বিশ্বে শিশুদের সবচেয়ে বড় কবরস্থান গাজা— জাতিসংঘে এরদোয়ান

গাজাকে ‘বিশ্বের মধ্যে শিশুদের সবচেয়ে বড় কবরস্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কঠোর চাপ প্রয়োগের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
এরদোয়ান বলেছেন, গাজায় যা ঘটছে তা বিবেকবান কোনো মানুষের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালের সীমানাভিত্তিক পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন এরদোয়ান। গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো ও নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, একজন বাবা ও দাদা হিসেবে সেখানে শিশুদের দুর্দশা এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে স্বজনদের খুঁজতে থাকা মানুষের কথা তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। তার ভাষায়, ‘আজ গাজা শুধু বিশ্বের মধ্যে শিশুদের সবচেয়ে বড় কবরস্থান নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শিশুকে অঙ্গহানি করা স্থানও।’
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, গাজা ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক বন্দিশিবিরে’ পরিণত হয়েছে। এসব বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার প্রশ্ন তোলেন।
জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি ইসরায়েলের ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান এরদোয়ান। বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে ‘শ্বাসরোধ’ করার যেকোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। এর পরিবর্তে ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে, ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গাজায় রক্তপাত বন্ধ করতে শুধু বিবৃতি যথেষ্ট নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টিও সামনে আনেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। যেসব দেশ এখনো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকারকে আরও জোরালো আন্তর্জাতিক সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনুপস্থিতির বিষয়টিও ভাষণে তুলে ধরেন এরদোয়ান। যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা না দেওয়ায় আব্বাস এ বছরের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে পারেননি— এমন প্রেক্ষাপটের কথা উল্লেখ করে তিনি এ ঘটনাকে অন্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন।
এরদোয়ান বলেন, আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের ওপর এই অবিচার মানবতার বিবেককে গভীরভাবে আহত করে। আব্বাস উপস্থিত না থাকলেও তুরস্ক ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে কথা বলে যাবে এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
জাতিসংঘের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
গাজা ইস্যুর পাশাপাশি জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এরদোয়ান। তার মতে, বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালনে জাতিসংঘ ক্রমেই অক্ষম হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতাকে ঘিরে যে কাঠামো রয়েছে, সেটি বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে না বলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।
মঙ্গলবারও নিরাপত্তা পরিষদে ব্যাপক সংস্কারের আহ্বান জানান তিনি। এরদোয়ানের বক্তব্যের পর রাশিয়া অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বিলোপের আহ্বানের বিরোধিতা করেছে।
গাজা যুদ্ধের মধ্যে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা
এরদোয়ানের বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যু অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রশ্নে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, অন্যদিকে গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। এরদোয়ানের ভাষণে সেই অবস্থানই আবারও স্পষ্ট হয়েছে— গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
এরদোয়ান যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন জাতিসংঘে থাকা ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল তার ভাষণের সময় হল ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার বক্তব্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বানই ছিল মূল বিষয়।




















