ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কঠোর অবস্থানে ডিএনসিসি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ২০: ০৬
মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে দখল করে দোকান নিয়ে বসেছেন হকাররা। ফাইল ছবি
মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে দখল করে দোকান নিয়ে বসেছেন হকাররা। ফাইল ছবি

রাজধানীর ফুটপাত দখল করে অবৈধ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির দীর্ঘদিনের চক্র ভাঙতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নগরবাসীর চলাচলের পথ দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি দখলদারদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

রাজধানীর শেওড়াপাড়া ও মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত এক সাংবাদিককে আজ বৃহস্পতিবার দেখতে যান ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। সেখানে তিনি বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ‘আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও’ ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে।

এর আগে গতকাল বুধবার মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে যারা নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাধা বা হামলা মেনে নেওয়া হবে না।

মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে দখল করে বসানো হকারদের দোকান। ফাইল ছবি
মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে দখল করে বসানো হকারদের দোকান। ফাইল ছবি

মিরপুর-১০-এর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ডিএনসিসি ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে জানিয়ে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, তদন্তের ভিত্তিতে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায়ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চলছে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, নগরবাসীর প্রতি সিটি করপোরেশনের নৈতিক দায়িত্বও। তাই দায়িত্ববোধ থেকেই অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।

ডিএনসিসি জানিয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর সেখানে গাছ লাগিয়ে নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন প্রশাসক।

মিরপুরবাসীর উদ্দেশে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে, সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চান। ভবিষ্যতে কারও ইন্ধনে আবার ফুটপাত দখলের চেষ্টা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘ফুটপাত জনগণের চলাচলের পথ। এখানে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, হকারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও জনসভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে কেউ ফুটপাতে বসবেন না। তাদের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে বৈধভাবে ব্যবসার সুযোগ দিতে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ডও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর অনেকেই সেই সিদ্ধান্ত মানেননি।

এদিকে মিরপুর-১০ নম্বরে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত দুই হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চার মামলার তিনটি হয়েছে মিরপুর মডেল থানায় এবং অন্যটি কাফরুল থানায়।

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন বাদী হয়ে গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে একটি মামলা করেছে। পুলিশ বাদী হয়ে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে আরেকটি মামলা করেছে। ট্রাফিক পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি মামলা করেছে। তিন মামলায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন করে আসামি করা হয়েছে।

অন্যদিকে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সিটি করপোরেশন থানায় একটি এজাহার দিয়েছে। ওই মামলায় ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীর নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হকার উচ্ছেদের সময় ডিশ লাইনের তার খুলে ফেলার একপর্যায়ে একটি বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যায়। সেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা পাশের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ট্রান্সফরমারটিতে বিস্ফোরণ হলে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। এতে মার্কেটের পাঁচটি দোকান পুড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এরপর বিক্ষুব্ধ হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের সঙ্গেও হকারদের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। একটি পুলিশের গাড়ির কাচও ভাঙচুর করা হয়।

পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কাজে যারা বাধা দেয়, তারা ফ্যাসিজমের দোসর। এ ছাড়া সাংবাদিক, সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলাকারীরাও ফ্যাসিবাদের দোসর। তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব জায়গা দখল করে আছে৷ কাউকে অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না।’

নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার চলমান উচ্ছেদ অভিযান কোনো বাধার মুখে বন্ধ হবে না উল্লেখ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, যেকোন মূল্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে।’

মিরপুর-১০-এর অভিযানকে কেন্দ্র করে হামলার বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ফুটপাত দখলকারীরা ও তাদের সহযোগীদের ইন্ধনে এ হামলা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। পরে মিরপুরের সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা সরে যায় বলেও জানান তিনি।

শফিকুল ইসলাম খান বলেন, হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে। তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাতেও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, অরাজকতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। ফুটপাত দখলমুক্ত করার এ কার্যক্রম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বাধায় থেমে যাবে না। নগরবাসীর স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অরাজকতা ও হামলার সঙ্গে জড়িত কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার মিরপুর-১০ ও মিরপুর-২ নম্বর এলাকায় ফুটপাতে কোনো হকারকে দেখা যায়নি। উচ্ছেদ অভিযানের পর পড়ে থাকা ভাঙা চৌকি ও আবর্জনা পরিষ্কার করতে দেখা গেছে ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাতও হকারমুক্ত ছিল। তবে সেখানে হকারদের ঝোলানো তার, লাইটের ফোল্ডার ও ভাঙা চৌকি পড়ে থাকতে দেখা যায়। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মিরপুর-২ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের ফুটপাতেও কোনো হকার ছিলেন না। তবে মিরপুর মডেল থানার প্রধান ফটকের সামনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। তাদের কয়েকজন থানার ভেতরে থাকা স্বজনদের খোঁজ নিতে অপেক্ষা করছিলেন।

ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সংস্থাটির অবস্থান স্পষ্ট— নগরবাসীর চলাচলের পথ হিসেবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। উচ্ছেদ অভিযানে বাধা, হামলা কিংবা পুনরায় দখলের চেষ্টা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এখন ডিএনসিসির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো উচ্ছেদ অভিযানকে নিয়মিত ও কার্যকর রাখার পাশাপাশি দখল পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানো, দখলের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা। প্রশাসকের কঠোর ঘোষণার পর সেই অবস্থান মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement