কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যা: অটোরিকশাচালক সুমন চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার

কুমিল্লা প্রতিনিধি
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২০: ০২
জান্নাতুল তাজমিন (বাঁয়ে) ও অটোরিকশাচালক সুমন (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
জান্নাতুল তাজমিন (বাঁয়ে) ও অটোরিকশাচালক সুমন (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরীতে তার ভাইয়ের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে সুমনকে এ হত্যাকাণ্ডের ‘মূল আসামি’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে হত্যার কারণ ও ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে সুমনকে গ্রেপ্তার করে। তিনি নিহত স্কুলছাত্রীকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির চালক। গ্রেপ্তারের পর তাকে কুমিল্লায় নিয়ে আসা হচ্ছে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে।

ওসি বলেন, তদন্ত এখনও চলছে। হত্যার সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এদিকে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।

ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন

বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের চার-পাঁচটি খেতে ধানের চারা মাড়ানো অবস্থায় দেখা গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, প্রাণ বাঁচাতে হামলাকারীর হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে কিশোরী খেতজুড়ে ছোটাছুটি করে থাকতে পারে।

মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার পাশের ধানখেত থেকে একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ ও বাসের টিকিটও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া জামা দেখে তাজমিনকে শনাক্ত করেন তার বাবা।

কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ ফেরদৌস বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। তাজমিনের শরীরে আঘাতের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন ছিল না। তার গলায় গামছা পেঁচানো ছিল।

পরে সিআইডি ও পিবিআইসহ পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, তাজমিনকে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে।

বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

তাজমিন কুমিল্লার একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি যশোরে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত সে। তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করেন।

তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম জানান, গত রোববার বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তার মেয়ে। পরে বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়।

তিনি আরও জানান, বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ে তাকে মেসেজের সঙ্গে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি মেসেজটি দেখতে পাননি। ভোরে মেসেজ দেখার পর লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের দৃশ্য দেখতে পান।

তবে পুলিশের তদন্তে তাজমিনের যাতায়াত সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ্ ফেরদৌস জানান, পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল কিশোরী। কিন্তু পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, সেদিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।

পুলিশের এই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। এরপর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

সিসিটিভিতে শেষ দেখা নূরজাহান হোটেলের সামনে

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বুধবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ঢাকামুখী একটি বাস থেকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। তখন তার পরনে গোলাপি রঙের জামা ছিল এবং কাঁধে একটি ব্যাগ ঝোলানো ছিল। বাস থেকে নেমে সে হোটেলের পশ্চিম পাশের স্টেশনারি দোকানগুলোর দিকে যায়।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, হোটেলের সামনের একটি দোকানে গিয়ে হাতে থাকা কোনো একটি জিনিস দোকানদারকে দেখিয়ে কিছু জানতে চায় সে। পরে দোকানদারকে অন্য দিকে নির্দেশ করতে দেখা যায়। এরপর কিশোরী সেখান থেকে সরে অন্য পাশে চলে যায়।

প্রায় আধা ঘণ্টা পরের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর তাকে আর কোনো সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ্ ফেরদৌস বলেন, মরদেহের কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে অটোরিকশা ভাড়া করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল কিশোরী। সিসিটিভি ফুটেজ ও অটোরিকশাটিকে কেন্দ্র করে তদন্ত চলছে।

স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেপ্তার সুমন

পুলিশ জানায়, সুমনকে গ্রেপ্তারের আগে তার খালাশাশুড়ি, বোন ও বোনজামাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সহায়তায় সুমনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন প্রায়ই রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। তার নিজস্ব বাড়ি নেই; শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পুলিশ তাকে ‘নেশাগ্রস্ত’ বলেও উল্লেখ করেছে।

নিহত তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে তাজমিনের মরদেহ দাফনের জন্য শুক্রবার রাতে যশোরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement