কোম্পানির হাতেই থাকবে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দুনিয়ায় ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে নতুন এক ক্ষমতাকাঠামো। এর মধ্যে এআইয়ের অগ্রগতি নিয়ে নানা শঙ্কার কথা জানিয়েছেন এআই কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাই। সে কারণেই সবার সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে একটিই প্রশ্ন— ‘এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে?’
এআইকে নিয়ন্ত্রণের জন্য এর আগে বারবার বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সবশেষ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে এআইয়ের ঝুঁকি যাচাই ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ দেন। একই সঙ্গে এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য নজরদারিসহ একটি বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছেন তিনি, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘প্রায় সংবিধানের মতো’ বলে। ‘হোয়াইট হাউজ অ্যাকর্ড অন সুপার ইন্টেলিজেন্স: আ জয়েন্ট কমিটমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপন্সিবিলিটিজ’ শিরোনামের সে চুক্তিতে এআইয়ের নিরাপত্তার ভার সরকার না নিয়ে কোম্পানিগুলোর হাতেই ছেড়ে দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যখন এআই নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপে অনাগ্রহী, তখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই নিজেদের প্রযুক্তির ব্যবহার, ঝুঁকি ও এর সামাজিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। শুধু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নয়, এআই বিপ্লব থেকে তৈরি হতে যাওয়া বিপুল সম্পদ কীভাবে সাধারণ মানুষের কাজে লাগানো হবে, সেটি নিয়েও আলাদা আলাদা পরিকল্পনা করছে তারা।
অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই, গুগল, মেটা, এনভিডিয়া ও ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্যোগসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব পদ্ধতিতে এই কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। এর কোনোটিই বাধ্যতামূলক কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছায় তৈরি করা নীতিমালা ও পারস্পরিক নজরদারির ওপরই এর ভিত্তি।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, এআই কোম্পানিগুলো এখন এমন প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা একসময় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কবার্তা আসছে কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই।
অ্যানথ্রপিকের নেতারা যেমন সম্ভাব্য বিপর্যয়কর ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি এআই থেকে সৃষ্ট সম্পদের একটি অংশ বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে।
সম্পদ কার, নিয়ন্ত্রণ কার?
‘এআই-বুমে’র সম্ভাব্য বিপুল সম্পদ কীভাবে ভাগ হবে— এ প্রশ্নে অন্তত তিনটি আলাদা ধারণা সামনে এসেছে।
এ ক্ষেত্রে অ্যানথ্রপিকের পরিকল্পনা অনেকটাই প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অভিষেকের আগে প্রতিষ্ঠানটি তার ৫ শতাংশ শেয়ার একটি নতুন পাবলিক বেনিফিট ফান্ডে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কোম্পানির সম্ভাব্য মূল্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছালে ওই অংশের মূল্য হতে পারে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠাতা ও কর্মীদের আগের অঙ্গীকারও ধরলে, অ্যানথ্রপিকের প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার কোনো না কোনোভাবে জনকল্যাণে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত।
ইলন মাস্ক আবার সরাসরি ‘মানুষের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া’র কথা জানিয়েছেন। অ্যানথ্রপিকের ঘোষণার পর সোমবার মাস্ক ঘোষণা করেছেন, আগামী বছর প্রতিটি মার্কিন শিশুকে স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্য ধরে এর পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। তবে কীভাবে এসব শেয়ার বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানের ধারণা সরকারকেন্দ্রিক। তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ওপেনএআইয়ের প্রায় ৫ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। এর অংশ হিসেবে একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মাধ্যমে অংশীদারত্ব তৈরি করে এর বিনিয়োগ-লাভ সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বিতরণ করার কথা বলা হয়েছে। তবে এ ধারণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের প্রস্তাব আকারে রয়েছে, যা বাস্তবায়ন করতে গেলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
কে ঠিক করবে ‘জনস্বার্থ’ কী?
এআই কোম্পানিগুলোর ‘স্বনিয়ন্ত্রণ’ ইস্যুতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এটিই। কোন প্রযুক্তি নিরাপদ, কোনটির ব্যবহার গ্রহণযোগ্য এবং এআই থেকে অর্জিত সম্পদ কীভাবে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়া হবে— এসব সিদ্ধান্ত যদি নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি নেয়, তাহলে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?
যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পপতিদের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান এআই কোম্পানিগুলোর ক্ষমতার ব্যাপ্তি ভিন্ন। তারা শুধু বাজারের একটি পণ্য তৈরি করছে না; তথ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নিরাপত্তা এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেও তাদের প্রযুক্তির প্রভাব দ্রুত বাড়ছে।
এ ধরনের স্বেচ্ছাভিত্তিক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের নজির অবশ্য আছে। বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেট ২০১০ সালে ‘গিভিং প্লেজ’ চালু করেছিলেন, যেখানে বিলিয়নিয়াররা তাদের সম্পদের বড় অংশ দান করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু স্বেচ্ছা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, সম্পদের মূল্যায়ন এবং ‘জনকল্যাণ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে— এসব প্রশ্ন বরাবরই বিতর্কিত।
এআই খাত ঘিরে সেই বিতর্ক আরও বড় হতে পারে। অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে কার্যকর পরোপকারবাদ বা ‘ইফেক্টিভ অ্যালট্রুইজম’ দর্শনের সম্পর্ক রয়েছে, যে দর্শন ট্রাম্প প্রশাসন ও তার মিত্রদের অনেকের কাছে সন্দেহের বিষয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের এআই-সম্পদ কোন খাতে ব্যয় হবে, সেটি কি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ঠিক করবে, নাকি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা?
সরকারের হাত কি পুরোপুরি সরে যাচ্ছে?
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এআই নিয়ন্ত্রণ আরোপে আগ্রহী না হলেও ফেডারেল সরকার যে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছে, তা নয়। সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের এআই একটি মিথ্যা হত্যার অভিযোগ ফিলাডেলফিয়া পুলিশের কাছে পাঠায় এবং সরকারি ওয়েবসাইটের সঙ্গে অনুপযুক্তভাবে যোগাযোগ করে।
এ ঘটনার পর হোয়াইট হাউজ জানিয়ে দিয়েছে, এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তাজনিত ঘটনা সম্পর্কে সরকারকে জানাতে হবে এবং ক্ষতি হলে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ট্রাম্পের ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ স্পষ্ট করে বলেছে, এই তথ্য জানানো ও ক্ষতি মোকাবিলার প্রক্রিয়া ঐচ্ছিক নয়।
অর্থাৎ একদিকে ওয়াশিংটন এআই খাতকে নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণের বড় সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজন হলে ফেডারেল কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকারও ধরে রাখছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দ্বৈত অবস্থানের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে এআই শাসনের নতুন মডেল।
এখন পর্যন্ত এআই খাতে সম্পদ পুনর্বণ্টন বা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের কোনো একক নিয়ম নেই। তবে শিশুদের জন্য কর-সুবিধাপ্রাপ্ত বিনিয়োগ তহবিল ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’ এআই উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পদ বণ্টনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠছে।
শেষ পর্যন্ত এ পরীক্ষা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করবে শুধু এআই কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর নয়, বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো— এআই-নির্ভর ভবিষ্যতে ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে— সরকার, কোম্পানি, নাকি সাধারণ মানুষের?
তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস, এপি, রয়টার্স, সিএনএন

















-dc8cd9-256x144.webp)




