন শ্রমিকরা।
এ ঘটনায় সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলামসহ কয়েকজন আহত হন। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, “সকালে পদ্মার মোড় এলাকায় দুই দিক থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ প্রতিরোধ করে। এ সময় আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। তাঁদের হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন।”
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা-শিববাড়ী সড়কের বাসন থানার সামনে সকাল পৌনে নয়টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বেলায়েত হোসেন বলেন, “শ্রমিকরা বাসন থানার দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।”
সকাল থেকে শতাধিক শ্রমিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতির কারণে আশপাশের কয়েকটি কারখানা বন্ধ রাখা হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, বুধবার থেকে গাজীপুরের সব পোশাক কারখানা খোলার কথা ছিল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৮ প্লাটুন এসআরবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় দল কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফ হোসেন।
ফতুল্লায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পালটাপালটি ধাওয়া
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় বুধবার সকালে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় পালটাপালটি ধাওয়া হয়। মাইক্রোফাইবার ও লিবার্টিসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। আশপাশের অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। এ সময় হাজীগঞ্জ-পোস্ট অফিস সড়কের কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানো হয়।
বিক্ষোভকারীরা শিবু মার্কেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশ বাধা দেয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে।
শিল্প পুলিশ-৪-এর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “মাইক্রোফাইবার কারখানার শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বেরিয়ে আশপাশের অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও বের করে আনার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আমরা যেকোনো মূল্যে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ করতে দেওয়া হবে না।”
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, আগের দুই দিনের সড়ক অবরোধের ঘটনায় ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, কয়েকটি কারখানার শ্রমিক পরে কাজে ফিরেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট ও জালকুড়ি এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। রাজধানীর মিরপুরেও গত বৃহস্পতিবার থেকে আন্দোলন চলছিল। সেখানে কয়েক দিন ধরে সড়ক অবরোধ, কর্মবিরতি, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও আটকের ঘটনাও ঘটে।




















