শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির বাণিজ্যের পথ যেন সুগম না হয়

জাকির আহমদ খান কামাল
শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির বাণিজ্যের পথ যেন সুগম না হয়

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বা ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের যে অবাধ ক্ষমতা ছিল, তার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ ম্যানেজিং কমিটির সদস্য শিক্ষক পদে নিয়োগকে বাণিজ্যের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছিল।

লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিরা শ্রেণিকক্ষে জায়গা করে নিয়েছিল, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধসের মুখে নিয়ে যায়। এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত ও পরীক্ষাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর পর এই অনিয়ম ও দুর্নীতির লাগাম অনেকটাই টানা সম্ভব হয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ম্যানেজিং কমিটির হাতে পুনরায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নানা জোর গুঞ্জন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে আবারও অর্থের লেনদেন এবং স্বজনপ্রীতিই পুনরুজ্জীবিত হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, এমন কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি এবং এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য বা অপপ্রচার। সরকারের এই অবস্থান নিশ্চিতভাবেই স্বস্তিদায়ক। তবে শুধু স্পষ্টীকরণেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার পূর্ণ স্বচ্ছতা ধরে রাখতে সরকারকে কঠোর ও সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে।

স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি বা এসএমসির আসল দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, অবকাঠামো তদারকি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা করা। বিদ্যালয় ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে কাজ করাই এদের মূল কাজ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এসব কমিটি তাদের মূল দায়িত্ব ভুলে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও শিক্ষক নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। যখন একটি পর্ষদ শিক্ষাকে সেবার চেয়ে ব্যবস্থার বা বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন শিক্ষার মান বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ’র বিদ্যমান কাঠামোর কোনো দুর্বলতা থাকলে তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ব্যক্তি বা কমিটির দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া যাবে না।

যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকরাই একটি শিক্ষিত ও স্বনির্ভর জাতির প্রধান কারিগর। তাই শিক্ষক নিয়োগে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে শুধুমাত্র মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: কলামিস্ট ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement