জামায়াতের জন্য নতুন অস্বস্তি আমির হামজা

কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা আমির হামজাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্কে নতুন করে অস্বস্তিতে পড়েছে তার দল। সম্প্রতি তার ‘নারীঘটিত কেলেঙ্কারি’র তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়ার দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন।
এর আগে একটি ওয়াজ মাহফিলে তিন নারী সংসদ সদস্যকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগেও সমালোচনার মুখে পড়েন আমির হামজা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে করা মানহানির মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রাশেদ খাঁন বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার দুই শিক্ষার্থীর মাধ্যমে আমির হামজার বিরুদ্ধে ‘নারীঘটিত অভিযোগে’র কিছু তথ্যপ্রমাণ তার হাতে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকটি অডিও ও স্ক্রিন রেকর্ড রয়েছে।
এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তিনি দ্য ডিসেন্ট ও রিউমর স্ক্যানারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানান। তার ভাষ্য, দ্য ডিসেন্ট আমির হামজার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারেনি। পরে অন্য একটি মাধ্যম থেকে অডিও-ভিডিওগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন তিনি।
রাশেদ খাঁনের দাবি, আমির হামজার ‘নারীঘটিত’ বিষয়টি সম্পর্কে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও আগে থেকে জানতেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে দলটির শীর্ষ নেতারা এ নিয়ে আলোচনাও করেছিলেন।
এ ঘটনার পর ইসলামি বক্তা তারেক মনোয়ার আমির হামজাকে স্মার্টফোন ব্যবহার না করে বাটনফোন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন রাশেদ। কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতের যোগ্য প্রার্থী না থাকায় আমির হামজাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতের স্লোগান ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’ উল্লেখ করে দলটির আমিরের কাছে প্রশ্ন রাখেন রাশেদ খাঁন। তিনি জানতে চান, আমির হামজার মাধ্যমে জামায়াত কেমন আইন ও শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একই সঙ্গে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে আমির হামজাকে দল থেকে বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আরেক পোস্টে আমির হামজার কথোপকথন দাবি করে একটি অডিও প্রকাশ করেন রাশেদ খাঁন। সেখানে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একদম হুলুস্থুল করে ফেললো বিষয়টা। বিষয়টা একটু ঘুলিয়ে পাকিয়ে গেলো। আমি আপনাদের কাছে এত ক্ষমা চাওয়া, মাফ চাওয়ার পরেও আপনারা বললেন যে কন্ট্রোলে আছে, কিছু হবে না, আমার দ্বারা আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।’
কথোপকথনের আরেক অংশে আমির হামজার সঙ্গে মিল থাকা ওই কণ্ঠে বলা হয়, ‘আপনাদের ওপর আমার কোনো রাগ, ক্ষোভ বা অভিমান নেই। ওটুকু আমার শয়তানের ধোঁকায় হোক, নফসের জালে হোক, হয়ে যাওয়ার পরে আমি নিজেই অনুতপ্ত।’
রেকর্ডে আরও শোনা যায়, ‘অন্যায় করার পরে অনুতপ্ত হলে অন্তত মানুষ তো মাফ করার কথা। আপনারা যদি ইসলামি মাইন্ডের মানুষ হন। সুযোগ পেলে সাইফুল স্যারকে সঙ্গে নিয়ে আপনাদের বাড়িতে গিয়ে আন্টি-আঙ্কেলের হাত-পা ধরে হলেও মাফ চেয়ে নেবো।’
তবে রাশেদ খাঁনের প্রকাশ করা অডিও-ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এদিকে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর আমির হামজার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার অবস্থানও জানা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চললেও জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
তিন নারী সংসদ সদস্যকে নিয়ে মন্তব্য
এর আগে সংসদে তিন নারী সংসদ সদস্যকে নিয়ে ওয়াজ মাহফিলে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে আমির হামজার বিরুদ্ধে স্পিকারের কাছে বিচার চেয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
গত ২ এপ্রিল সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘এই সংসদে উপস্থিত আমি এবং আমার আরও দুজন নারী সহকর্মীর বিরুদ্ধে এই সংসদে উপস্থিত আরেকজন সদস্য যে কদাকার, কুৎসিত ভাষায় ওয়াজ মাহফিল করেছে, যে কুৎসিত ভাষায় বক্তব্য দিয়েছে, আমি আপনার কাছে এই ব্যাপারে বিচার চাইছি। সংসদে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনি বিষয়টিকে দেখবেন।’
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ওয়াজের ভিডিওতে আমির হামজাকে রুমিন ফারহানা, নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ফারজানা শারমিন পুতুল এবং ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফকে নিয়ে মন্তব্য করতে শোনা যায়।
বক্তব্যে আমির হামজা সংসদে নিজের আসনের দুই পাশে বসা নারী সংসদ সদস্যের শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার মাঝেমাঝে চিন্তা হয়, আল্লাহ, আমার ডানে-বামে যে অবস্থা; ম্যাডামগুলো যদি এদের পেটের দিকে তাকায়— ভাববে, আল্লাহ, ছেলেমেয়ে হয় আমাদের, আর পেট হয় হুজুরের পাশে দুইজনের। কী ভুঁড়ি! উঁকুন মারা যাবে ভুঁড়ির ওপরে।’
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়। তবে আমির হামজা কবে ও কোথায় ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা জানা যায়নি।
মন্ত্রী টুকুকে নিয়ে কটূক্তির মামলা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে করা মানহানির মামলাতেও আইনি জটিলতায় পড়েছেন আমির হামজা। গত ১৪ জুন মামলায় আত্মসমর্পণ করতে সিরাজগঞ্জ আদালতে হাজির হন তিনি।
মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম মল্লিক জানিয়েছিলেন, হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেওয়ার পর নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করবেন আমির হামজা। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা আদালতের।
গত ২ এপ্রিল মন্ত্রী টুকুকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ আখ্যা দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়। একই দিন আদালত তাকে ২১ এপ্রিল হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সমন জারি করেন। নির্ধারিত দিনে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
আমির হামজাকে নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
ইসলামি বক্তা হিসেবে পরিচিত আমির হামজা কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় ওয়াজ করে পরিচিতি পান। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে আল-কোরআন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন আমির হামজা। সে সময় তিনি মানুষকে মাস্ক না পরার পরামর্শ দেন। তার দাবি ছিল, করোনা এসেছে ইসলামে অবিশ্বাসীদের শাস্তি দিতে। এমনকি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে কারও করোনা হবে না বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
২০২১ সালের মে মাসে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঢাকার দুটি থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলাগুলোতে পরে তিনি অব্যাহতি পান।
২০২৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) নিয়ে আমির হামজার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিতর্ক তৈরি হয়। এক ওয়াজ মাহফিলে তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। এ ছাড়া হলের শিক্ষার্থীদের সকালে মদ দিয়ে কুলি করতে দেখেছেন বলেও বক্তব্য দেন।
এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, জাবির সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ চালু হয় ২০১১ সালে এবং ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে সেখানে প্রথম শিক্ষার্থী ভর্তি হন। ফলে ওই বিভাগে আমির হামজার ভর্তির সুযোগ পাওয়ার দাবি সত্য নয়।
হলের শিক্ষার্থীদের মদ দিয়ে কুলি করার বর্ণনার পক্ষেও কোনো প্রমাণ নেই বলে জানায় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এ ধরনের ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য না দিতে তাকে সতর্ক করে কর্তৃপক্ষ।
আগেও বিতর্কে পড়েছে জামায়াত
আমির হামজাকে ঘিরে নতুন এই অভিযোগের আগে একই ধরনের বিতর্কে পড়েছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। এক নারীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে গাজী নজরুল নিজেই ওই নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে স্বীকার করেন।
২২ জুলাই জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে সাংগঠনিক তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দল থেকে বহিষ্কারের পরও তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এর মধ্যে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের মরদেহ রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামাকে আসামি করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন।
গাজী নজরুলের ঘটনায় সংসদ সদস্য পদ নিয়েও আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়। জামায়াত থেকে বহিষ্কার বা গ্রেপ্তার— কোনোটির কারণেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না বলে সংবিধানের বিধান নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচন কমিশনও জানায়, সংসদ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
গাজী নজরুলকে ঘিরে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আমির হামজাকে নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে এল। দলটির এক সংসদ সদস্যকে আগের ঘটনায় বহিষ্কার করতে হলেও নতুন অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান কী হয়, তা এখন দেখার বিষয়।


















-786426-256x144.webp)


