এআই নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ কোম্পানির হাতে, চুক্তিকে ‘সংবিধান’ বললেন ট্রাম্প

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ ঠেকানোর বদলে এর নিরাপত্তার বড় দায়িত্ব প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিজেদের হাতেই দেওয়ার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউজে বিশ্বের শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের পর একটি স্বেচ্ছাসম্মত নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ওই চুক্তিকে ‘প্রায় সংবিধানের মতো’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেছেন, এআই শিল্পকে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নামে, এআইকে ডাকার জন্য যা ট্রাম্প গত কিছুদিন ধরে ব্যবহার করে আসছেন।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও সিবিএস নিউজের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের ওই বৈঠকে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, গুগল, মেটা, এক্সএআই ও এনভিডিয়াসহ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সই হয় ‘হোয়াইট হাউজ অ্যাকর্ড অন সুপার ইন্টেলিজেন্স: আ জয়েন্ট কমিটমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপন্সিবিলিটিজ’। এতে উন্নত বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তায় একাধিক স্তরের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এটি কোনো আইন নয়, কোম্পানিগুলোর জন্য চুক্তিটি স্বেচ্ছাসম্মত এবং সরাসরি আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ট্রাম্প অবশ্য এটিকে ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন।
চুক্তির আওতায় কোম্পানিগুলো তাদের এআই ব্যবস্থায় শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণ ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা দেখার জন্য অভ্যন্তরীণ দল, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের অডিট ও পরিচালনা পর্ষদের অধীনে আলাদা তদারকি কাঠামোর কথাও বলা হয়েছে। এআই সিস্টেম যাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে কম্পিউটার বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় ঢুকে পড়তে বা হ্যাক করতে না পারে, সেটিও নজরদারির আওতায় থাকবে।
বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, এআই নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ‘অনেক মিল’ রয়েছে এবং তিনি ‘দারুণ স্ব-নিয়ন্ত্রণ’ দেখতে পাচ্ছেন। তার প্রশাসনের অবস্থান— এআইয়ের বিকাশে অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সময়ে। ট্রাম্প এআইকে শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় পরিবর্তন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন।
জাতিসংঘে ভিন্ন বার্তা
ওয়াশিংটনের এই স্ব-নিয়ন্ত্রণের মডেলের বিপরীতে জাতিসংঘে সাম্প্রতিক আলোচনায় এসেছে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও বহুপাক্ষিক নিয়ন্ত্রণের দাবি। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে এআই ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই ও হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমঁ দেলাংসহ এআই বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেলের সহসভাপতি ইয়োশুয়া বেংজিও ওই সভায় বলেন, সাম্প্রতিক কিছু এআই এজেন্ট এমন আচরণ করেছে যা মানুষের ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। কিছু এজেন্ট পরীক্ষার নিরাপত্তাব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে সমন্বিত সাইবার হামলা চালিয়েছে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড গোপন করার চেষ্টা করেছে।
ইয়োশুয়োর মতে, ফ্রন্টিয়ার এআইকে ওষুধ, বিমান চলাচল বা পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে লাইসেন্সিং, স্বাধীন পরীক্ষা ও বাধ্যতামূলক ঘটনা জানানোর ব্যবস্থা করা দরকার।
জাতিসংঘের সেই বৈঠকেই অবশ্য অল্টম্যান ও আমোদেই দুজনেই এআইয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির কথা স্বীকার করেন। অল্টম্যান বলেন, এআই মানুষের সৃজনশীলতা ও আবিষ্কারের নতুন যুগ আনতে পারে, কিন্তু এমন ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয় যেগুলোর ওপর শক্তিশালী নিরাপত্তা ও মানব-নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
আমোদেই বলেন, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে এবং কোনো একটি কোম্পানির পক্ষে এই ঝুঁকি একা সামলানো সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের উদ্বেগের মধ্যেই এআই খাত থেকেই সতর্কবার্তা আসছে। অ্যানথ্রপিক তাদের সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে প্রবেশের নথিতে জানিয়েছে, উন্নত এআই মডেল থেকে ‘মানবতার জন্য বিপর্যয়কর বা অস্তিত্বগত ঝুঁকি’ তৈরি হতে পারে। নথিতে এমন পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে মডেল বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিরোধ করতে পারে, তথ্য গোপন বা বিকৃত করতে পারে কিংবা মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগের মতো আচরণ করতে পারে।
অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টগুলোর আচরণ নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এজেন্টগুলো হাগিং ফেসের ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশ ও দুর্বলতা অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল। পরে ওপেনএআই জানায়, এ ধরনের এজেন্ট-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের পরিধি বুঝতে তারা এখনো কাজ করছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বর্তমান ও সাবেক ওপেনএআই ও গুগল ডিপমাইন্ড গবেষকেরাও সতর্ক করেছেন, মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে— এমন স্ব-উন্নয়নশীল এআই তৈরির ঝুঁকি বাড়ছে, অথচ কোম্পানিগুলো নিরাপত্তায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন।
‘এআই’ থেকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’
হোয়াইট হাউজের বৈঠকের দিনই ট্রাম্প আরেকটি নির্বাহী আদেশে সরকারি ব্যবহারে আর্টিফিশিয়াল ইান্টেলিজেন্স বা এআইয়ের পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা এসআই ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তার যুক্তি, বর্তমান প্রজন্মের উন্নত প্রযুক্তি শুধু মানুষের বুদ্ধিমত্তার অনুকরণ করছে না, বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়িয়ে নতুন ধরনের কাজ ও আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এই নতুন নামের আড়ালে প্রযুক্তির সংজ্ঞা এখনই আলাদা করা হয়নি। নির্বাহী আদেশে আপাতত বিদ্যমান আইনে এআইয়ের যে সংজ্ঞা রয়েছে, সেটিকেই ‘এসআই’য়ের সংজ্ঞা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নতুন ফেডারেল সংজ্ঞার প্রস্তাব তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ অবশ্য এই প্রবণতার বিপরীতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমানে এআই ব্যবস্থাপনা মূলত অল্প কয়েকটি কোম্পানি ও দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কক্ষের বাইরে। তার মতে, এআই কীভাবে মানবসমাজকে বদলাবে শুধু তা নয়, এই পরিবর্তন কীভাবে পরিচালিত হবে সে সিদ্ধান্তেও সব দেশের কণ্ঠ থাকা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেলও চলতি মাসে সতর্ক করেছে, এআইয়ের সক্ষমতা যে গতিতে বাড়ছে, বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। প্যানেলের ভাষ্য, আরও সক্ষম ও স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্টের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।



-c85b3a.jpg)















-436923-256x144.webp)

-27f480-256x144.webp)
-938bec-256x144.webp)