ব্যক্তিত্ব

ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান : শিল্প ও ইতিহাসের রূপকার

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৫, ১৮: ৫৩
হামিদুজ্জামান খান। অলংকরণ: লেখক

হামিদুজ্জামান খান (জন্ম: ১৬ মার্চ ১৯৪৬, মৃত্যু: ২০ জুলাই ২০২৫) বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর কাজ শুধু রূপ-রসের শিল্প নয়; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী প্রতীক। ভাস্কর হিসেবে তাঁর সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম ও নান্দনিক অনুভূতি বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।
হামিদুজ্জামান খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালে, বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিল্পের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) চিত্রকলা বিভাগে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন এবং সেখানকার আধুনিক শিল্পচর্চা ও ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচিত হন।
হামিদুজ্জামান খানের সৃষ্ট ভাস্কর্যগুলো বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রকাশ। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে: “স্বাধীনতা” (সাভার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকা), “বিজয়ের প্রতীক” (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), রানী ভিক্টোরিয়ার পরিবর্তে ঢাকার ভাস্কর্য স্থাপন, এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনারগাঁও হোটেলসহ বিভিন্ন পাবলিক স্থানে ব্রোঞ্জ, স্টিল ও পাথরের ভাস্কর্য।
তাঁর কাজগুলোতে বিমূর্ত রীতি, বাস্তবতা এবং প্রতীকী উপাদানের দুর্দান্ত সমন্বয় দেখা যায়। তিনি ব্রোঞ্জ, তামা, পাথর এবং স্টেইনলেস স্টিলের ব্যবহার করে ভাস্কর্যে আধুনিকতার নতুন মাত্রা এনেছিলেন।
হামিদুজ্জামান খান শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক নিবেদিত শিক্ষকও। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষকতা করেছেন বহু বছর। তাঁর হাত ধরে অনেক নতুন ভাস্কর ও শিল্পীর জন্ম হয়েছে। তিনি শিল্পশিক্ষাকে শুধু কারিগরি দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং চিন্তা, অনুভব ও ইতিহাসের গভীর পাঠের মধ্য দিয়ে একে পূর্ণতা দিয়েছেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে একুশে পদক (২০১৭), বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ ও সম্মাননা, এবং শিল্পকলা একাডেমির আজীবন সম্মাননা।
হামিদুজ্জামান খান শুধু একজন শিল্পী নন; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস ও জাতিসত্তার এক জীবন্ত ভাষ্যকার। তাঁর সৃষ্ট ভাস্কর্যগুলো আমাদের ইতিহাসকে ছুঁয়ে যায়, আমাদের স্মৃতি ও আত্মপরিচয়কে দৃঢ় করে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে শিল্প শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং একটি জাতির বিবেক।

আজ তিনি চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, তবে তাঁর শিল্পচর্চা ও আদর্শ যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

না ফেরার দেশে জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পী স্বাগত দে

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন সহশিল্পী, অভিনয়শিল্পী ও দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী। স্বাগত দের প্রয়াণে বাংলা লোকসংগীত অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পী ও সংস্কৃতিজনেরা।

১৩ দিন আগে

'গজনি' খ্যাত বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রদীপ রাওয়াত আর নেই

১৪ দিন আগে

ওস্তাদ আজিজুল ইসলামের অপূর্ব বাঁশির সুরে মুগ্ধ জাতীয় প্রেস ক্লাবের শ্রোতারা

প্রথমে তিনি সংক্ষিপ্ত আলাপ পরিবেশন করেন। পরে ঝাপতাল ও তিন তালে নিবদ্ধ গৎ পরিবেশন করেন। এরপর তিনি পরিবেশন করেন রাগ হংসধ্বনি। পর্যায়ক্রমে রাগ জয়-জয়ন্তীসহ আরও কয়েকটি রাগ সংক্ষিপ্তভাবে বাঁশিতে তুলে ধরেন প্রখ্যাত এই শিল্পী।

১৯ দিন আগে

রাঙা ঠোঁটের মোহনীয়তা— আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিপ্লবেরও প্রতীক

হঠাৎ করে লিপস্টিক নিয়ে পড়ার কারণ হলো— প্রতি বছরের ২৯ জুলাই দিনটিকে বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস’ হিসেবে। না, এ দিবসে নেই কোনো সরকারি ছুটি। তবে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যপ্রেমী, মেকআপ শিল্পী আর কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রির কাছে দিনটির অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

২০ দিন আগে