মানিক পশারীর দাফনে বাধা: তদন্তে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠন

মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া এবং দাফনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ জানতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতাও যাচাই করবে কমিটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। সেসব প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় যাচাইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের নির্দেশনায় এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। অন্য দুই সদস্য হলেন— মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) একজন সদস্য। মানিক পশারীর মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা, তার মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় তদন্ত করবে কমিটি।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মানিক পশারীর সনদ যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছিল কি না, তা-ও যাচাই করা হবে। পাশাপাশি দাফনকে কেন্দ্র করে কী ঘটেছিল এবং এর পেছনে কারা ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনার পর প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ সমুন্নত রাখতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় সচেতন।
এতে আরও বলা হয়, কোনো মুক্তিযোদ্ধা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে কিংবা কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীর হয়ে ব্যবহৃত হলে তার দায় তাকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে সংকটে ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় সজাগ রয়েছে।
গার্ড অব অনার ও দাফন ঘিরে উত্তেজনা
মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে থাকছিলেন তিনি। দুই মাস অসুস্থ থাকার পর গত ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
গোপালগঞ্জ থেকে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছানোর পরে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত শনিবার উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় কয়েকজন তাকে সেখানে দাফন না করার দাবি জানান। এ সময় পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায়।
মানিক পশারী সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ায় তার মরদেহে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান ও দাফনে জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। পরে জেলা পুলিশের সহায়তায় তার মরদেহ পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়।
শনিবার বিকেল পাঁচটার দিকে গার্ড অব অনার শেষে মরদেহ নিরাপত্তায় রাখা হয়। তবে স্থানীয় কয়েকজন পিরোজপুরে তাকে দাফন না করার দাবি জানাতে থাকেন। পরে রাত একটার দিকে সদর থানা-পুলিশের সহায়তায় স্বজনরা মরদেহ চিতলিয়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রাত দুইটার দিকে পুলিশি পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।
মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শনিবার পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জহিরুল হক বলেছিলেন, “তার দাফনের বিষয়ে আমাদের কোনো বাধা ছিল না। তবে দাফনের ব্যাপারে আমাদের কোনো সহযোগিতাও ছিল না। কাদের ছত্রচ্ছায়ায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় দাফন হয়েছে, তা আমরা কিছুই জানি না।”













-421f49.jpg)

