রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই চরম শোকের মুহূর্তে নিহত রামিসার পরিবারের পাশে সশরীরে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একটি দেশের সরকারপ্রধান যখন প্রোটোকল ভেঙে গভীর রাতে একজন সাধারণ নাগরিকের ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসেন এবং স্বজনহারা মা-বাবার কান্না মোছেন, তখন তার প্রভাব কেবল সেই একটি পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য অনেক গভীরে পৌঁছে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর ছোট্ট এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার প্রতি নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
গত ১৯ মে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের নিজেদের ভাড়া ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটে শিশু রামিসার কয়েক টুকরো লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের ভাষ্য, ওই দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর পালিয়ে যায়।
এ ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রামিসার পরিবারের বাসায় গিয়ে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। এ ধারাবাহিকতায় পাঁচ দিন তদন্ত করে ২৪ মে এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পুলিশ। ১ জুন এ হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। এদিন সোহেলকে আদালতে নেওয়া হয়।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, জাতি একটি সুষ্ঠু বিচার দেখতে যাচ্ছে। রাষ্ট্র যে জনগণের পাশে আছে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ এ ঘটনা।
সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই একটি ধারণা কাজ করে— ক্ষমতার সঙ্গে সাধারণ নাগরিকের দূরত্ব আকাশ সমান। কিন্তু রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর এ তাৎক্ষণিক গমন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। নিজের ব্যস্ত সূচি ও মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে গভীর রাতে পল্লবীর একটি সাধারণ বাসভবনে তার ছুটে যাওয়া প্রমাণ করে, প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রামিসার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে এটি এক বড় সান্ত্বনা যে তারা এই কঠিন লড়াইয়ে একা নন, স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের শক্তিশালী বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও আইনি বার্তাটি হলো— অপরাধীদের কোনো ছাড় নেই। সরকারপ্রধানের এ পদক্ষেপের ফলে পুরো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দেওয়া ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষের মাঝে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক জোরালো আশ্বাস। এটি অপরাধীদের মনেও এই ভয়ের বার্তা দেয়, সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায় করে পার পাওয়া অসম্ভব।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা
রামিসার বাবা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে তারা তাদের সন্তান হারিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কেবল এই দুঃখই ভাগ করে নেননি, বরং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের একটি নিরাপদ ও উন্নত আবাসনের আশ্বাস দিয়েছেন। এর চেয়েও বড় বিষয়— নিহত রামিসার বড় বোন রাইসার পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে নিয়েছেন। এটি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, রাষ্ট্র কেবল তাৎক্ষণিক সান্ত্বনা দেয় না, বরং ভুক্তভোগী পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
‘প্রধানমন্ত্রী যখন এসে আমার বড় মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন এবং আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ের দায়িত্ব নিলেন, তখন মনে হলো আমাদের মাথার ওপর অন্তত একজন অভিভাবক আছেন।’
— আব্দুল হান্নান মোল্লা (নিহত রামিসার পিতা)
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার ঘটনার পর বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মাঝে বেশ কিছু ইতিবাচক মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ বা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা অনেকাংশেই প্রশমিত হয়েছে। মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, রাস্তায় নেমে আন্দোলন না করলেও রাষ্ট্র স্বউদ্যোগে বিচার নিশ্চিত করতে পারে।
প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, যারা নিজেদের অসহায় মনে করত, তারা এখন মানসিক শক্তি পাচ্ছে। সরকারপ্রধানের এ মানবিক রূপ জনগণের মনে এই স্বস্তি এনে দিয়েছে— বিপদের দিনে রাষ্ট্র তাদের ফেলে যাবে না।
এ ঘটনার পর শিশু নিরাপত্তা ও পাড়া-মহল্লায় ভাড়াটিয়াদের ওপর নজরদারির বিষয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বেড়েছে।
শেষ কথা
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপি বা অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না, বরং তা মাপা হয় দেশের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ বোধ করছে তা দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর পল্লবীতে রামিসার বাসায় গমন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ ছিল না, এটি ছিল সাধারণ জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের এক জীবন্ত প্রতিশ্রুতি। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, দেশের সাধারণ মানুষের কান্না ও দীর্ঘশ্বাস রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
রামিসার মতো প্রতিটি ঘটনায় রাষ্ট্র ও সরকারকে পাশে থাকতে হবে, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা। সভাপতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ন্যাশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং সদস্য, ন্যাশনাল রিসার্চ সেল
























