ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির জের: মেটাকে জরিমানা গুনতে হবে ২৫ বিলিয়ন ডলার

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির জের ধরে ফেসবুকের মাদার কোম্পানি মেটাকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন আদালত। ছবি: সংগৃহীত
ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির জের ধরে ফেসবুকের মাদার কোম্পানি মেটাকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন আদালত। ছবি: সংগৃহীত

ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটা প্ল্যাটফর্মসকে ২৫ বিলিয়ন বা আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় তিন লাখ সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বুধবার (২১ অক্টোবর) বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ এ জরিমানা নির্ধারণ করেন। মেটা অবশ্য এ রায়কে যথাযথ মনে করছে না। প্রতিষ্ঠানটির একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

এর আগে একটি জুরি রায়ে জানিয়েছিল, মেটা ও এর শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা, তৃতীয় পক্ষের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ এবং প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছিলেন।

মামলাটির সূত্রপাত ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়কার বহুল আলোচিত ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে। ওই ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা ফেসবুকের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য তাদের সম্মতি ছাড়াই সংগ্রহ করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল টোরেজ বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মেটার বিরুদ্ধে কোনো অঙ্গরাজ্যের করা সবচেয়ে বড় না হলেও সবচেয়ে বড় একক রায়ের একটি।

রায়ের পর বিচারক ম্যাথিউ বলেন, বছরের পর বছর ধরে মেটার ‘পদ্ধতিগতভাবে’ চালানো কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায়িক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত করেছে।

২১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৫ বিলিয়ন

জুরি গত ২৫ সেপ্টেম্বর দেখতে পায়, মেটা ও এর নেতৃত্বের করা ২৯টি বক্তব্যের মধ্যে ২৬টিই বিভ্রান্তিকর ছিল। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইন চার কোটি ৩০ লাখের বেশি বার লঙ্ঘন হয়েছে বলে নির্ধারণ করেন জুরি।

অঙ্গরাজ্যটির আইনে প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। সেই হিসাবে মেটার বিরুদ্ধে ২১৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জরিমানা আরোপের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তবে বিচারক শেষ পর্যন্ত সেই অঙ্ক কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেন।

রায়ের পর টোরেজ বলেন, মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য নিউ মেক্সিকো দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে। তঁর ভাষায়, এই রায় অতীতের অবস্থান থেকে ‘স্পষ্ট বিচ্ছেদ’ এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি ‘স্পষ্ট সতর্কবার্তা’।

অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী জরিমানার পুরো অর্থ নিউ মেক্সিকোর স্কুলব্যবস্থায় যাওয়ার কথা বলে জানিয়েছেন টোরেজ।

তবে মেটা এ রায় মেনে নিচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আইন কর্মকর্তা সি জে মাহোনি বলেছেন, আপিলে তারা রায় বাতিল করতে পারবেন বলে মেটা আত্মবিশ্বাসী।

মেটার দাবি, এ মামলায় অঙ্গরাজ্য এমন নতুন নিয়ম কার্যকর করতে চাইছে, যার ফলে অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবেন, সে বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ হবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, তারা ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে না এবং নিউ মেক্সিকো কোনো ভোক্তা বাস্তবে বিভ্রান্ত হয়েছে— এমন প্রমাণও দেখাতে পারেনি।

মামলার আগের পর্যায়েই মেটা আদালতকে জরিমানা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে সীমিত রাখার অনুরোধ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা ছিল, এর চেয়ে বড় জরিমানা ব্যবসাগুলোকে নিউ মেক্সিকো থেকে সরে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।

ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার পুরোনো কেলেঙ্কারি

নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল ২০২১ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার আগে প্রকাশ্যে আসে, ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা একটি তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আট কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

অ্যাপটি ফেসবুকের অনুমতি নিয়ে একজন গবেষক প্ল্যাটফর্মটিতে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ওই অ্যাপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্য ব্যবহারকারীদের সম্মতি ছাড়াই ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার হাতে চলে যায়।

ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের সফল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে কাজ করেছিল। ভোটারদের প্রোফাইল তৈরি এবং নির্দিষ্ট ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানোর উদ্দেশ্যে ফেসবুকের ওই তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিউ মেক্সিকোর মামলায় অবশ্য শুধু ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিই নয়, মেটা ব্যবহারকারীদের কাছে তাদের তথ্য কারা দেখতে পারে, প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা কী— এসব বিষয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়।

অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ ছিল, থার্ড পার্টিগুলো ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যে ব্যাপক প্রবেশাধিকার পাচ্ছে— এটি মেটা জানত। কিন্তু কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থে লাভজনক হলে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ক্ষতিকর কনটেন্ট সহ্য করতেও তারা প্রস্তুত ছিল।

ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা এখন বিলুপ্ত। তবে ওই কেলেঙ্কারির আইনি ও আর্থিক প্রভাব এখনো মেটাকে তাড়া করছে।

২০১৯ সালে একই কেলেঙ্কারির সূত্রে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশন মেটাকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল। নিউ মেক্সিকোর ২৫ বিলিয়ন ডলারের জরিমানাটি ওই কেলেঙ্কারির পর মেটার বিরুদ্ধে আরোপ করা সবচেয়ে বড় জরিমানা।

এ ছাড়া ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা-সংশ্লিষ্ট দাবিতে আরও ছয়টি অঙ্গরাজ্য ৪৫৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে মামলা নিষ্পত্তি করেছিল।

আপিলের দীর্ঘ লড়াইয়ের আশঙ্কা

আইন ও আর্থিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই জরিমানা নিয়ে মেটার সঙ্গে নিউ মেক্সিকোর দীর্ঘ আইনি লড়াই হতে পারে।

পেন স্টেট ডিকিনসন ল স্কুলের সহযোগী ডিন ড্যারিল লিম বলেন, মার্কিন সংবিধান সাধারণভাবে অতিরিক্ত জরিমানার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। তবে নিউ মেক্সিকোর আইনের কাঠামোর কারণে জরিমানার অঙ্ক বড় হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে— এমনটা বলা যায় না।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক গিল লুরিয়া অবশ্য মনে করেন, বিপুল অঙ্কের এই জরিমানা মেটার আর্থিক সক্ষমতায় বড় প্রভাব ফেলবে না। তার ভাষায়, মেটার বাজারমূল্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি আপিল করে মামলাটি দীর্ঘায়িত করতে পারে।

ছয় মাসে দ্বিতীয় ধাক্কা

নিউ মেক্সিকোতে মেটার বিরুদ্ধে এটি গত ছয় মাসে দ্বিতীয় বড় জুরি রায়।

এর আগে মার্চে একই অঙ্গরাজ্যের সান্তা ফে শহরের একটি জুরি রায়ে বলা হয়, তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে মেটা তার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে। ওই মামলায় মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মামলাটির পরবর্তী পর্যায়ে বিচারক মেটাকে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গঠিত নিউ মেক্সিকোর একটি তহবিলে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নিউ মেক্সিকোতে কিশোর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

নতুন রায়টি তাই শুধু একটি বিশাল অঙ্কের জরিমানার ঘটনা নয়। ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, অনলাইন নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক আচরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রক ও আইনি চাপ কতটা বাড়ছে, সেটিও সামনে আনছে।

বিশেষ করে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির প্রায় এক দশক পরও একই ঘটনার আইনি প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকা মেটার জন্য বড় একটি সতর্কসংকেত। নিউ মেক্সিকোর রায় আপিলে টিকে গেলে তা শুধু মেটার জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য বড় প্ল্যাটফর্মের জন্যও ব্যবহারকারীর তথ্য ও ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত মামলায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad