সাগররা কি ফিরবে, নাকি শুধু একটি খবরই রয়ে যাবে?

কাজী আহমেদ শামীম
কুমিল্লার মোহাম্মদ সাগর। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার মোহাম্মদ সাগর। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

একজন বাবা জানতে চাইছেন, তার ছেলে বেঁচে আছে কি না। আপাতত তার আর কোনো দাবি নেই। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে যে ঋণ করা হয়েছে, তা কীভাবে শোধ হবে, সংসারের অভাব কবে ঘুচবে— সেসব প্রশ্ন পেছনে সরে গেছে।

ছেলে মারা গিয়ে থাকলে অন্তত একবার তার মরদেহ দেখতে চান তিনি। একটি পরিবারের চাওয়া কতটা সংকুচিত হলে জীবনের সব প্রত্যাশা এসে দাঁড়ায় এই একটি প্রশ্নে— ‘আমার ছেলে কি আসলেই মারা গেছে?’

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত কুমিল্লার চান্দিনার মোহাম্মদ সাগরকে নিয়ে প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে এই প্রশ্নের কাছেই বারবার থামতে হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় বেকারিতে কাজ করতে যাওয়া ২৪ বছরের এই তরুণ বেশি বেতন ও এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থের আশ্বাসে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে তাকে পাঠানো হয় ইউক্রেন যুদ্ধে। কয়েক মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। এরপর এক বন্ধুর পাঠানো বার্তা— সাগর আর নেই।

কিন্তু এই বার্তা তার মৃত্যুর নিশ্চিত প্রমাণ নয়। পরিবার এখনো জানে না, কখন, কোথায়, কী ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও নিশ্চিত তথ্য নেই, থাকার কথাও নয়। ফলে সংবাদটি আমাদের একটি মৃত্যুর সামনে যতটা দাঁড় করায়, তার চেয়েও বেশি দাঁড় করায় এক অসহনীয় অনিশ্চয়তার সামনে। এই পরিবার এখন কিসের অপেক্ষা করবে— ছেলের ফোনের, নাকি মৃত্যুসংবাদের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তার?

ভাবুন তো, কী ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে পরিবারটি যাচ্ছে। শুধু সাগর নয়, এভাবে আরও অনেক তরুণ রুশ সেনাবাহিনীর পক্ষে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন ও আহত হচ্ছেন। গত দুই বছরে এ ধরনের সংবাদ আমাদের সামনে আরও বেশি করে আসছে।

সংবাদ থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, সাগরের জীবনের শুরুতেই সুযোগের দরজা ছিল সংকীর্ণ। অভাবের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনো হয়নি। কিশোর বয়স থেকে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে বাবাকে সংসারে সহায়তা করেছেন। যে বয়সে একজন তরুণের বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, সে বয়সেই তাকে সংসারের হাল ধরতে কাজে নামতে হয়েছে।

একপর্যায়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করে সাগর রাশিয়ায় পাড়ি দেন। শুরুটা বেশ ভালোই ছিল। সেখানে তিনি একটি বেকারিতে চাকরি নেন। পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করছিলেন তিনি। হয়তো সেই আয়েই ধীরে ধীরে দেনা শোধ হতো, অসুস্থ বাবার চিকিৎসার কিছুটা ব্যবস্থা হতো, সংসারে স্বস্তি ফিরত। অন্তত পরিবারটির সামনে এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

তারপর এল আরও বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি— এককালীন ৩০ লাখ টাকা। কোনো এক অজানা দালালের পক্ষ থেকে। নিরাপদ দূরত্বে বসে আমরা এই প্রস্তাব গ্রহণের সিদ্ধান্তকে অবিবেচক বলতে পারি। প্রশ্ন তুলতে পারি, বেকারির চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যাওয়ার ঝুঁকি কেন নিলেন সাগর? কিন্তু সিদ্ধান্তটির বিচার করার আগে তার জীবনের জায়গাটিতে একবার দাঁড়ানো প্রয়োজন। ঋণগ্রস্ত ও অভাবী একটি পরিবারের তরুণের কাছে এত বড় অঙ্কের অর্থ কেবল অর্থ থাকে না। এর মধ্যে অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, ঋণমুক্তি এবং বহু বছরের অনটন থেকে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা একসঙ্গে দেখা দেয়।

এমন অবস্থায় ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু সেই ভুলের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি একজন মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দেন, তার দায়ও আমাদের খুব সূক্ষ্মভাবে দেখতে হবে। পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি সাগরকে ভুল তথ্য ও অর্থের প্রলোভন দিয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করেছেন। অভিযোগটির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন। সাগরকে কী কাজের কথা বলা হয়েছিল, তিনি কী বুঝেছিলেন, কী শর্তে সম্মত হয়েছিলেন এবং তাকে বাস্তবে কোথায় পাঠানো হয়েছিল— এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।

ভাষা ও তথ্যের বাধা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ভাষায় একটি চাকরির শর্ত বুঝতে পারা আর বিদেশি ভাষার চুক্তিতে সম্মতি দেওয়া এক বিষয় নয়। অল্পশিক্ষিত একজন শ্রমিককে কেউ মুখে যা বোঝালেন, তিনি হয়তো তার ওপরই নির্ভর করলেন। তার সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও প্রকৃত ঝুঁকির মধ্যে কতটা ব্যবধান ছিল, তা না জেনে তার সম্মতিকে ‘সম্পূর্ণ অবহিত সিদ্ধান্ত’ বলে ধরে নেওয়া যায় না।

সাগরের চাচা তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বারণ করেছিলেন। তার প্রশ্ন ছিল, লেখাপড়া না জানা সাগর বিদেশে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবেন কীভাবে? এই কথায় স্বজনের উদ্বেগ যেমন আছে, তেমনি আছে সাগর ও তার পরিবারের অসহায়ত্বও। দূরদেশে থাকা একজন তরুণকে পরিবার সতর্ক করতে পারে; কিন্তু তার চারপাশের মানুষ, প্রস্তাব ও পরিস্থিতির ওপর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থাকে সামান্যই।

অভিবাসী জীবনের এই দূরত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়। পরিচিত কাউকে বিশ্বাস করা ছাড়া অনেক সময় মানুষের হাতে সহজ কোনো পথ থাকে না। সেই বিশ্বাসই যদি প্রতারণার অবলম্বন হয়, বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। সাগরের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা অনুসন্ধানেই জানা যাবে। তবে তার পরিবারের বক্তব্য যে প্রশ্নগুলো তুলেছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ সাগরের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা। তার পরিচয়, পাসপোর্টের তথ্য, সর্বশেষ যোগাযোগ, সম্ভাব্য কর্মস্থল বা যুদ্ধক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের তথ্য এবং বন্ধুর পাঠানো বার্তা একত্র করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বন্ধু রাজনের কাছ থেকেও জানতে হবে, তিনি কোন সূত্রে খবরটি পেয়েছেন। পরিবারকে যেন একই কথা বারবার বিভিন্ন দপ্তরে বা মাধ্যমে বলে বেড়াতে না হয়, সে জন্য একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা থাকা দরকার।

তিনি জীবিত থাকলে তার নিরাপত্তা ও দেশে ফেরার সম্ভাব্য পথ অনুসন্ধান করতে হবে। তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে (আমাদের প্রত্যাশা, সাগর যেন বেঁচে থাকেন এবং তার পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারেন) পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন।

কোনো প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে, সময়ও লাগতে পারে। কিন্তু সেই সময়জুড়ে পরিবার যেন জানতে পারে, কী চেষ্টা চলছে, কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং কোথায় বাধা আছে। নিঃসঙ্গ অপেক্ষার চেয়ে নিয়মিত ও সঠিক তথ্যও মানুষের জন্য বড় সহায়তা।

এ ঘটনার মধ্যে আমাদের জন্য প্রতিরোধমূলক শিক্ষাও আছে। বিদেশে যাওয়ার আগে এসব তরুণের সচেতনতা প্রয়োজন, আবার বিদেশে পৌঁছানোর পরও কনস্যুলেটসহ অন্যান্য সহায়তা সহজলভ্য হওয়া দরকার। চাকরি পরিবর্তন, অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থের প্রস্তাব কিংবা অচেনা ভাষার চুক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করার মতো বিশ্বাসযোগ্য জায়গা একজন শ্রমিকের প্রয়োজন। সতর্কবার্তা তার বোধগম্য ভাষায় পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজনে তিনি যেন চুক্তি বুঝে নেওয়ার সহায়তা পান এবং যে কাজে যাচ্ছেন, তার বিপদের দিকগুলোও জানতে পারেন।

একই সঙ্গে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিপজ্জনক কাজে যুক্ত করার অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান ও দায় নির্ধারণ জরুরি। শুধু বিপদে পড়া ব্যক্তিকে অসতর্ক বললে প্রতারণার সুযোগগুলো অক্ষত থেকে যায়। যে মানুষটি বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের জীবন একটু সহজ করতে, তাঁর দুর্বলতাকে দালাল বা এ ধরনের কোনো গোষ্ঠীর আয়ের উৎস হতে দেওয়া যায় না।

সাগরের বাবা এখন বড় কোনো ব্যাখ্যা চাইছেন না। তিনি তার সন্তানের খবর চাইছেন। মা দেলোয়ারা বেগমের বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়ার বর্ণনাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি অনিশ্চিত বার্তা একটি পরিবারের কতগুলো জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে। খবরটির পেছনে আছে একটি ঘর, কয়েকজন মানুষ এবং প্রতিদিনের অপেক্ষা।

সাধারণ নিয়মেই এ ধরনের একটি সংবাদ পড়ে আমরা পরের সংবাদে চলে যেতে পারি। সাগরের পরিবারের কিন্তু সেই সুযোগ নেই। তাদের সকাল ও রাত এখন একই প্রশ্নে আটকে আছে।

সাগরের পরিণতি এখনো নিশ্চিত নয়। তাই তাকে মৃত ধরে নিয়ে শোকের সমাপ্তি টানা যায় না। বরং তার খোঁজে দায়িত্বশীল উদ্যোগ, পরিবারের পাশে নিয়মিত উপস্থিতি এবং সত্য জানার চেষ্টা অব্যাহত রাখাই এখন সবচেয়ে মানবিক কাজ। একজন বাবা যেন শেষ পর্যন্ত অন্তত এটুকু বলতে পারেন— আমার সন্তানের কী হয়েছে, আমি জানি।

লেখক: কলামিস্ট ও গল্পকার

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad