স্বাস্থ্য

ঋতুপর্ণা চাকমা: পাহাড়ের মেয়ে, দেশের গর্ব

অরুণাভ বিশ্বাস
ঋতুপর্ণা চাকমা। ছবি: এ আইয়ের তৈরি

বাংলাদেশের নারী ফুটবলে যাঁরা আশার আলো দেখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ঋতুপর্ণা চাকমা একটি উজ্জ্বল নাম। ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম থেকে উঠে এসে যিনি আজ জাতীয় দলের জার্সি পরে মাঠ কাঁপান, সেই মেয়েটির পথচলা ছিল সহজ নয়। পরিবার, সমাজ, অভাব—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই তিনি আজ দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। এই গল্প শুধু একটি খেলোয়াড়ের নয়, একটি স্বপ্নের। একটি পাহাড়ি মেয়ের সাহসিকতা, অধ্যবসায় ও প্রতিশ্রুতির গল্প।

ঋতুপর্ণার জন্ম রাঙামাটির এক পাহাড়ি এলাকায়। তাঁর জাতিগত পরিচয় চাকমা। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমা জনগোষ্ঠী একটি বড় জাতিগত গোষ্ঠী হলেও বহুদিন ধরে তাঁরা মূলধারার আলোচনার বাইরে থেকেছেন। তার ওপর একজন মেয়ে হয়ে খেলাধুলার খেলাধুলার স্বপ্ন দেখা ছিল একপ্রকার ‘প্রথাবিরোধী’ কাজ। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ঋতুপর্ণা ছিলেন সাহসী আর চঞ্চল। তিনি যখন খেলাধুলা শুরু করেন, তখন চারপাশের কেউ তেমন উৎসাহ দেয়নি। বরং অনেকে বলতেন, ‘মেয়েরা খেলাধুলা করে কী হবে?’ কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।

শুরুতে মাঠে নামা ছিল শুধু খেলার আনন্দ থেকে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন স্থানীয় টুর্নামেন্টে ভালো খেলা শুরু করেন, তখন কোচদের নজরে আসেন। ২০১৮ সালে বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৭ গোল্ডকাপ প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন। তখনই অনেকের চোখে পড়ে তাঁর পা থেকে বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, দৌড়ের গতি এবং দুর্দান্ত মানসিক দৃঢ়তা। এরপর তিনি বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে ডাক পান এবং ধাপে ধাপে এগোতে থাকেন বড় স্বপ্নের দিকে।

২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ান নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে (সাফ) বাংলাদেশের মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়। এ জয় ছিল বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এই দলের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। মাঠে তাঁর সাহসী খেলাধুলা, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোর দুর্দান্ত দক্ষতা এবং প্রয়োজনমতো আক্রমণে যোগ দেওয়ার ক্ষমতা সকলকে মুগ্ধ করে। সে ম্যাচগুলোতে তাঁর উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়—শান্ত স্বভাবের, কিন্তু মাঠে আগুনঝরানো পারফরম্যান্স।

ঋতুপর্ণা চাকমা মূলত ডিফেন্ডার হিসেবে খেলেন। রক্ষণভাগে তাঁর উপস্থিতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে অনেক কোচ তাঁকে বলেন ‘দেয়াল’। বল ক্লিয়ার করা, ট্যাকল করা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোয় তাঁর দক্ষতা দুর্দান্ত। অথচ তাঁর শরীরের উচ্চতা বা শারীরিক গঠন দেখে অনেকে মনে করেন, তিনি খুব একটা শক্তিশালী নন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, খেলার জায়গায় মনোযোগ, বুদ্ধিমত্তা এবং অনুশীলনই সবচেয়ে বড় শক্তি।

তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে জাতীয় দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন একবার বলেছিলেন, “ঋতুপর্ণা অনেক পরিশ্রমী খেলোয়াড়। সে চুপচাপ থাকে, কিন্তু তার চোখে সব সময় লক্ষ্য থাকে। মাঠে নামলেই বোঝা যায়, এই মেয়েটির মধ্যে কতটা মানসিক দৃঢ়তা আছে।” এ ধরনের প্রশংসা সহজে মেলে না। কিন্তু ঋতুপর্ণা শুধু নিজের জন্য নয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেক মেয়ের জন্য হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা।

ঋতুপর্ণার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর শিক্ষাজীবন। খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও তিনি মনোযোগী। অনেক সময় খেলোয়াড়রা খেলাধুলার চাপে পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিতে পারে না। কিন্তু তিনি চেষ্টা করেছেন দুটিকে সমানভাবে এগিয়ে নিতে। এটি তাঁর ভবিষ্যতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমাজে নারী শিক্ষার প্রতি বার্তাও বহন করে। পাহাড়ি সমাজে মেয়েরা যাতে স্বপ্ন দেখতে পারে, সেজন্য তিনি নিজেই একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন।

তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন যেমন অনুপ্রেরণামূলক, ব্যক্তিজীবনও তেমন সাহসিকতার উদাহরণ। পরিবারে আর্থিক সংকট ছিল, অনেকে বলতেন—‘মেয়ে হয়ে খেলাধুলা করবে? বিয়ে দিয়ে দাও।’ কিন্তু মা-বাবা তাঁকে থামাননি। বরং পাশে থেকেছেন। আজ তাঁর সাফল্যে সেই মা-বাবার চোখে পানি আসে। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁদের মেয়ে এখন আর শুধু তাঁদের নয়—তিনি পুরো দেশের গর্ব।

বাংলাদেশে নারী ফুটবলের পথচলা এখনো কঠিন। বাজেট কম, সুযোগ সীমিত, সম্মানও সবসময় মেলে না। কিন্তু ঋতুপর্ণা চাকমা এবং তাঁর মতো অন্য নারী ফুটবলাররা যেভাবে এগিয়ে চলেছেন, তাতে ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও আশার আলো দেখায়। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, সুযোগ দিলে মেয়েরা পারে—দেশকে গর্বিত করতে পারে, গড়ে তুলতে পারে এক নতুন ইতিহাস।

আজও হয়তো কোনো পাহাড়ি গ্রামে ছোট্ট কোনো মেয়ের হাতে বল গড়িয়ে পড়ছে। কেউ হয়তো স্বপ্ন দেখছে জাতীয় দলে খেলার। সেই স্বপ্নের পেছনে যে আলোটা জ্বলছে, তার নাম হয়তো ঋতুপর্ণা চাকমা। তাঁর গল্প আমাদের শেখায়—প্রতিভা কখনও জায়গা বা পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। প্রতিকূলতা পেরিয়ে যে উঠে দাঁড়াতে পারে, তার সামনে পথ একসময় আপনাআপনি খুলে যায়।

ঋতুপর্ণা আজ শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি এক প্রতীক—সাহস, প্রতিজ্ঞা আর স্বপ্নের। তাঁর সামনে এখনো বহু পথ। হয়তো সামনে আরও অনেক সাফ কাপ, আরও বড় টুর্নামেন্ট, আরও বড় জয় অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই পর্যন্ত এসেও তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন—বাংলাদেশের নারী ফুটবল শুধু বেঁচে আছে না, এটি বাঁচার লড়াই জিতছে। আর সেই লড়াইয়ে অন্যতম একজন যোদ্ধার নাম—ঋতুপর্ণা চাকমা।

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।

২৫ দিন আগে

প্রেমের নাটক-সিনেমার নির্মাণ-সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে আইনি নোটিশ

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারি

২৭ আগস্ট ২০২৬

এথিকের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন ২২ আগস্ট, বিশেষ প্রদর্শনী

এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনা দিয়েছেন মিন্টু সরদার। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে মঞ্চ ও নেপথ্যে যুক্ত থাকা ১০০ জন কলাকুশলীকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে।

২০ আগস্ট ২০২৬

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement