মূল্যস্ফীতি কমলেই কি মানুষের জীবনযাত্রার সংকট কাটে?

কাজী আহমেদ শামীম
মূল্যস্ফীতি কমলেই কি মানুষের জীবনযাত্রার সংকট কাটে? লেখক: কাজী আহমেদ শামীম। প্রতীকী ছবি
মূল্যস্ফীতি কমলেই কি মানুষের জীবনযাত্রার সংকট কাটে? লেখক: কাজী আহমেদ শামীম। প্রতীকী ছবি

অর্থনীতিতে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। অর্থনীতির পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলে নীতিনির্ধারকেরা স্বস্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ সেই স্বস্তির প্রতিফলন খুঁজে পান না। চাল-ডাল, মাছ-মাংস, ভোজ্যতেল, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস ওঠে।

প্রশ্ন হচ্ছে— মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের জীবনযাত্রার সংকট কেন কমে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি বুঝতে হবে।

গত ১০ অক্টোবর দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার এক নিবন্ধে পার্থক্যটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) গবেষণার আলোকে নিবন্ধটি দেখিয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রায়ই এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা সাময়িকভাবে জনপ্রিয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর, ব্যয়বহুল এবং কখনো কখনো বৈষম্যবর্ধক হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ পর্যবেক্ষণ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। কারণ আমাদের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে মূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি, শুল্ক হ্রাস, বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার প্রকৃত সুফল কারা পাচ্ছেন, কতটা পাচ্ছেন এবং কত দিন পাচ্ছেন— সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়: দুটি ভিন্ন বাস্তবতা

মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর বৃদ্ধির হারকে বোঝায়। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় হলো একটি নির্দিষ্ট জীবনমান বজায় রাখতে একজন ব্যক্তি বা পরিবারের প্রয়োজনীয় মোট ব্যয়।

ধরা যাক, একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় আগে ছিল ৩০ হাজার টাকা। কয়েক বছরের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে একই ধরনের জীবনযাত্রা বজায় রাখতে এখন প্রয়োজন হচ্ছে ৪৫ হাজার টাকা। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নেমে এলেও পরিবারটির ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের ৩০ হাজার টাকায় ফিরে যাবে না। কেবলমাত্র দাম বাড়ার পূর্বের হার কমবে মাত্র। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি হ্রাস মানেই কোনো পণ্যের মূল্যস্তর হ্রাস নয়।

বাংলাদেশে এই সাধারণ অর্থনৈতিক সত্যটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। মূল্যস্ফীতির হার কমাকে কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমে গেছে। অথচ প্রকৃত সমস্যা অনেক গভীর। পরিবারের আয় যদি পণ্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমলেও ক্রয়ক্ষমতার সংকট বরং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে— সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান গড় ভোক্তার ব্যয়ের ভিত্তিতে তৈরি হয়। কিন্তু সব পরিবারের ব্যয়ের কাঠামো এক নয়। নিম্ন আয়ের পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় করে। উচ্চ আয়ের পরিবারের ব্যয়ের কাঠামো তুলনামূলকভাবে বহুমুখী। ফলে একই মূল্যস্ফীতি বিভিন্ন আয়শ্রেণির মানুষের ওপর ভিন্ন প্রভাব ফেলে।

দরিদ্রের মূল্যস্ফীতি কি ধনীর মূল্যস্ফীতির সমান?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিতে এই প্রশ্নটির যথেষ্ট গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। ধরা যাক, একটি নিম্ন আয়ের পরিবার মাসিক আয়ের ৬০ শতাংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় করে। অন্যদিকে একটি উচ্চ আয়ের পরিবার একই খাতে ব্যয় করে আয়ের ২০ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে প্রথম পরিবারটির ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পড়বে। অর্থাৎ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার একই হলেও তার সামাজিক অভিঘাত সমান নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চাল-ডাল, আটা-আলু, পেঁয়াজ-ডিম, মাছ, ভোজ্যতেল ও শাকসবজির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কল্যাণকে প্রভাবিত করে। তবে খাদ্যের পাশাপাশি আরও কিছু ব্যয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাসাভাড়া, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

এসব ব্যয়ের অনেকগুলোই সহজে কমানো যায় না। একজন মানুষ মাছের পরিবর্তে ডাল খেতে পারেন, কিন্তু অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা বন্ধ করতে পারেন না। বাসাভাড়া বেড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সস্তা বাসা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না। সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বাড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট কেবল বাজারের সমস্যা নয়; এটি মানুষের সক্ষমতা, সুযোগ ও জীবনমানের সংকট।

মূল্য নিয়ন্ত্রণ: জনপ্রিয় কিন্তু কতটা কার্যকর?

কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সরকারের সাধারণ প্রতিক্রিয়া হলো বাজার তদারকি জোরদার করা, আমদানি শুল্ক কমানো, নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা কিংবা ভর্তুকির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো। এসব পদক্ষেপের কিছু ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা রয়েছে। বিশেষত বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি বা প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণ থাকলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

কিন্তু প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধিকে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। দ্য ইকোনমিস্টের নিবন্ধে আইএমএফের গবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে— মূল্য কমিয়ে রাখতে সরকার যে অর্থ ব্যয় করে, তার একটি বড় অংশ দরিদ্র মানুষের পরিবর্তে তুলনামূলক সচ্ছল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে।

এর কারণ সহজ। ধনী পরিবার সাধারণত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, বেশি জ্বালানি ভোগ করে এবং বেশি পণ্য ও সেবা ক্রয় করে। ফলে নির্বিচার মূল্যভর্তুকির আর্থিক সুবিধাও তারা বেশি পেতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

একটি নিম্ন আয়ের পরিবার সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। অন্যদিকে বড় বাসস্থান, একাধিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সরঞ্জামসমৃদ্ধ পরিবার অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। যদি উভয় পরিবারকে সমান হারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তাহলে মোট অর্থের হিসাবে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার অধিক সুবিধা পাবে। সুতরাং ভর্তুকি সামাজিক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু তার নকশা ভুল হলে সেটি বৈষম্যও বাড়াতে পারে।

ভর্তুকি নিয়ে আলোচনা সাধারণত দুটি বিপরীত অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এক পক্ষ ভর্তুকিকে জনগণের কল্যাণের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। অন্য পক্ষ এটিকে সরকারি অর্থের অপচয় ও অর্থনৈতিক অদক্ষতার উৎস হিসেবে দেখে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।

ভর্তুকি ভালো না খারাপ— এটি মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ভর্তুকি কাকে দেওয়া হচ্ছে, কেন দেওয়া হচ্ছে, কত দিন দেওয়া হচ্ছে এবং এর বিকল্প ব্যবস্থা কী। দরিদ্র পরিবারের ন্যূনতম বিদ্যুৎ ব্যবহার, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচার ভর্তুকি চালু থাকলে তার কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।

  • প্রথমত, ভর্তুকির আর্থিক চাপ সরকারি বাজেটের ওপর পড়ে।
  • দ্বিতীয়ত, বাজারে প্রকৃত ব্যয়ের যে বার্তা বা সংকেত, সেটিও দুর্বল হয়ে যায়।
  • তৃতীয়ত, উৎপাদক ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রণোদনা কমতে পারে।
  • চতুর্থত, সরকারি সম্পদ এমন জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যায়, যাদের প্রকৃতপক্ষে সহায়তার প্রয়োজন নেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক বিবেচনা। সরকারের কাছে দৃশ্যমান মূল্যহ্রাস অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা সংস্কারের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয়। কারণ দাম কমানোর ঘোষণা তাৎক্ষণিকভাবে প্রচার করা যায়। কিন্তু দক্ষ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুফল দৃশ্যমান হতে সময় লাগে। ফলে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়।

বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো— নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কতটা আন্তর্জাতিক বাজার, উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ সংকটের কারণে ঘটে এবং কতটা অভ্যন্তরীণ বাজারের অদক্ষতা, প্রতিযোগিতার ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল।

আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্য, বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় ও আমদানি অর্থায়নের সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে দেশীয় কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা, সংরক্ষণ অবকাঠামো, পরিবহন, বাজারতথ্য এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী থাকলেই বাজার অদক্ষ— এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। পরিবহন, সংরক্ষণ, অর্থায়ন ও বিপণনের জন্য মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন রয়েছে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়, বাজারতথ্য অস্বচ্ছ থাকে কিংবা কোনো গোষ্ঠী অস্বাভাবিক বাজারক্ষমতা অর্জন করে। এ কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পাইকারি ও খুচরা বাজারের মূল্যতথ্য প্রকাশ, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নয়ন এবং সরবরাহব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার মূল্য স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

পণ্যের মূল্য কমানো, নাকি ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো?

জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সম্ভবত এটিই। সরকার কি সবার জন্য পণ্যের দাম কমিয়ে রাখবে, নাকি যাদের প্রকৃত প্রয়োজন, তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে?

প্রথম পদ্ধতিটি সহজে দৃশ্যমান এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক, তবে বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন।

দেশে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করে উপকারভোগী নির্বাচন, সহায়তার পরিমাণ, নিয়মিততা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সুবিধা পৌঁছানোর ওপর।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হতে পারে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার পরিমাণ সমন্বয় করা। ধরা যাক, একটি পরিবার মাসে দুই হাজার টাকা নগদ সহায়তা পায়। কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে একই দুই হাজার টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে নামমাত্র সহায়তা অপরিবর্তিত থাকলেও প্রকৃত সহায়তা কমবে। এ কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমন্বয়ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।

তবে শুধু নগদ সহায়তাই যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গণপরিবহন ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের মতো মৌলিক সেবায় কার্যকর সরকারি বিনিয়োগ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মধ্যবিত্তের অদৃশ্য সংকট

বাংলাদেশের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ। এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকে। আবার তাদের আয় এত বেশি নয় যে, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সহজে বহন করতে পারে।

বিশেষত নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও অনিয়মিত আয়ের পরিবারগুলো দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমস্যায় পড়তে পারে। এদের সমস্যা সব সময় সরকারি দারিদ্র্য পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।

একটি পরিবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থান করলেও সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা বা বাসাভাড়ার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সঞ্চয় হারাতে পারে, ঋণগ্রস্ত হতে পারে কিংবা প্রয়োজনীয় ভোগপণ্য বা সবা কমাতে বাধ্য হতে পারে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিলে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের প্রকৃত সামাজিক মাত্রা বোঝা সম্ভব নয়।

আমাদের যা করণীয়

বাংলাদেশের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত নীতিকাঠামো প্রয়োজন।

  • প্রথমত, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বিভিন্ন আয়শ্রেণির জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়মিত পরিমাপ ও প্রকাশ করা উচিত। বিশেষত নিম্ন আয়, নিম্নমধ্যবিত্ত ও শহুরে ভাড়াটিয়া পরিবারের ব্যয়ের কাঠামো পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
  • দ্বিতীয়ত, নির্বিচার মূল্যভর্তুকি থেকে ধীরে ধীরে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার দিকে অগ্রসর হতে হবে। তবে এই পরিবর্তন এমনভাবে করতে হবে, যেন দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির শিকার না হয়।
  • তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা, উপকারভোগী নির্বাচন ও সহায়তার প্রকৃত মূল্য নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও স্বাধীন মূল্যায়ন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
  • চতুর্থত, বাজারে প্রতিযোগিতা ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রশাসনিক অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি বাজার সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না।
  • পঞ্চমত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গণপরিবহনের মূল্যনীতি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যেন প্রকৃত ব্যয়, সেবার দক্ষতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
  • ষষ্ঠত, মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
  • সপ্তমত, নীতিনির্ধারণে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শেষ কথা

জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য কেবল মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে বিচার করা যায় না। মূল্যস্ফীতি কমানো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো— মানুষ তার আয় দিয়ে কতটা খাদ্য কিনতে পারছে, সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারছে কি না এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারছে কি না।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে তাই একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় শুধু— কীভাবে পণ্যের দাম কমানো যায়, বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত— কীভাবে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জীবনমান টেকসইভাবে উন্নত করা যায়? কারণ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত পরিমাপক কেবল বাজারের মূল্যতালিকা নয়, বরং সেই মূল্যতালিকার সামনে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ মানুষ কতটা নিশ্চিন্তে নিজের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারেন।

সার কথা হলো— মূল্যস্ফীতি কমানো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার শর্ত, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই হওয়া উচিত অর্থনৈতিক নীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য।

লেখক: কলামিস্ট ও গল্পকার

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad