অবশেষে গভীর রাতে সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন

দিনভর নাটকীয়তা ও চরম অনিশ্চয়তার পর অবশেষে গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় শেষ বিদায় জানানো হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া এবং নিজ গ্রামে দাফন নিয়ে স্থানীয় বিরোধের মুখে পড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়।
এর আগে মানিক পশারীর মরদেহে গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বাধার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
এরপর নিজ এলাকায় দাফন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় তারা চরম উদ্বেগের মধ্যে পড়েন। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়। এরপর পুলিশ পাহারায় মরদেহ নিয়ে চিতলিয়া গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনরা।
মানিক পশারীর ছোট বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই মারা গেছেন। প্রথমে আমরা তাকে দাফনের জন্য নিয়ে আসি। কিন্তু দাফন করতে না পারায় বিপাকে পড়ি। এখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কবর খুঁড়ছি।’
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ পুলিশ লাইনসে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জামায়াতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে দাফনের বিষয়ে সমঝোতা হয়। রাত দেড়টার দিকে পুলিশ পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।
মানিক পশারীর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলার বাদী ছিলেন তিনি। পরিবারের দাবি, মানিক পশারী একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী নিজ এলাকা ছেড়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। গত দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে টুঙ্গিপাড়ায় তার মৃত্যু হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়।
মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সকাল ১০টায় তার মৃত্যু হয়। দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আসেন তারা। গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা বলে তাদের বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এসময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই রাখতে হয়েছিল। দাফনের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক। তিনি মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে তাকে গার্ড অব অনার দিতে না দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বলেন, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।
দাফন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান ঘটিয়ে রাত দেড়টার দিকে পুলিশ পাহারায় তার মরদেহ দাফন করা হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনভর চলা অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে।














-d0b2d1-256x144.webp)