সুনামগঞ্জে যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষীর বাড়ি-দোকানে হামলা, লুটের অভিযোগ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ও আসবাবপত্র। ছবি: সংগৃহীত
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ও আসবাবপত্র। ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে উপজেলার প্রত্যন্ত দৌলতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের আলামত সংগ্রহ করেছে। আমরা ভুক্তভোগীদের মামলা করার কথা বলেছি। তবে তারা আহতদের নিয়ে হাসপাতালে থাকায় আসতে বিলম্ব হচ্ছে।”

দুলাল মিয়ার বাবা মামুদ আলী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহিদ হন। এ পরিবারের সাতজন স্বজন ও আত্মীয়ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। দুলাল মিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একদল লোক তাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়।

দুলাল মিয়া ২০১৬ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন। ওই সময় তদন্ত সংস্থার কাছে মোট ৩২ জন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ১৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দেয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দৌলতপুর গ্রামের তোতা টেইলার্স ও জলিল মিয়াসহ পাঁচজনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তারা জামিনে মুক্তি পান। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে ৩৪ জনকে হত্যা, পাঁচ নারীকে ধর্ষণ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং ৩০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়।

দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জ্বলা আক্তার শুক্রবার বলেন, “আমার বাবা একাত্তরের মানবতাবিরোধী মামলার সাক্ষী। আতঙ্কের মধ্যেই তিনি মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।”

উজ্জ্বলা জানান, তার বাবা ও তার স্বামী হেলাল মিয়া মিলে গ্রামে দোকান চালান। ওই দোকানেও উৎপাত বেড়েছে। গ্রামের অন্য যারা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তারা ৫ আগস্টের পর গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। শুধু তার পরিবার গ্রামে রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “২৩ অক্টোবর আমাদের দোকানে চুরি হয়। তখন শাল্লা থানাকে চুরির বিষয়টি অবগত করা হয়। ২৯ অক্টোবর পুলিশ গ্রামে আসে তদন্তে। তখন হামলাকারীরা পুলিশ কেন গ্রামে আসল, সেই জবাব আমাদের কাছে চায়। তারা পুলিশের সঙ্গেও তর্কে জড়ায়।”

উজ্জ্বলার অভিযোগ, “পুলিশ গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পর মধ্যরাতে যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি তোতা টেইলার্সের ভাতিজা জালাল মিয়ার নেতৃত্বে তোফাজ্জল মিয়া, যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি জলিল মিয়ার নাতি শাহিন মিয়া, হেকিম মড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামিম, নূর ইসলামসহ ১৫-২০ জন বাড়িতে ও দোকানে হামলা চালায়।”

উজ্জ্বলা আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা দোকান ও বসতঘরের মালামাল, নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। তাদের দাবি, চারটি ফ্রিজ, ছয়টি গরু, দুই ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ চার লাখ টাকা লুট হয়েছে। বাড়িঘরও ভাঙচুর করা হয়েছে।

উজ্জ্বলা বলেন, “হামলাকারীরা আমাদের পরিবারের ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে মারধর করে ও যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করে। পরে তাদেরকে দিরাই ও শাল্লা হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “হামলাকারীরা আমাকে ও আমার ১২ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টাও করেছে। আমরা যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী এবং বীরাঙ্গনা পরিবারের সদস্য। এ কারণে তারা আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়।”

দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, “আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার রাতে হামলা করে সব লুট করে নিয়ে গেছে। এখন আমার স্বামীকে খুঁজে পাচ্ছি না। ৫ অগাস্টের পর মামলার অন্য আসামিরা গ্রাম ছেড়ে ভয়ে চলে গেছেন।”

উজ্জ্বলার স্বামী হেলাল মিয়া বলেন, “হামলার খবর পেয়ে আমি সুনামগঞ্জ থেকে দৌলতপুরে গিয়ে দেখি, আমার সব শেষ। দোকান ও বাড়ির সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ ছিলেন না। হামলাকারীরা অস্ত্রশন্ত্র নিয়ে হামলারও লুটপাট করে।”

শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোকতাদির আহমদ বলেন, “দৌলতপুর গ্রামের তিন নারী ও এক শিশু আহত অবস্থায় এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি জালাল মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় পুলিশ ওই গ্রামে তদন্তে গেলেও হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের উচ্চবাচ্য হয়। রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad