ইউরোপ জুড়ে ক্ষোভের আগুন, বাড়ছে ডানপন্থিদের রাজনৈতিক পুঁজি
-10b8d5-480x270.webp)
শিক্ষা খাতের দাবি-দাওয়া দিয়ে শুরু হলেও ফ্রান্সের রাজপথ এখন উত্তাল জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে। কেবল ফ্রান্স নয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও সরকারি সেবার অবনতির বিরুদ্ধে রাজপথে মানুষ নেমেছে ইউরোপের কয়েকটি দেশে। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ, কোথাও তা রূপ নিয়েছে সহিংসতা ও লুটপাটে। আর এই অসন্তোষের রাজনৈতিক সুবিধা নিতে শুরু করেছে ইউরোপের ডানপন্থি ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলো।
ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবরে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় সংঘাতপূর্ণ বিক্ষোভ হয়েছে। স্কুলের অবস্থা ও সরকারি সেবায় ঘাটতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে পরে যুক্ত হয় জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষোভ। বিক্ষোভের একপর্যায়ে প্যারিস, মার্সেই, লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। হাজারও মানুষ গ্রেপ্তার হন এবং বহু পুলিশ সদস্য আহত হন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্রান্সের সরকার প্যারিসসহ কয়েকটি শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ জারি করেছে। বিক্ষোভকারীরা আগামী শনিবার নতুন বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এ অবস্থায় পুলিশ ও সেনা মোতায়েন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেছেন, ওই দিন ‘ব্যাপক’ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে।
-2d5aed.jpg)
একই ক্ষোভ, ভিন্ন দেশে
ফ্রান্সের বাইরে ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, স্পেন ও আলবেনিয়াতেও গত কয়েকদিন ধরে চলছে প্রতিবাদ-আন্দোলন-বিক্ষোভ। দেশভেদে প্রতিবাদের সূত্রপাতের কারণ আলাদা হলেও চলমান বিক্ষোভগুলোর মধ্যে একটি বিষয় সাধারণ— মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যবধান।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে শনিবার কয়েক হাজার মানুষ আবাসন ব্যয় ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের প্রতিবাদে মিছিল করেন। এতে দেশটির মধ্য-ডান সরকার নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।
ইতালিতে মিলানসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। বেলজিয়ামেও সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আলবেনিয়ায় আগে থেকেই চলা তরুণদের আন্দোলনও নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে রাজপথে নেমেছে তরুণ, শ্রমিক ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপে থাকা সাধারণ মানুষ।
এ অস্থিরতার পেছনে জ্বালানির দাম একটি বড় ভূমিকা রাখছে। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব ইউরোপে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
-98483f.jpg)
ক্ষোভের রাজনৈতিক সুবিধা কার?
ইউরোপের রাজপথের ক্ষোভ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন নয়, এটি ক্রমেই রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠছে। জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়া, আবাসন ব্যয়, দুর্বল সরকারি সেবা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা— এসব নিয়ে মানুষের ক্ষোভ যত বাড়ছে, মূলধারার দলগুলোর ওপর ততই চাপ তৈরি হচ্ছে। সেই জায়গাটি কাজে লাগাচ্ছে ডানপন্থি ও অন্যান্য জনতুষ্টিবাদী শক্তি।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট। মেরিন লা পেনের ন্যাশনাল র্যালি জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে তাদের রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর জনপ্রিয়তা কমার বিপরীতে লা পেনের দল অর্থনৈতিক ক্ষোভকে সরকারের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।
ফরাসি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সায়েন্সেস পো-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিলেস ইভালদি বলেন, ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপ জুড়ে জনতুষ্টিবাদী (পপুলিস্ট) রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ জ্বালানির দাম হলেও এর রাজনৈতিক অভিঘাত অনেক গভীর— মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপ সরাসরি সরকারের প্রতি আস্থার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে।
জার্মানিতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশটিতে কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) জ্বালানি সংকটকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া থেকে আবার গ্যাস আমদানির পক্ষে কথা বলছে। ইতালি ও পোল্যান্ডেও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার দাবি কিছু জনপ্রিয়তাবাদী শক্তির মধ্যে বাড়ছে।
মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ান স্টেকেল বলেন, অতীতের তথ্য থেকে উচ্চ জ্বালানি মূল্যের সঙ্গে ডানপন্থি এএফডির সমর্থনের একটি সম্পর্ক দেখা যায়। তার মতে, পপুলিস্ট দলগুলো প্রায়ই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে এমন একটি সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করে, যা সরকারের নীতির কারণে এড়ানো সম্ভব ছিল। অথচ এর পেছনে অনেক সময় বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কারণ কাজ করে।
-a70378.jpg)
বিশ্লেষকরা অবশ্য আরও বলছেন, ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতাকে শুধু অভিবাসন বা ডান-বাম রাজনৈতিক সংঘাত দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, ব্যয়বহুল আবাসন, দুর্বল সরকারি সেবা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের অনিশ্চয়তা।
এ অবস্থায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান আন্দোলনকে একটি একক ‘ইউরোপীয় বিদ্রোহ’ হিসেবেও দেখার পক্ষপাতী নন হেক প্যারিস বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমানো। তার মতে, বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভের কারণ ও রাজনৈতিক চরিত্র আলাদা। কিন্তু চাকরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের উদ্বেগে একটি অভিন্ন সুর রয়েছে। সামনে একাধিক জাতীয় নির্বাচন থাকায় এসব বিক্ষোভ অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসবে বলে মনে করছেন তিনি।
আলেমানোসহ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে দেশে চলমান বিক্ষোভ ইউরোপের মূলধারার রাজনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিক্ষোভের পেছনের বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে না পারলে ক্ষোভের ভাষা আরও ‘সরল’ হয়ে সরকারগুলোর ‘ব্যর্থতা’কে সামনে নিয়ে আসবে, যা সরকার পতনের দিকেও গড়াতে পারে। ডানপন্থি ও কট্টর জাতীয়তাবাদী ও পপুলিস্টদের জন্য এ পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র।
তবে লাভের হিসাব শুধু ডানপন্থিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রান্সে কট্টর বামপন্থি জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে চলমান বিক্ষোভ ইউরোপের রাজনীতিকে শুধু ডানদিকে ঠেলে দিচ্ছে না, বরং মধ্যপন্থি রাজনীতির দুই পাশেই চাপ বাড়াচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে’ তা নয়, বরং ‘এই ক্ষোভকে কারা সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক গল্পে পরিণত করতে পারছে’, সেটিই ইউরোপের আসন্ন নির্বাচনগুলোর সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, গার্ডিয়ান, এএফপি, এপি, ফ্রান্স২৪


















