কিশোরগঞ্জে তলিয়েছে ৭ হাজার হেক্টর ধানখেত, ক্ষতিগ্রস্ত ২৫ হাজার কৃষক

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
আপডেট : ০২ মে ২০২৬, ১৯: ০২
নদ-নদীর পানি বাড়ায় ও পাহাড়ি ঢলে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন কিশোরগঞ্জের কৃষকরা। ছবি: রাজনীতি ডটকম
নদ-নদীর পানি বাড়ায় ও পাহাড়ি ঢলে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন কিশোরগঞ্জের কৃষকরা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আবারও নদ-নদীর পানি বাড়ায় ও পাহাড়ি ঢলে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাটা ধানের স্তূপেও চারা গজিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ২৫ হাজার কৃষক।

আজ শনিবার ভোর থেকে থেমে থেমে ঝড়-বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকরা হাওরে নামতে পারছেন না। ফলে কাটা ধান শুকানোর সুযোগও মিলছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খলায় (ধান শুকানোর স্থান) রাখা ধান পানিতে ডুবে রয়েছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর ধানখেত পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ইটনায় ধনু ও বোলাই নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার বেড়ে ৩ দশমিক শূন্য ১ মিটারে দাঁড়িয়েছে। মেঘনা নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ২ দশমিক ৮ মিটার এবং অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে ২ দশমিক ৩ মিটারে পৌঁছেছে। ভৈরবেও মেঘনার পানি বেড়েছে ২ সেন্টিমিটার। তবে নদীগুলোর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শুক্রবার দিনভর আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকলেও মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলার কৃষকরা তাদের ভেজা ধান শুকাতে পারেননি। কারণ বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার অধিকাংশ ধানের খলা ধানসহ তলিয়ে রয়েছে, চারা গজিয়ে পচা গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকী, ঘাগড়া, চমকপুর, হোসেনপুর, শিয়ারা, ধোবাজোড়া, গোবদীঘী, জয়সিদ্ধি, মৃগা, ধনপুর, বাধাঘাট, ইকুরদিয়া ও ভাতশালাসহ বিভিন্ন হাওরের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

হাওরে অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী ‘জিরাতি’ কৃষকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা হাওরের মাঝখানে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে ধান চাষ করেন। হঠাৎ পানি বাড়ায় তাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকেই কাটা ধান বস্তায় ভরে পানির ওপর ভাসিয়ে রেখেছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক চিড়া-গুড় খেয়ে কোনো রকমের দিন পার করছেন।

অষ্টগ্রামের কৃষক মুকুল জিরাতি জানান, তিনি ১১ একর জমি চাষ করেছেন, মাত্র ৩ একরের ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ৮ একর জমি পানির নিচে। তার কাটা ধানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, চারা গজিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চপ্টার হাওরের কৃষক তোফাজ্জল মিয়া বলেন, ‘ধান পানির তলে ডুইব্বা গেছে, এই পচা ধান কাইট্টা আইন্না কোনো লাভ নাই। ৩ একর জমি করছিলাম। বাড়ির সামনে খলায়ও পানি বন্দে। এহন যে কি করব, চিন্তা কইরা পাইতাছি না।’

কৃষকদের অধিকাংশ জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় হারভেস্টার দিয়েও ধান কাটা যাচ্ছে না। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ছোট নৌকায় ধান পরিবহন করতে হচ্ছে, ফলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা লোকসানের হিসাব মেলাতে পারছেন না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান জানান, ‘শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি তলিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন। পানি আর না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কমতে পারে।’

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কৃষকদের বহু আগেই মাইকিং করে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসে এ জেলায় মাঝারি থেকে ভারী ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।’

এদিকে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান গত দুই দিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি তিন উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে পৃথক বৈঠক করেছেন। কৃষকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement