জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়ার অভিন্ন সুর, ইরান-কিউবা ইস্যুতে পালটা বার্তা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে চীন ও রাশিয়া সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান ও কিউবা নীতির বিরোধিতা করেছে। প্রতীকী ছবি
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে চীন ও রাশিয়া সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান ও কিউবা নীতির বিরোধিতা করেছে। প্রতীকী ছবি

ইরান যুদ্ধ থেকে কিউবার ওপর মার্কিন চাপ— দুই ভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকট। কিন্তু জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসে এই দুই ইস্যুতেই প্রায় একই সুরে মার্কিন নীতির বিরোধিতা করল চীন ও রাশিয়া। ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপ, একতরফা চাপ ও নিষেধাজ্ঞার নীতির বিপরীতে সার্বভৌমত্ব, সংলাপ ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বেইজিং ও মস্কো।

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিলেও মধ্যপ্রাচ্য ও কিউবা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধের সমাধান সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে করার ওপর জোর দেন তিনি।

হান বলেন, বড় দেশগুলোর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তাদের উচিত আন্তর্জাতিক নিয়ম, আইনের শাসন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখা। বিশ্বের বড়-ছোট সব দেশ সমান এবং আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান সবার আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত— এমন অবস্থানও তুলে ধরেন তিনি।

চীনের এই বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরান ঘিরে চলমান যুদ্ধ। হান ঝেং যুক্তরাষ্ট্রের নাম না করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা অবশ্যই সম্মান করতে হবে।

এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যেও টানাপোড়েন চলছে। কয়েক দিন আগেই হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকটির প্রকাশ্য পরিবেশ ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানান এবং দুই নেতা দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। কিন্তু ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ জানিয়েছেন, ট্রাম্প জিনপিংকে ইরানকে সহায়তা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এর পেছনে ছিল ইরানকে চীনের সম্ভাব্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিষয়ে মার্কিন উদ্বেগ। ইরানের তেল বিক্রি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে চীনের সহায়তার অভিযোগও আগে উঠেছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য রাখছেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং। ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য রাখছেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং। ছবি: সংগৃহীত

ফলে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই জাতিসংঘের মঞ্চে হান ঝেংয়ের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতির প্রতি বেইজিংয়ের প্রকাশ্য আপত্তির নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কিউবা নিয়ে চীনের অবস্থান ছিল আরও স্পষ্ট। হান ঝেং যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিয়ে ‘সংশ্লিষ্ট দেশ’কে কিউবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি বন্ধ এবং দেশটির ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।

চীনের এ বক্তব্যের পেছনে কিউবার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটও রয়েছে। মার্কিন চাপের মধ্যে কিউবার তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। তবে কিউবার বিদ্যুৎ অবকাঠামোর দীর্ঘদিনের দুরবস্থাও সংকটটির অন্যতম কারণ।

জাতিসংঘের মঞ্চে হান ঝেংয়ের বক্তব্য তাই শুধু কিউবার পক্ষে অবস্থান নয়, চীন যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগের নীতির বিরোধিতা করছে, তারও একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা।

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাশিয়ারও একই বার্তা

চীনের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রায় একই ইস্যুতে কথা বলেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। কিউবার বিষয়ে তিনি ওয়াশিংটনকে দেশটির ওপর ‘অবরোধ’ বা ‘অবরুদ্ধকরণ’ বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রে’র তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেন তিনি।

ইরান ইস্যুতেও রাশিয়ার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। মস্কো শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে আসছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনেও ল্যাভরভ পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক নীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানের সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ইউরোপীয় দেশগুলো শান্তি আলোচনার পথে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফলে একই দিনে চীন ও রাশিয়ার বক্তব্যে দুটি ইস্যু বারবার ফিরে এসেছে— সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের পরিবর্তে সংলাপ।

জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য রাখছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য রাখছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্পের সঙ্গে জিনপিংয়ের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বৈঠকের পরই ভিন্ন চিত্র

চীন ও রাশিয়ার এমন অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। মাত্র কয়েক দিন আগেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়েছে। সেখানে দুই নেতা প্রকাশ্যে সম্পর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। জিনপিং বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত দায়িত্বশীল বড় দেশ হিসেবে কাজ করা এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেন স্বাস্থ্যকর থাকে।

কিন্তু জাতিসংঘের মঞ্চে এসে চীনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। সম্পর্কের কূটনৈতিক উষ্ণতা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মৌলিক মতপার্থক্য এখনো অটুট। আর সেই মতপার্থক্যের জায়গাগুলোই রাশিয়ার অবস্থানের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মিলে যাচ্ছে।

অর্থাৎ, ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-জিনপিংয়ের করমর্দন যতই উষ্ণ হোক, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মঞ্চে ইরান ও কিউবা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার বক্তব্য প্রায় একই সুরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত?

তবে এটিকে সরাসরি চীন-রাশিয়ার নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশই নিজেদের স্বার্থ ও কূটনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করে। ইরান ও কিউবার ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থানের পেছনে আলাদা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক হিসাব রয়েছে।

তারপরও এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনের দৃশ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে এবং কিউবার ওপরও চাপ অব্যাহত রেখেছে, তখন চীন ও রাশিয়া একই সময়ে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সংলাপ এবং বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এতে জাতিসংঘের মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিপরীতে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক পালটা অবস্থানের ছবি স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা এবং রাশিয়ার রাজনৈতিক সমর্থন— দুটিই তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর কিউবার প্রশ্নে একই মঞ্চে বেইজিং ও মস্কোর একই দাবিতে অবস্থান নেওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে দুই দেশ অন্তত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একই কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছে।

সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement