মঙ্গলে প্রাণের চিহ্ন, নমুনা ফেরানোর দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতে পারে চীন

মঙ্গলে একসময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না— সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে একটি ছোট পাথরের মধ্যে। পাথরটি এরই মধ্যে সংগ্রহও করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার রোভার পারসিভারেন্স। কিন্তু সমস্যা হলো— সেই পাথর পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা এখনো অনিশ্চিত। আর এই সুযোগেই মঙ্গল থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে চীন।
বিজ্ঞানীদের কাছে ‘স্যাফায়ার ক্যানিয়ন’ নামে পরিচিত পাথরটির আকার অনেকটা চকখড়ির মতো। এর গায়ে রয়েছে চিতাবাঘের গায়ের দাগের মতো ছোট ছোট ছোপ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ছোপগুলো প্রাচীন অণুজীবের কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে মঙ্গলে সত্যিই প্রাণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে পাথরটি পৃথিবীতে এনে উন্নত পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নাসার পারসিভারেন্স রোভার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মঙ্গলের চেয়াভা ফলস নামের একটি পাথর থেকে নমুনাটি সংগ্রহ করে। পাথরটি রয়েছে জেজেরো গহ্বরের কাছে নেরেতভা ভ্যালিস উপত্যকার এলাকায়। তিন শ কোটি বছরেরও বেশি আগে সেখানে নদীর প্রবাহ ছিল। সেই নদীর পানি গিয়ে জমা হতো একটি প্রাচীন হ্রদে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পারসিভারেন্সকে ওই এলাকায় পাঠানো হয়েছিল মূলত অতীতে পানির উপস্থিতি ছিল এমন শিলার সন্ধানে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ ধরনের শিলায় প্রাচীন প্রাণের অস্তিত্বের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা বেশি।
পারসিভারেন্সের বিজ্ঞানী দলের সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাড্রিয়ান ব্রোজের মতে, স্যাফায়ার ক্যানিয়নের নমুনাটি মঙ্গলে প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো প্রথম আবিষ্কারগুলোর একটি। তবে এটিকে এখনই মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাচ্ছে না।

পাথরের গায়ে ছোপ ঘিরে যত রহস্য
স্যাফায়ার ক্যানিয়নের পাথরে থাকা ছোট ছোট ছোপই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের মূল কারণ। পৃথিবীতে মাটি ও পলির মধ্যে এ ধরনের ছোপ তৈরি হতে পারে অণুজীবের কার্যকলাপের ফলে।
ব্রোজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জৈব পদার্থ অণুজীবের মাধ্যমে ভাঙতে শুরু করলে আশপাশের শিলায় বিবর্ণ বলয় বা ছোপ তৈরি হতে পারে। পারসিভারেন্সের খুঁজে পাওয়া পাথরের চিহ্নগুলোর সঙ্গে পৃথিবীতে দেখা এমন বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে।
চেয়াভা ফলস পাথরটির আশপাশের কাদাপাথরেও কয়েক লাখ সম্ভাব্য ছোপ পাওয়া গেছে। এগুলোও প্রাচীন অণুজীবের কার্যকলাপের ফলে তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু একই ধরনের চিহ্ন প্রাণের উপস্থিতি ছাড়াও রাসায়নিক ও ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হতে পারে। তাই শুধু রোভারের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
এর আগেও মঙ্গলের একটি উল্কাপিণ্ডকে ঘিরে এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া অ্যালান হিলস ৮৪০০১ নামের উল্কাপিণ্ডটিতে একসময় প্রাচীন প্রাণের অবশেষ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরে বিজ্ঞানীরা দেখান, প্রাণের অস্তিত্ব ছাড়াও প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সেখানে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে, যেগুলোকে ভুল করে প্রাণের চিহ্ন বলে মনে হয়েছিল।
এ অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্যাফায়ার ক্যানিয়নের নমুনা পৃথিবীতে এনে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা জরুরি।

নমুনা ফেরানোর প্রকল্পে বড় ধাক্কা
মঙ্গল থেকে পাথরের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাটি ছিল নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএর যৌথ উদ্যোগ। ‘মার্স স্যাম্পল রিটার্ন’ নামের এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পারসিভারেন্সের সংগ্রহ করা নমুনাগুলো পৃথিবীতে এনে বিস্তারিত পরীক্ষা করা।
কিন্তু প্রকল্পটির নকশা ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। বাড়তে থাকে খরচও। ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রাথমিক পরিকল্পনায় মঙ্গলে একাধিক মহাকাশযান পাঠানোর কথা ছিল— একটি যান নমুনা সংগ্রহ করে মঙ্গলের কক্ষপথে পাঠাবে, সেখানে থাকা অন্য একটি মহাকাশযান নমুনা নিয়ে পৃথিবীর উদ্দেশে রওনা দেবে। প্রথম পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের আগে নমুনা ফেরানোর সম্ভাবনা ছিল না।
২০২২ সালে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়। এবারে পারসিভারেন্স নিজেই মঙ্গল থেকে উড্ডয়নের জন্য তৈরি একটি যানের কাছে নমুনা পৌঁছে দেবে বলে পরিকল্পনা করা হয়। পাশাপাশি রোভারটি কোনো কারণে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে না পারলে নমুনা সংগ্রহের জন্য দুটি ছোট হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনাও করা হয়। এতে নমুনা ফেরানোর সম্ভাব্য সময় পিছিয়ে দাঁড়ায় ২০৩৩ সালে।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে সর্বোচ্চ ১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। নমুনা ফেরানোর সময়ও পিছিয়ে ২০৪০ সাল পর্যন্ত গড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাজেটসংকোচন ও রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়ার বিষয়টি।
২০২৪ সালে নাসা প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি কম খরচে ও সহজ পদ্ধতিতে নমুনা ফেরানোর দুটি বিকল্প চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাসার ২০২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে জানানো হয়, অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বর্তমান পরিকল্পনা বাতিল করা হবে। প্রকল্পটি বাতিলের আগে এতে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে জানিয়েছে দ্য প্ল্যানেটারি সোসাইটির মহাকাশনীতি বিভাগের প্রধান ক্যাসি ড্রেয়ার।
তবে নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে। সেটি রোবটের মাধ্যমে, নাকি ভবিষ্যতে মহাকাশচারীদের পাঠিয়ে করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

চীনের সামনে বড় সুযোগ
নাসার এই অনিশ্চয়তার মধ্যে মঙ্গল থেকে নমুনা ফেরানোর প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে চীনের সামনে। চীনের পরিকল্পিত ‘তিয়ানওয়েন-৩’ অভিযানের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গল থেকে নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। অভিযানটি ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই অভিযানে দুটি আলাদা উৎক্ষেপণ করা হবে। একটি যানে থাকবে মঙ্গলে অবতরণের ব্যবস্থা, নমুনা সংগ্রহের সরঞ্জাম ও মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে উড্ডয়নের যান। অন্যটি বহন করবে মঙ্গলের কক্ষপথে অবস্থানকারী মহাকাশযান এবং নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা।
চীনের পরিকল্পনায় মঙ্গলের মাটির দুই মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করার ব্যবস্থাও রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ভূপৃষ্ঠের নিচে প্রাচীন প্রাণের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি একটি ছোট হেলিকপ্টারের সাহায্যেও নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনা বিজ্ঞানীরা এমন দুটি ধরনের নমুনা সংগ্রহ করতে চান, যেগুলো প্রাচীন প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। এর একটি হলো আয়রন অক্সাইডসমৃদ্ধ শিলা, যেখানে কোটি কোটি বছর ধরে কোষের মতো গঠনের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকতে পারে। অন্যটি জলীয় পরিবেশে তৈরি কাদামাটি, যাতে জীবন্ত প্রাণের মাধ্যমে তৈরি প্রাচীন জৈব অণু থাকতে পারে।
চীন এর আগে ২০২৪ সালে চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে প্রথমবারের মতো নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছিল। সেই অভিযানের অভিজ্ঞতা তিয়ানওয়েন-৩-এর পরিকল্পনায় কাজে লাগতে পারে।
তবে মঙ্গল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কাজ এখনো অত্যন্ত জটিল। চীনের পরিকল্পনাও এর ব্যতিক্রম নয়।

শেষ পর্যন্ত কি মিলবে উত্তর?
নাসার মূল প্রকল্প বাতিল হলেও পারসিভারেন্সের সংগ্রহ করা নমুনাগুলো এখনো মঙ্গলেই সুরক্ষিত রয়েছে। সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার বিকল্প পথ খুঁজছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার আওতায় ৩০টি নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন বিলিয়ন ডলারের কম খরচে এবং ২০৩৭ সালের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিজ্ঞানীদের কাছে এই নমুনাগুলোর গুরুত্ব শুধু মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদি শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, পাথরের ছোপগুলো প্রাণের কারণে তৈরি হয়নি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হতে পারে। কারণ এগুলো এমন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল হতে পারে, যা প্রাণের উৎপত্তির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনের জন্ম দিতে পারেনি।
আর যদি প্রমাণিত হয়, পৃথিবীর মতো পরিবেশ থাকার পরও মঙ্গলে কখনো প্রাণের উদ্ভব হয়নি, তাহলে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসবে— পৃথিবীতেই কেন প্রাণের জন্ম হলো?
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর প্রাচীন শিলার অনেক তথ্য ক্ষয় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় হারিয়ে গেছে। মঙ্গলের নমুনা সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের কিছু অংশ তুলে ধরতে পারে।
এখন প্রশ্ন— মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক রহস্যের উত্তর খুঁজতে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে কি এই ছোট্ট পাথরগুলো? নাকি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অর্থের অভাবে সেগুলো মঙ্গলেই পড়ে থাকবে?
উত্তর নির্ভর করছে বিজ্ঞান, অর্থায়ন এবং মহাকাশ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
সিএনএন অবলম্বনে

















