উচ্চকক্ষ নিয়ে আলোচনা লংমার্চে হবে না, কমিটিতে আসুন— বিরোধী দলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি:  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজ
শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজ

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনসহ সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা কী হবে, সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো ওই কক্ষের বিবেচনায় যাবে কি না— এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে লংমার্চ করে সমাধান হবে না।

শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্বের আয়োজন করা হয় জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার এমনভাবে সংবিধান সংশোধন করতে চায়, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয় এবং তাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত থাকে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ও সমঝোতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিভক্তি নয়, সহযোগিতার ভিত্তিতে সংস্কার করতে চায় সরকার।

সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। গত ১৩ জুলাই সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের জন্য আরও পাঁচটি পদ রাখা হলেও তারা এখনো প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়নি।

বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। অন্যদিকে সরকার সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে। এ নিয়ে বিরোধের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। শনিবারও তাদের খুলনা-কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চ ছিল।

ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন

সেমিনারে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবিধানিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল দেশের অন্যতম বড় সাংবিধানিক সংকটের কারণ। ২০১১ সালে এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট বিধান থাকার পরও ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, যা দেশের সাংবিধানিক সংকট ও স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে।”

তিনি আরও বলেন, “পরবর্তীতে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা ছিল বাকশাল-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংস ও ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের মূল কারণ। যা পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল, যেখানে এ দেশের ছাত্র-জনতা একতাবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটায়।”

ভবিষ্যতে দেশে যেন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বা স্বৈরশাসকের উত্থান না ঘটে, সে জন্য রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে টেকসই সংস্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ভবিষ্যতে যাতে বাংলাদেশে আর কোনো দিন স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা স্বৈরাশাসকের উৎপত্তি হতে না পারে, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত করে ঐকমত্য ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যাতে তা টেকসই হয়।”

গণতন্ত্রের সুরক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে গণতন্ত্র পাহারা দেওয়ার জন্য কার্যকর ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।”

প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জবাবদিহি না থাকলে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও একসময় স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি। তার দাবি, বর্তমানে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং আইন মন্ত্রণালয় শুধু ‘পোস্ট অফিসের’ ভূমিকা পালন করছে।

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল নিয়েও বক্তব্য দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করেছিলেন— এমন বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন। তার মতে, তখন সাংবিধানিক শূন্যতার কারণে বিকল্প ছিল না। তবে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক চরিত্রে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা ছিল, যার প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাও একই চরিত্র ধারণ করেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সংস্কার প্রস্তাব

সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বর্তমান প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সরকারি দল বা বিরোধী দল— যেকোনো পক্ষ চাইলে অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকা জরুরি বলে মনে করেন আসিফ নজরুল। তার ভাষ্য, দুই পক্ষের সমঝোতা না থাকলে কী ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, তা সবার জানা।

রাষ্ট্রের উন্নয়নে কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। সরকারের উদ্দেশে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আপনারা কতগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়ে যান। আপনাদের কাছে অনেক বড় একটা সুযোগ এসেছে।’

তার মতে, ভালো নীতি, পর্যাপ্ত সম্পদ কিংবা সৎ নেতৃত্ব থাকলেও কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দুটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— উচ্চ আদালত ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ জন্য উচ্চ আদালতকে স্বাধীন ও ক্ষমতাশালী করার পাশাপাশি স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়ন, ধাপে ধাপে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ উচ্চ আদালতের হাতে দেওয়া এবং সংসদীয় কমিটির তলব করার ক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন আসিফ নজরুল।

১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ওই সংবিধানের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিলে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া। এ সমস্যা সমাধানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি। সংবিধান প্রণয়নের সময় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ গণপরিষদের কয়েকজন সদস্য যে ভিন্নমত তুলে ধরেছিলেন, সেগুলোও পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

আসিফ নজরুলের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, বিচারপতি নিয়োগে আইন প্রণয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া। উচ্চকক্ষের সদস্যদের জন্য বেতন, গাড়ি ও বাড়ির সুবিধা না রাখার প্রস্তাবও দেন তিনি।

১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে পরস্পরবিরোধী মূল্যায়নের সমালোচনা করেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ১৭ বছর ধরে শুনতে হয়েছে, এই সংবিধান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংবিধান। এখন আবার একে সবচেয়ে নিকৃষ্ট বলা হচ্ছে। আবেগের বাইরে গিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে এর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তার মতে, সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে একটি দলের প্রাধান্য ছিল এবং জনগণের মতামত নেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। বিরোধী মতামতও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তবে ওই সংবিধানে প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানও ছিল। বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক আটক, কালো আইন প্রণয়ন ও জরুরি অবস্থা জারির সুযোগ না থাকার বিষয়গুলোকে ওই সংবিধানের শক্তিশালী দিক হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

আসিফ নজরুল বলেন, সংবিধান প্রণয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে এর অনেক বিধানে পরিবর্তন আনা হয়।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ ও আইনজীবী হাবিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad