গাড়ির গায়ে রকেটের প্রযুক্তি, উড়ল টেসলার রোডস্টার
-dc8cd9-480x270.webp)
একসময় ভবিষ্যতের গাড়ি বলতে বোঝানো হতো এমন এক যান, যা কেবল রাস্তায় চলবে না, প্রয়োজনে আকাশেও উড়বে। সেই কল্পনাকেই এবার বাস্তবের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে টেসলা। প্রায় এক দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রযুক্তি খাতের জায়ান্ট এই কোম্পানি এনেছে নতুন প্রজন্মের টেসলা রোডস্টার, যা উদ্বোধনী প্রদর্শনীতেই মাত করেছে গোটা বিশ্বকে। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির গতি শত মাইলে তুলে ফেলাই যেখানে চমকে দেওয়ার মতো অর্জন, সেখানে এই গাড়ি রীতিমতো মাঝপথে উড়ে গিয়েছে!
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ম্যাকগ্রেগরে স্পেসএক্সের রকেট পরীক্ষা কেন্দ্রে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোরে) টেসলা রোডস্টারের এই চমক নিয়ে হাজির হন ইলন মাস্ক। সেখানেই সবার চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়!
এই প্রদর্শনীতে সাদা রঙের দুই আসনের একটি রোডস্টার সোজা উঠে যায় একদম খাড়া একটি র্যাম্পে, যার শেষাংশ ভূমির ঠিক সমান্তরালে ওপরের দিকে ছাদের মতো উঠে গেছে। সেই র্যাম্পের মাথায় উঠতে উঠতে স্বাভাবিকভাবেই গাড়িটি উলটো হয়ে যায়, ছিটকে পড়ার উপক্রম হয় র্যাম্প থেকে। কিন্তু না, র্যাম্পের মাথা থেকে বেরিয়ে এসে থ্রাস্টারের সাহায্যে মাঝ আকাশে ঘুরে নিরাপদে চার চাকায় অবতরণ করে!
এখানেই শেষ নয়। আরেক প্রদর্শনীতে রোডস্টার যখন তীব্র গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সামনে পার্ক করা টেসলারই কয়েকটি। সেগুলোর সামনে পড়ে রোডস্টার থেমে যায়নি। বরং অবিশ্বাস্যভাবে সেই গাড়িগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে অবতরণ করে চার চাকায়।
ইলন মাস্কের ভাষায়, এটি এমন একটি গাড়ি, যা ‘রকেটের মতো উড়তে’ পারে। গাড়ির মধ্যে রকেটের কিছু প্রযুক্তিও যোগ করা হয়েছে। তবে এটি উড়ন্ত গাড়ি নয়, বরং প্রয়োজনে স্বল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উড়তে সক্ষম। আর তা বাজারে আসতে পারে ২০২৮ সালেই।
-e89f26.jpg)
গাড়ির ভেতরে স্পেসএক্সের রকেট প্রযুক্তি
রোডস্টারের সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রযুক্তি এসেছে টেসলারই আরেক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স থেকে। গাড়িটির বিশেষ সংস্করণে ব্যবহার করা হয়েছে কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার। এতে জ্বালানি পুড়িয়ে রকেটের মতো শক্তি তৈরি করা হয় না, বরং উচ্চচাপে সংরক্ষিত গ্যাস দ্রুতগতিতে বের করে দিয়ে বিপরীতমুখী থ্রাস্ট তৈরি করা হয়।
প্রদর্শিত গাড়িতে কার্বন-ফাইবারে মোড়ানো উচ্চচাপের গ্যাস ট্যাংক ব্যবহার করা হয়েছে। টেসলার প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি ট্যাংকে মোট প্রায় ৬০০ লিটার ধারণক্ষমতায় প্রায় ২৫০ কেজি সংকুচিত বায়ু রাখা যায়। গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা মোট ১০টি নজল থেকে এই গ্যাস বের হয়। পেছনের প্রধান থ্রাস্টারগুলো মাটির দিকে শক্তি প্রয়োগ করে গাড়িকে ওপরে তোলে, আর চারপাশের থ্রাস্টারগুলো গাড়ির অবস্থান ও ঘূর্ণন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
টেসলার দাবি, থ্রাস্টারগুলো সম্মিলিতভাবে ৮০ কিলোনিউটনের বেশি শক্তি তৈরি করতে পারে। ফলে এটি কেবল ত্বরণ বাড়ানোর প্রযুক্তি নয়, গাড়িকে অল্প সময়ের জন্য মাটি থেকে তুলে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও।
-2f4195.jpg)
এই প্রযুক্তির ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। মাস্ক ২০১৮ সালেই নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের ‘রকেট থ্রাস্টার’ ব্যবহারের কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, গাড়ির চারপাশে প্রায় ১০টি ছোট রকেট থ্রাস্টার বসিয়ে ত্বরণ, সর্বোচ্চ গতি, ব্রেকিং ও কর্নারিং উন্নত করা যেতে পারে।
প্রদর্শন অনুষ্ঠানে টেসলার লোগোযুক্ত রুপালি বকলস পরা মাস্ক উচ্ছ্বসিত দর্শক ও বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রকৌশলীদের অসাধারণ পরিশ্রমের ফল এই গাড়ি। তারা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এমন কিছু তৈরি করেছেন, যা আপনারা কোনো সিনেমাতেও দেখেননি।’
-306678.jpg)
উলটো হয়ে চলবে কীভাবে?
রোডস্টারের আরেকটি প্রযুক্তি প্রদর্শনীর সময় সমানভাবে নজর কেড়েছে। গাড়িটি খাড়া র্যাম্পের ওপর উলটো হয়ে থাকতে পারছে।
এর পেছনে রয়েছে গাড়ির নিচে বসানো সাকশন ফ্যান সিস্টেম। ফ্যানগুলো গাড়ির নিচ থেকে বাতাস টেনে নিয়ে এমন একটি চাপ তৈরি করে, যা গাড়িকে রাস্তা বা র্যাম্পের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে রাখে। টেসলার দাবি, এই ব্যবস্থা গাড়িকে সর্বোচ্চ প্রায় দুই জি পর্যন্ত নিচের দিকে চাপ দিয়ে আটকে রাখতে পারে।
অর্থাৎ রোডস্টারের ক্ষেত্রে শুধু ওপর থেকে নিচে চাপ তৈরি করার প্রচলিত অ্যারোডাইনামিকস নয়, বরং নিচ থেকে বাতাস টেনে গাড়িকে পৃষ্ঠের সঙ্গে ‘চেপে’ ধরার প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে। ট্র্যাক মোডে এই ব্যবস্থা সক্রিয় অ্যারোডাইনামিকসের সঙ্গে কাজ করে বেশি গ্রিপ তৈরিতে সাহায্য করবে বলে টেসলা জানিয়েছে।
-17b843.jpg)
এক সেকেন্ডের আগেই ৯৬ কিলোমিটার
উড়তে পারার চেয়েও সম্ভবত রোডস্টারের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দাবি এর ত্বরণ, তথা গতিবেগ বৃদ্ধির হার। টেসলার গাড়ি প্রকৌশল বিভাগের প্রধান লার্স মোরাভি জানান, শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল বা প্রায় ৯৬ কিলোমিটার গতিতে উঠতে রোডস্টারের সময় লাগে এক সেকেন্ডেরও কম। পরীক্ষার সময় ০.৮১ সেকেন্ডই এমন গতি পাওয়া গেছে। রোডস্টারের প্রদর্শনীতেও এর প্রমাণ মিলেছে।
টেসলা তিনটি কনফিগারেশনের রোডস্টারের কথা জানিয়েছে— পারফরম্যান্স, থ্রাস্ট ও রকেট। প্রথমটি তথা পারফরম্যান্স সংস্করণের রোডস্টারে থাকবে দুই আসন ও রোড-ফোকাসড প্রযুক্তি। থ্রাস্ট সংস্করণে যুক্ত হবে পেছনের কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার। আর রকেট সংস্করণ হবে সবচেয়ে আধুনিক, যেখানে গাড়ির চারপাশে থ্রাস্টার থাকবে এবং এটি মূলত আকাশে ওঠা ও ঘূর্ণনের মতো কসরতের জন্য তৈরি। রকেট সংস্করণে একটি আসন থাকবে। শূন্য থেকে ৬০ মাইল পর্যন্ত গতি তুলতে এর সময় লাগবে ০.৫৯ সেকেন্ডেরও কম!
টেসলার প্রকাশিত তথ্য বলছে, নতুন রোডস্টারর সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ২৩০ মাইল বা ৩৭০ কিলোমিটারের বেশি। একবার ব্যাটারি চার্জ দিলে চলবে ৩০০ মাইলের বেশি, যা ৪৮০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাবে।
রোডস্টারের জন্য প্রি-অর্ডারও নিতে শুরু করেছে টেসলা। তাদের ওয়েবপেজে বলা হয়েছে, ‘পারফরম্যান্স’ সংস্করণের জন্য বুকিং মানির পরিমাণ ৫০ হাজার ডলার। আবার ‘থ্রাস্ট’ সংস্করণের জন্য অগ্রিম জমা দিতে হবে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আর ‘রকেট’ সংস্করণটি হবে ‘ইনভাইটেশন অনলি’।
-a7aef7.jpg)
৯ বছরের অপেক্ষার অবসান
বৃহস্পতিবার নতুন প্রজন্মের রোডস্টারের প্রদর্শনী হলেও টেসলা দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার প্রথম দেখিয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন গাড়িটির দাম ধরা হয়েছিল প্রায় দুই লাখ ডলার। ২০২০ সাল থেকে সরবরাহ শুরুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে যায়। এরপর আরও কয়েকবার উৎপাদন ও উন্মোচনের সময় পিছিয়েছে।
প্রথম ঘোষণার সময় টেসলা চার আসন, প্রায় ৬২০ মাইল রেঞ্জ ও ঘণ্টায় ২৫০ মাইলের বেশি সর্বোচ্চ গতির মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য জানিয়েছিল। নতুন গাড়িতে আসন কমে হয়েছে দুটি এবং প্রকাশিত রেঞ্জ ৩০০ মাইলের বেশি। স্পেসিফিকেশনে কিছু পরিবর্তন এলেও প্রায় এক দশক পর নাটকীয় প্রযুক্তি যুক্ত করেই রোডস্টার নিয়ে ফিরল টেসলা।
এবার মাস্ক বলেছেন, ২০২৮ সালে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ ২০১৭ সালের প্রথম প্রদর্শনীর প্রায় ১১ বছর পর গ্রাহকের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
-dea2d8.jpg)
গাড়ি, নাকি প্রযুক্তির প্রদর্শনী?
প্রদর্শনীতে যে গাড়িটি দেখা গেছে, সেটি চমকপ্রদ, কিন্তু এর উড্ডয়নব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি গাড়িতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা এখনো প্রমাণিত নয়। বিশেষ করে জনবহুল রাস্তায় উচ্চচাপের গ্যাস থ্রাস্টার ব্যবহার, গাড়ির ওপর দিয়ে লাফ দেওয়া, উলটো হয়ে চলা কিংবা মাটি ছেড়ে ওঠার মতো সক্ষমতা কীভাবে নিরাপত্তা ও সড়ক আইন মেনে পরিচালিত হবে, তা স্পষ্ট নয়। রয়টার্সও জানিয়েছে, এসব বৈশিষ্ট্যের জনসড়কে ব্যবহার ও বৈধতা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।
টেসলার জন্য তাই রোডস্টার হয়তো শুধু নতুন একটি স্পোর্টস কার নয়, এটি কোম্পানির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি ‘হালো কার’, যেটি এমন একটি গাড়ি, যার মূল উদ্দেশ্য বিপুল সংখ্যায় বিক্রি করা নয়; বরং পুরো ব্র্যান্ডের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা। মাস্ক নিজেও আগে রোডস্টারের আর্থিক গুরুত্বকে ‘ছোটখাটো’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
প্রথম ঘোষণার যে এক দশক পর রোডস্টার প্রদর্শন করল টেসলা, এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি গাড়ি উৎপাদনের চেয়ে স্বচালিত প্রযুক্তি ও রোবট তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাড়িটির প্রদর্শনীর চেয়ে বরং এ বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-8d6e31.jpg)
টেসলায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার জিন মুনস্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘এটি ছিল প্রকৌশলগত দক্ষতা প্রদর্শনের এক আয়োজন, যার বাণিজ্যিক মূল্য বলতে গেলে কিছুই নেই— প্রচলিত গাড়ি নির্মাতাদের বিব্রত করা ছাড়া।’
তবে রোডস্টারের প্রদর্শনীতে মুগ্ধ ও অভিভূতের সংখ্যাও কম নয়। টেসলার সমর্থক ও বিনিয়োগকারী সয়্যার মেরিট এক্সে লিখেছেন, ‘এটি আমার দেখা সবচেয়ে অবিশ্বাস্য পণ্য প্রদর্শনী। আমি এটি সরাসরি দেখেছি, তবু ভাবছি— এটি কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নয়!’
প্রায় এক দশক আগে যে গাড়ি দেখিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল টেসলা, সেটি এবার সত্যিই কয়েক মুহূর্তের জন্য মাটি ছেড়েছে। কিন্তু রোডস্টারের আসল পরীক্ষা হবে ২০২৮ সালে, যখন এটি গ্রাহকের গ্যারেজে যাবে। রকেট-প্রযুক্তির এই কসরত কতটা বাস্তব, নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: টেসলা, রয়টার্স, এএফপি, গার্ডিয়ান














-2ea5b2-256x144.webp)


-995fd9-256x144.webp)