বিএনপিতে একাকার সাকি-ববি-নুর, হঠাৎ দল খুলে নিভু নিভু তারা

রাজনীতিবিদ হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে ছিলেন বরাবরই পিছিয়ে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে ‘ঐক্য’ গড়ে ভোটের বৈতরণীও পার হয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ববি হাজ্জাজ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর। শুধু সংসদেই নয়, এই তিনজন সরাসরি স্থান পেয়েছেন তারেক রহমানের মন্ত্রিসভাতেও।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ অবশ্য দলীয় প্রতীকেই ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরেই তার দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন জোটের শরিক দল হিসেবে রাজনীতি করে আসছে। এবারেও বিএনপির সঙ্গে ‘ঐক্য’ স্থাপন করে ভোট করেছেন পার্থ। শুরুতে না হলেও ছয় মাসের মাথায় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন তিনিও।
এদিকে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় আত্মপ্রকাশ ঘটেছে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের। কেউ সামনের সারিতে দুয়েকজন পরিচিতমুখ রেখে যাত্রা শুরু করে। কেউ আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘সুবিধা’ পাওয়ার আশায় নামসর্বস্ব দল চালু করে রাজনীতিতে নাম লেখান। তবে মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান কোনো শক্তিশালী জনভিত্তি বা ভোট ব্যাংক না থাকায় এই দলগুলোর বড় একটি অংশ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কেউ আবার নিবন্ধনের বাধা পার করতে না পেরে নির্বাচনে লড়তেই পারেননি।
রাজনীতির মাঠের চিত্র বলছে, ঢাকঢোল পিটিয়ে মাঠে কিছু হাইপ্রোফাইল রাজনৈতিক উদ্যোগ ও ব্যক্তিভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বর্তমানে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ও কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। কেউ আবার ইস্যুভিত্তিক ঘরোয়া কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
বিএনপির কাঁধে ভর করে সংসদে, মন্ত্রিসভায় তারা ৩ জন
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন থাকলেও ভোটের মাঠে সুবিধা করার মতো অবস্থা ছিল না গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, সাবেক ডাকসু ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর বা এনডিএমের ববি হাজ্জাজদের। তৃণমূলে নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী না হওয়ায় টকশো আর ব্যক্তিগত পরিচিতি দিয়েই মাঠে টিকে ছিলেন তারা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলের শেষ ভাগে অবশ্য সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে ছিলেন এসব নেতা। এবারে ভোটের সময় বিএনপির সঙ্গে সখ্য ও আসনভিত্তিক সমঝোতা তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। সংসদের পর মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পেয়েছেন তারা।
জয়ের দেখা পেয়েই মন্ত্রিসভায় সাকি

দীর্ঘকাল ধরে রাজপথে বাম-গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকা জোনায়েদ সাকির দল গণসংহতি আন্দোলন বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত। তবে নির্বাচনি বাক্সে আসন জয়ের মতো নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ছিল সীমিত। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন ও রাজনৈতিক সমঝোতার ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এদিকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই জোনায়েদ সাকি সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে, দলীয় শক্তির চেয়ে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ আর দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে বিএনপির সুনজরে থাকায় কপাল খুলেছে জোনায়েদ সাকির।
মামুনুল হককে হারিয়ে কপাল খুলল ববি হাজ্জাজের

একসময় দেশে নানা কারণে আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুসা বিন শমসের। তার ছেলে ববি হাজ্জাজের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। দীর্ঘদিন দলের ব্যানারে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করলেও ভোটের বাস্তব সমীকরণে শেষ পর্যন্ত বিএনপির হাত ধরতে হয় ববিকেও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ববি হাজ্জাজ মনোনয়ন পান ঢাকা-১৩ আসনে। এ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। তাকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা, মামুনুল হকের মতো ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে আনার ‘পুরস্কার’ হিসেবেই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই মিলেছে ববি হাজ্জাজের।
ক্ষতবিক্ষত গণঅধিকারে নুরই সর্বেসর্বা

ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করে গণঅধিকার পরিষদ। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার পরিষদের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই দল নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায়। নুরের বন্ধু, সহপাঠী ও একসঙ্গে রাজপথ থেকে উঠে আসা অনেক নেতাই গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে গেছেন। দলটির নেতাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও কখনো কখনো প্রকাশ্যে এসেছে। তবে নুর তার দল নিয়ে অটল ছিলেন রাজনীতির মাঠে।
রাজপথের দমনপীড়ন ও একাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়া নুর শেষ পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ভিড়েই নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন নিশ্চিত করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে। মন্ত্রিসভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
নুরের দলের আরেক নেতা রাশেদ খাঁন অবশ্য নির্বাচনের আগে সরাসরি বিএনপিতেই যোগ দেন। ঝিনাইদহ-৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন তিনি। তবে ভোটের মাঠে ভাগ্য খোলেনি রাশেদের, নির্বাচনে হেরে যান জামায়াতের প্রার্থী মতিয়ার রহমানের কাছে। পরে অবশ্য সচিব মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী তাকে তার রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
নিভু নিভু করছে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কৃত হন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ। পরে সমমনা পেশাজীবী ও রাজনীতিকদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক মোর্চা গঠনে হাত দেন তিনি।
দেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ইলিয়াস কাঞ্চনকে চেয়ারম্যান করে এবং নিজে মহাসচিব পদে থেকে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশের (জেপিবি)’ ব্যানারে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন শওকত মাহমুদ।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না ইলিয়াস কাঞ্চনের। পেশাজীবী সমাজ ও সরকারবিরোধী ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে দলীয় পরিচয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দেওয়া হলেও বর্তমানে এই দলের দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা বা মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
এদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গত ৭ ডিসেম্বর শওকত মাহমুদকে রাজধানীর মালিবাগ এলাকা থেকে আটক করে একই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর কারাবন্দি শওকত মাহমুদকে গত ৩০ মার্চ সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

লম্বা সময় কারাবন্দি থাকার পর গত ২৬ কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান শওকত মাহমুদ। তবে আজ পর্যন্ত দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা যায়নি। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইলিয়াস কাঞ্চন ও শওকত মাহমুদ দুজনেই অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
দল ‘গোছাচ্ছে’ বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি
অর্থ কেলেঙ্কারি ও ডেসটিনি মামলার দীর্ঘ কারাবাস শেষে মুক্ত হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসার চেষ্টা করেন ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। দীর্ঘ কারাভোগের পর গত বছরের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানীতে এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। প্রথমে দলের নাম ‘বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি’ রাখা হলেও পরে বিভ্রান্তি এড়াতে নাম বদলে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি’।
অভিযোগ আছে, ডেসটিনির হারানো সাম্রাজ্য ও বিতর্কিত ইমেজকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আড়াল করতে রাজনীতিতে নাম লেখান রফিকুল আমীন। কিন্তু রাজনীতির মাঠে বিন্দুমাত্র সাড়া ফেলতে পারেনি দলটি। ফলে দলটির কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি নীরব ও কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে।

‘বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি’র সদস্য সচিব ফাতিমা তাসনিম বলেন, নির্বাচন কমিশন শর্ত মেনে নিবন্ধন দেওয়ার কথা বললেও ‘বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি’কে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি, অদৃশ্য কারণে গেজেট দেওয়া হয়নি। পাঁচবার তদন্ত করার পরও নিবন্ধন দেয়নি। অথচ কেউ কেউ অনশন করেও নিবন্ধন পেয়েছে। আসলে ষড়যন্ত্র করে আমাদের দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় পরবর্তী সময়ে দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে তাসনিম বলেন, আমাদের ৬৪ জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৫০ উপজেলায় কমিটি আছে। বাকিগুলো গুছিয়ে আগামী নির্বাচনের এককভাবে অংশ নিতে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করছি।
আমজনতার দল নিয়ে একাই লড়ছেন ‘আম তারেক’

গণঅধিকার পরিষদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ভাঙন ও রাজনৈতিক পথচলার ধারাবাহিকতায় আত্মপ্রকাশ করে ‘আমজনতার দল’। দলটির মূল উদ্যোক্তা ও সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন মো. তারেক রহমান, যিনি ছাত্র অধিকার পরিষদ ও গণঅধিকার পরিষদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘স্বনির্ভর অর্থনীতি ও সুশাসনে সমৃদ্ধি’ স্লোগান নিয়ে এবং ‘প্রজাপতি’ প্রতীক সামনে রেখে দলটি রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালায়।
দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে টানাপোড়েন ও ইসির গেটে আমরণ অনশনসহ নানা নাটকীয়তার জন্ম দিয়ে আলোচনায় আসেন তারেক। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত জনভিত্তি বা বড় কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। ফলে নতুন এই দলগুলোর ভিড়ে তারেকের ‘আমজনতার দল’ও নিভু নিভু করছে।
জানতে চাইলে মো. তারেক রহমান বলেন, আমাদের নিজেদের সাধ্যের মধ্যে সাংগঠনিক কাজ করার চেষ্টা করছি। সাার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকায় মাঠেও সেভাবে কর্মসূচি নেই। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন কমিটি দেওয়ার কাজ চলছে।
আগামী পর্বে পড়ুন- রাজনীতির উত্তাল স্রোত থেকে আড়ালে, কেমন আছেন চিরচেনা মুখেরা?






















