বিদায়ী বছরে যাদের হারালাম

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ১১
২০২৫ সালে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরেণ্য ব্যক্তিদের হারিয়েছে বাংলাদেশ। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

বিদায় নিয়েছে ২০২৫ সাল। নানা ঘটনা আর অঘটনের মধ্যে বিদায়ী এ বছরটিতেও আমরা হারিয়েছি এমন অনেককে, যারা তাদের জীবন ও কাজের মাধ্যমে দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য নিজেদের মহীরূহতে পরিণত করেছিলেন। তারা এমন সব ব্যক্তিত্ব, যাদের প্রয়াণ দেশ ও জাতির জন্য সত্যিকার অর্থেই অপূরণীয় ক্ষতি। রাজনীতি থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতি-বুদ্ধিকবৃত্তিক পরিসর থেকে বিদায়ী বছরটিতে আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া এসব ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হলো এ প্রতিবেদনে।

খালেদা জিয়া: আপসহীন নেত্রীর চিরবিদায়

বছর শেষ হওয়ার ঠিক এক দিন আগে, ৩০ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান দেশের প্রধান নারী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। বিদায়বেলাতেও গোটা ঢাকা শহর যেন হয়ে ওঠে তার জানাজার জমিন। সেই জনসমুদ্রের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিদায় নিয়েছেন পৃথিবীর বুক থেকে।

Khaleda Zia

১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তার সরকারের আমলেই র‌্যাব গঠন, দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা থাকলেও নারী শিক্ষার প্রসার ও অর্থনৈতিক-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে তার সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপ বিশ্ব জুড়ে প্রশংসিত।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও স্বীকার করেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার মতো লড়াকু ব্যক্তিত্ব বিরল। দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতার ধকল সয়ে তার এই মহাপ্রস্থান দেশের ইতিহাসে একটি বর্ণাঢ্য যুগের পরিসমাপ্তি ঘটাল।

শরিফ ওসমান হাদি: তারুণ্যের স্পর্ধা

বছরের শেষ ভাগেই বিদায় নেন দেশের রাজনীতিতে তারুণ্যের স্পর্ধা হয়ে হাজির হওয়া শরিফ ওসমান হাদি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেওয়া এই তরুণ নেতা অত্যন্ত অল্প বয়সেই সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও জনঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তার সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ দিয়ে রাজনৈতিক মহলে স্থান করে নিয়েছিলেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী তার রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত তাদের তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে।

ওসমান হাদি

রাজনৈতিক গণ্ডিতে ক্রমেই পরিপক্ক হয়ে উঠতে থাকা ওসমান হাদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। নির্বাচনি জনসংযোগের সময়ই ১২ নভেম্বর আততায়ীর বুলেট তার মাথাকে ছিন্ন করে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের উন্নত চিকিৎসাও সে ক্ষত উপশম করতে পারেনি। ১৮ নভেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

ওসমান হাদির এ প্রয়াণ বিক্ষুব্ধ করে তোলে তার অনুসারীসহ সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের। তার জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছে, অল্প সময় ধরে প্রচারের আলোয় এলেও তিনি মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর জায়গা করে নিয়েছিলেন।

এ কে খন্দকার: মুক্তিযুদ্ধের সহসর্বাধিনায়ক

মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বীর উত্তম পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন গত ২০ ডিসেম্বর। ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি পাবনায় জন্ম নেওয়া এই বীর যোদ্ধা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছেন।

A.K. Khandaker

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিমান বাহিনী প্রধান হিসেবে বাহিনীকে গড়ে তোলা এবং এর আধুনিকায়নে এ কে খন্দকারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরবর্তী জীবনে তিনি পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনসহ রাজনীতি ও কূটনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

বদরুদ্দীন উমর: বুদ্ধিবৃত্তিতে শোষিতের কণ্ঠস্বর

প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদরুদ্দীন উমর না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন গত ৭ সেপ্টেম্বর। ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের বর্ধমানে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক আজীবন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করেছেন— একটা বয়স পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন মাঠের রাজনীতিতে, তখন থেকেই শেষ জীবন পর্যন্ত সক্রিয়তার স্বাক্ষর রাখেন কলমের কালিতে।

Badruddin-Umar-File-Photo-06-03-2025

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের কালজয়ী গবেষণা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে জনগণের সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেওয়া উমর ছিলেন শোষিত ও বঞ্চিতদের নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ২০২৫ সালে তার চিরবিদায় বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের এক প্রধান অভিভাবককে হারিয়েছে।

ড. সন্‌জীদা খাতুন: বাঙালি সংস্কৃতির বটবৃক্ষ

ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রবীন্দ্র-গবেষক ও বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ সন্‌জীদা খাতুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিদায়ী বছরের ২৫ মার্চ। ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করার মাধ্যমে তিনি যে বীজ বুনেছিলেন, তা আজ বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

Dr. Sanjida Khatun

সন্‌জীদা খাতুন ছিলেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মহীরূহ, বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী। কেবল একজন সংগীতজ্ঞ নন, তিনি ছিলেন একাধারে সংস্কৃতি কর্মী ও গবেষকসহ বহু গুণে গুণান্বিত শিক্ষক। র প্রয়াণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক সোনালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

প্রবীর মিত্র: রূপালি পর্দার বলিষ্ঠ কারিগর

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রবীর মিত্রের চিরবিদায় ঘটেছে বিদায়ী বছরের শুরুর দিকেই— ৫ জানুয়ারি। বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। ১৯৪০ সালের ১৮ আগস্ট চাঁদপুর জেলায় জন্ম নেওয়া এই শক্তিমান অভিনেতা দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

Praveer

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ থেকে শুরু করে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র মতো ছবিতে প্রবীর মিত্রের অভিনয় ছিল অনবদ্য, যা তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত করে। শেষ জীবনে তিনি দীর্ঘদিন পঙ্গুত্ব বরণ করে শয্যাশায়ী ছিলেন, তবু তার অভিনয়ের সেই তেজ দর্শকদের মনে আজও সজীব।

ফরিদা পারভীন: কণ্ঠে যার সাঁইজির ভাব-ভাষা

ফরিদা পারভীন মানেই লালন সাঁইজির গান— এভাবেই নিজেকে পরিচিত করে তুলেছিলেন তিনি। বিদায়ী বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর সেই লালনকন্যা বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্ম নেওয়া এই কণ্ঠশিল্পী লালন সাঁইয়ের গানকে ঘর থেকে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

Farida Parveen File Photo 21-07-2025

ফরিদা পারভীনের মোহনীয় কণ্ঠে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ বা ‘দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম এক আজব কারখানা’র মতো গানগুলো বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত হয়েছে। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পী লোকসংগীতের প্রচার ও প্রসারে আমৃত্যু নিবেদিত ছিলেন।

যতীন সরকার: লোকসংস্কৃতির বাতিঘর

প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, লেখক ও বরেণ্য গবেষক যতীন সরকার ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট ৮৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনার চন্দপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই পণ্ডিত আজীবন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে কাজ করেছেন। তার ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ ও ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু দর্শন’ গ্রন্থগুলো এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

Jatin Sarkar

একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত যতীন সরকার ছিলেন এ দেশের লোকঐতিহ্যের অতন্দ্র প্রহরী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক সুদৃঢ় স্তম্ভ। মাটির কাছাকাছি থাকা আজন্ম লড়াকু এই বুদ্ধিজীবীর প্রয়াণ দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হলেও তার আদর্শ ও লেখনী আগামী প্রজন্মের জন্য মুক্তির পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যের জাদুকর

বিদায়ী বছরের ২০ অক্টোবর পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও শিল্প সমালোচক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেটে জন্ম নেওয়া এই কৃতী লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কয়েক প্রজন্মের আলোকবর্তিকা ছিলেন।

Syed Manjurul Islam Fike Photo 10-19-2025

উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নতুনত্ব ও গল্প বলার ধরণ পাঠকদের এক অন্য জগতে নিয়ে যেত। তার ‘নন্দনতত্ত্ব’ ও ‘শিল্প সমালোচনা’র কাজগুলো গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এমনকি পত্রিকার পাতায় তার কলম অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে সমসাময়িক সব সংকটকে। সাহিত্যকর্ম ও ছাত্রবৎসল ব্যক্তিত্ব এই সাহিত্যের জাদুকর ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষককে অনন্তকাল পাঠক ও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে।

রকিব হাসান: কিশোরদের স্বপ্নের স্রষ্টা

জনপ্রিয় ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের স্রষ্টা রকিব হাসান পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর। ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই নিভৃতচারী লেখক এ দেশের কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে তার হাত ধরে কিশোর পাশা, মুসা ও রবিন কয়েক প্রজন্মের শৈশব-কৈশোরকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল।

Rakib-Hasan-Writer-Of-Tin-Goyenda-Passed-Away-15-10-2025

গোয়েন্দা কাহিনী ছাড়াও অসংখ্য অনুবাদ ও সায়েন্স ফিকশন লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন রকিব হাসান। এ দেশের কিশোর সাহিত্যের প্রসারে তার সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া ভার। তার প্রয়াণ কিশোর সাহিত্যের একটি সোনালী ও রহস্যময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: মাটির সুরের দরদী সাধক

কিংবদন্তি লোকসংগীত শিল্পী ও গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসী ২০২৫ সালের ১০ মে আমাদের ছেড়ে চলে যান। ১৯৩৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ভারতের কোচবিহারে জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী ছিলেন লোকসংগীতের সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের সুযোগ্য পুত্র। তিনি সারাজীবন ভাওয়াইয়া ও আধ্যাত্মিক গানের প্রচার ও প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

Mustafa-Zaman-Abbasi-File-Photo-10-05-2025

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। তার লেখা সংগীতবিষয়ক গ্রন্থগুলো গবেষণার অমূল্য সম্পদ। তিনি ছিলেন লোকসংগীতের এক চলন্ত বিশ্বকোষ।

চঞ্চল মাহমুদ: ক্যামেরার পেছনে শৈল্পিক জাদুকর

বাংলাদেশের ফ্যাশন ফটোগ্রাফির পথিকৃৎ চঞ্চল মাহমুদ ২০২৫ সালের ২০ জুন না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ১৯৫৩ সালের ১৭ জুলাই জন্ম নেওয়া এই সৃজনশীল শিল্পী এ দেশের ফ্যাশন জগতকে এক পেশাদার ও আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন। তার লেন্সের মাধ্যমেই আজকের অনেক নামিদামি তারকা ও মডেলদের ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল।

Chanchal Mahmud

চঞ্চল মাহমুদ ছিলেন ফ্রেমের জাদুকর। ফটোগ্রাফি শিল্পে দীর্ঘ পাঁচ দশকের অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছিলেন। তিনি শুধু ছবি তুলতেন না, বরং ছবির মাধ্যমে গল্প বলতেন। তার তোলা আলোকচিত্রগুলো দেশের ফ্যাশন ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।

হামিদুজ্জামান খান: পাথর ও ধাতব ভাস্কর্যের মহান কারিগর

বরেণ্য ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী হামিদুজ্জামান খান প্রয়াত হন বিদায়ী বছরের ২০ জুলাই। ১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পী বাংলাদেশের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভাস্কর্যের কারিগর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংশপ্তক’ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা তার শিল্পকর্মগুলো জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ।

Hamiduzzaman Khan

সাধারণ ধাতু বা পাথরকে প্রাণবন্ত ভাস্কর্যে রূপান্তরের এক বিরল ক্ষমতা রাখতেন হামিদুজ্জামান। নিবেদিতপ্রাণ এই শিল্পীর প্রতিটি সৃষ্টি বাঙালির শৌর্য ও সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করে। তার শৈল্পিক প্রজ্ঞা ও কাজের ধারা আগামী দিনের ভাস্করদের জন্য প্রেরণার উৎস।

আহমেদ রফিক: একুশের শেষ প্রহরী

বরেণ্য ভাষাসৈনিক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ রফিক ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর ৯৫ বছর বয়সে অনন্তলোকে পাড়ি জমান। ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম নেওয়া এই অকুতোভয় লেখক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রাজপথে ছিলেন সক্রিয় কর্মী। রবীন্দ্র গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

Ahmed Rafiq

আমৃত্যু একুশের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন আহমদ রফিক। ছিলেন ভাষা আন্দোলনের এক জীবন্ত ইতিহাস, প্রগতির এক অবিচল কণ্ঠস্বর। তার প্রয়াণ এক জীবন্ত ইতিহাসের প্রস্থান।

সৈয়দ মনজুর এলাহী: নৈতিক ব্যবসার মহীরুহ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা বিশিষ্ট শিল্পপতি সৈয়দ মনজুর এলাহী ২০২৫ সালের ১২ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের চামড়া ও জুতা শিল্পকে এপেক্স গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, বরং বাংলাদেশে ‘করপোরেট সুশাসন’ ও নৈতিক ব্যবসার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন।

Syed Manzoor Elahi

মাহমুদুল হাসান: রাজনীতির বর্ণাঢ্য অধ্যায়

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুল হাসান বিদায়ী বছরের শেষ দিন তথা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৬ সালে টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া এই অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন। একাধিকবারের নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ সামলানোর পাশাপাশি নিজ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। পালন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও।

WhatsApp Image 2026-01-02 at 9.07.43 PM

সুষমা দাস: ভাটি অঞ্চলের সুর সম্রাজ্ঞী

একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী সুষমা দাস আমাদের ছেড়ে চলে যান বিদায়ী বছরের ২৬ মার্চ। ১৯৩০ সালের ১ মে সুনামগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই মরমী শিল্পী ছিলেন ভাটি অঞ্চলের লোকসংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি শুধু গান গাইতেন না, বরং অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া লোকগান ও সুর সংগ্রহ করে সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আমৃত্যু বাউল ও লোকজ সংস্কৃতিকে অন্তরে ধারণ করেছেন তিনি।

WhatsApp Image 2026-01-02 at 9.07.44 PM

এস এ খালেক: তৃণমূলের রাজনীতিক

ঢাকার প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেক ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৩ সালে ঢাকার গাবতলীতে জন্ম নেওয়া এই নেতা মিরপুর অঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও জনবান্ধব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মিরপুরের শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তার বিদায়বেলায় গাবতলী-মিরপুর এলাকার অধিবাসীরা বলেছেন, দলের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

S. A. Khalek

মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী: দ্বীনি শিক্ষার উজ্জ্বল নক্ষত্র

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাফেজ্জী হুজুরের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তিনি সারা জীবন ইসলামের খেদমত ও নৈতিক সমাজ গঠনে কাজ করেছেন। তার মৃত্যুতে কওমি মাদরাসা ও আলেম সমাজে গভীর শোক নেমে আসে।

Maulana Ataullah Ibn Hafezji

অমরেশ রায় চৌধুরী: শাস্ত্রীয় সংগীতের রক্ষক

শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরু অমরেশ রায় চৌধুরী পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট। ১৯২৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই সংগীতশিল্পী আমৃত্যু শাস্ত্রীয় সংগীতের শুদ্ধ ধারা বজায় রাখতে কাজ করেছেন। রাজশাহীর ‘শিল্পাশ্রম ললিতকলা একাডেমি’তে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন। নিজেও গড়ে তোলেন ‘সংগীতাশ্রম’ নামের প্রতিষ্ঠান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানগুলোর আদি রেকর্ড থেকে আদি সুর উদ্ধার করে সেগুলোর স্বরলিপি করায় বড় অবদান রেখেছেন তিনি।

অমরেশ রায় চৌধুরী

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

আসাম থেকে তিন মাসে ২ হাজার জনকে বাংলাদেশে 'পুশ' করা হয়েছে

বছরের শুরুতে আসাম মন্ত্রিসভার নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ, ১৯৫০' - এর বিধি নিয়ম মেনে গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার মানুষকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে 'পুশ ব্যাক' করা হয়েছে।

৩ ঘণ্টা আগে

৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হাদি হত্যার বিচার না হলে সরকার পতনের আন্দোলন : ইনকিলাব মঞ্চ

সমাবেশে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমরা সরকারকে ৩০ কার্যদিবস সময় দিয়েছিলাম, যার মধ্যে আর ২২ দিন বাকি আছে। এর মধ্যে যদি বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরকার ব্যর্থ হয়, তবে আমরা এই সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাই না। ৩০ কার্যদিবস পর আমরা সরকার পতনের একদফা আন্দোলন শুরু করব।

৪ ঘণ্টা আগে

টোকিওতে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকবই, বিশ্ব প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা

জাপানে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধি ও কূটনৈতিকরা এই শোকবইতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। তথ্যবিবরণী অনুযায়ী, শোকবইটি আগামী ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সর্বসাধারণ ও প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

৪ ঘণ্টা আগে

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানালেন কাতারের আমির

৪ ঘণ্টা আগে