রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি: আয়াশসহ ৪ জন রিমান্ডে

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার আল নূর মোহাম্মদ আয়াশসহ চারজনকে পৃথক মেয়াদে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে উসকানি এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে ধর্মীয় অনুভূতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রিমান্ডে পাঠানো অন্য তিন আসামি হলেন— মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) ও খন্দকার মারজিয়া খন্দকার (২৭)। আদালত আয়াশ (২৯) ও সাকিবুলের তিন দিন করে এবং সুজন ও মারজিয়ার দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
রোববার (১১ অক্টোবর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল গাফফার আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম পৃথক মেয়াদে তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আসামিদের কর্মকাণ্ড সরকারের বিরুদ্ধে একধরনের যুদ্ধ ঘোষণা। তারা বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং দেশের সম্প্রীতির সংস্কৃতি বিনষ্ট করছেন। ‘মবের’ মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘মামলার অপর আসামি মারজিয়া। তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতির মুখে কালি লাগিয়ে দিলো। সামনে দুর্গাপূজা। একটা উসকানি দিলো।’ তিনি আরও বলেন, সরকারের কাজ দেশে উন্নয়ন করা, আর আসামিরা উন্নয়নে বাধা দিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য ভাইরাল হওয়া বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ওমর ফারুক ফারুকীর অভিযোগ, গত ১০ অক্টোবরের ঘটনায় আসামিরা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি ধর্মীয় উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের পেছনে কোনো চক্র রয়েছে কি না এবং এ ঘটনায় আর কারা জড়িত, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন বলেও আদালতে যুক্তি দেন তিনি।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, এক নম্বর আসামি আয়াশ একটি রাজনৈতিক দলের সভাপতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক আগে থেকেই ব্রাহ্ম ধর্ম পালন করতেন। রাষ্ট্রপক্ষের উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগও সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় আসামিদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে আইনজীবী বলেন, ‘জুলাই আমাদের মুকুট। এটাকে অস্বীকার করলে চলবে না। আয়াশ ও সাকিবুল জুলাই যোদ্ধা। তারা একেবারেই মাঠ পর্যায়ের কর্মী। তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যে উক্তির অভিযোগ বলা হচ্ছে তা একেবারেই সত্য না।’
এর জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘সবাই জুলাই যোদ্ধা। জুলাই যোদ্ধা বলে কি সকল অপরাধ ক্ষমা হয়ে যাবে? তার সকল অপরাধ কি মাপ হয়ে যাবে?’ নিজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি এই আদালতের পিপি। তাই বলে কি আমি সব কিছু করতে পারব? আমি কি আইনের ঊর্ধ্বে? আপনারা দেশকে ভালোবাসুন। কিন্তু অরাজকতা করবেন না। আর কিছু কিছু দল আছে মনগড়া। সকল রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত না। স্বামী সভাপতি, স্ত্রী সেক্রেটারি এমন অনেক রাজনৈতিক দল আছে।’
এর আগে গতকাল শনিবার সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামের একটি সংগঠনের সদস্যসচিব আয়াশসহ কয়েকজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দিতে যান। সেখান থেকে আয়াশ ও তার সঙ্গীদের আটক করে পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচি, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়াসহ নানা ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন আয়াশ।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সেগুনবাগিচা এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর অংশ হিসেবে শিল্পকলা একাডেমির সীমানাপ্রাচীরের বিপরীত পাশের ফুটপাত সাজানো হয়। সেখানে নতুন ডাস্টবিন ও বসার বেঞ্চ স্থাপনের পাশাপাশি দেয়ালে ১০ জন গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। গত ৫ অক্টোবর সকালে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম।
দেয়ালে যাদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম ও হুমায়ূন ফরীদি। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতিও রয়েছে। তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্তি এবং কোনো নারী ব্যক্তিত্বকে স্থান না দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে।


















