স্বাস্থ্য

হার্নিয়া সার্জারি নিয়ে কিছু কথা

মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান
প্রতিকী ছবি। ছবি : সংগৃহীত

হার্নিয়া কী?

হার্নিয়া হলো এমন একটি শারীরিক সমস্যা, যেখানে শরীরের অভ্যন্তরের কোনো অঙ্গ (সাধারণত অন্ত্র বা চর্বিযুক্ত টিস্যু) আশেপাশের দুর্বল বা ছিদ্রযুক্ত পেশির মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। এটি সাধারণত একটি ফুলে ওঠা বা চাকা আকারে অনুভূত হয়, বিশেষ করে পেট বা তলপেটের কোনো নির্দিষ্ট অংশে।

হার্নিয়ার প্রকারভেদ

১. ইনগুইনাল হার্নিয়া

সবচেয়ে সাধারণ হার্নিয়া। পুরুষদের groin (কুঁচকি) অঞ্চলে বেশি হয়। নারীদেরও এই হার্নিয়া হয়।

অন্ত্র পেশির দুর্বল জায়গা দিয়ে নিচে নেমে আসে

২. ফিমোরাল হার্নিয়া

নারীদের সাধারণত groin এর কাছাকাছি হয়।এই ধরণ টা নারীদের বেশি হয়।

অন্ত্র ফেমোরাল ক্যানাল দিয়ে নিচের দিকে সরে আসে

৩. আমবিলিকাল হার্নিয়া

নাভির চারপাশে হয়। শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে স্থূল প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারে।

৪. ইনসিশনাল হার্নিয়া

পূর্বে যেসব জায়গায় অস্ত্রোপচার হয়েছে, সেই কাটার জায়গা দিয়ে হার্নিয়া হতে পারে।বিশেষ করে জরায়ু অপারেশন, সিজারিয়ান সেকশনের পরে অথবা ইমার্জেন্সি ল্যাপারোটমির পরে হতে পারে।

৫. হায়েটাল হার্নিয়া

পেটের উপরের অংশ ডায়াফ্রাম দিয়ে বুকে উঠে আসে বুক জ্বালাপোড়া ও গ্যাসের সমস্যা হয়।

হার্নিয়ার কারণসমূহ

  • অতিরিক্ত ভার উত্তোলন (হেভি লিফটিং)
  • দীর্ঘদিনের কাশি বা হাঁচি
  • কোষ্ঠকাঠিন্য ও প্রেসার দিয়ে মলত্যাগের অভ্যাস
  • স্থূলতা (ওজন বেশি হলে পেশির ওপর চাপ পড়ে)
  • গর্ভাবস্থা (পেটের চাপ বাড়ে)
  • জন্মগত পেশির দুর্বলতা
  • অপারেশনের পর জখমের জায়গা দুর্বল হওয়া

লক্ষণ বা উপসর্গ

  • একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফুলে যাওয়া বা চাকা অনুভব হওয়া
  • দাঁড়ালে বা কাশি দিলে সেই জায়গা বড় হয়ে ওঠে
  • ব্যথা, টান লাগা বা জ্বালা
  • কিছু ক্ষেত্রে বমি, পেট ফেঁপে থাকা, কোষ্ঠকাঠিন্য
  • অনেক সময় চাকাটি হাত দিয়ে ভিতরে ঢোকানো যায় (reducible), তবে যদি ঢোকানো না যায় এবং ব্যথা বাড়ে, তাহলে তা emergency হতে পারে (strangulated hernia)

কখন চিকিৎসা প্রয়োজন?

হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না। বরং সময়ের সাথে সাথে বড় হয় এবং জটিলতা বাড়তে পারে। নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:

  • ব্যথা বাড়ছে
  • ফুলে থাকা অংশ ভিতরে ঢুকছে না
  • বমি, বমি ভাব, মলত্যাগে অসুবিধা
  • ত্বক লাল বা কালচে হয়ে যাওয়া

হার্নিয়ার চিকিৎসা

১. প্রচলিত সার্জারি

পেট কেটে হার্নিয়ার থলে বের করে ফেলা হয় বা সেটিকে পুনরায় ভিতরে ঢোকানো হয়

দুর্বল পেশি বা ফাঁক ঢাকা দিতে “মেশ” (mesh)( একটি কৃত্রিম জাল) বসানো হয়

কাটার জায়গা বড় হয় এবং সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগে

২. ল্যাপারোস্কপিক হার্নিয়া সার্জারি

এটি একটি আধুনিক, উন্নত ও নিরাপদ পদ্ধতি।

কীভাবে করা হয়?

শরীরে ৩টি ছোট ফুটো করে (প্রতিটি প্রায় ০.৫ থেকে ১ সেন্টিমিটার) একটি ক্যামেরা ও ছোট অস্ত্রোপচারের যন্ত্র প্রবেশ করানো হয় ভিতরের ছবি মনিটরে দেখা হয় হার্নিয়ার থলে পুনরায় ভিতরে ঢোকানো হয় এবং দুর্বল অংশে মেশ (Mesh) বসানো হয় ফুটোগুলো ছোট সেলাই বা স্ট্যাপলের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির সুবিধাসমূহ

  • কম ব্যথা: ছোট কাটার কারণে ব্যথা কম।
  • দ্রুত সুস্থতা : সাধারণত ২-৩ দিনের মধ্যে বাড়ি ফেরা যায়।
  • কম ঝুঁকি: ইনফেকশন বা রক্তপাতের সম্ভাবনা কম।
  • ছোট দাগ: দেহে দাগ প্রায় থাকেই না।
  • দুই পাশে একসাথে অপারেশন সম্ভব।ডান ও বাম দুই পাশে একসাথে করা যায়
  • দ্রুত কাজে ফেরা: ১ সপ্তাহের মধ্যে হালকা কাজ শুরু করা যায়

অপারেশনের পরে করণীয়

  • কয়েক দিন বিশ্রাম
  • ভারী জিনিস না তোলা (৩–৬ সপ্তাহ পর্যন্ত)
  • হালকা হাঁটা ও ব্যায়াম
  • কাশি বা হাঁচি এলে পেট চেপে রাখা
  • নিয়মিত ফলো আপ
  • সঠিক খাদ্যাভ্যাস – বেশি আঁশযুক্ত খাবার, যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য না হয়

হার্নিয়া কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি ধীরে ধীরে শরীরে বড় হতে থাকে এবং অনেক সময় মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে ভয়ের কিছু নেই— আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি বিশেষ করে ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি এখন অত্যন্ত নিরাপদ, কার্যকর ও রোগীবান্ধব। সময়মতো চিকিৎসা নিলে রোগী খুব দ্রুত আগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী রোববার থেকে চলবে

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, কিছু সংবাদ মাধ্যম এবং বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে উক্ত বিষয়টি ‘অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সকল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা’ করা হয়েছে মর্মে সংবাদ প্রকাশ করে, বিষয়টি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক বলে উল্লেখ করা হয়।

২২ দিন আগে

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ইক্কিস’ আসছে নতুন বছরে

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটির মুক্তির তারিখ এর আগে তিন দফা পরিবর্তন করা হয়। সবশেষ নির্ধারিত তারিখ ছিল আগামী ২৫ ডিসেম্বর।

২৩ দিন আগে

রেসকোর্সের দলিলে পাকিস্তানি দম্ভের সলিল সমাধি

১৬ ডিসেম্বর ছিল সেই দিন, যেদিন প্রমাণিত হয়েছিল— একটি নিরস্ত্র জাতি যখন স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়, তখন পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি বা আধুনিক সমরাস্ত্র তাদের দাবিয়ে রাখতে পারে না। মার্কিন সপ্তম নৌ বহর বঙ্গোপসাগরের নীল জলেই থমকে দাঁড়িয়েছিল। আর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সব কূটচাল ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল বাঙা

১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

ক্যান্টনমেন্টে বন্দি নিয়াজির ‘ইস্টার্ন কমান্ড’, আত্মসমর্পণের পদধ্বনি

একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর দিনটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিচিত্র ও শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়, যেখানে বিজয়ের চূড়ান্ত আনন্দ আর ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ একই সমান্তরালে চলছিল। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি ছিল বিজয়ের ঠিক আগের দিন। কিন্তু রণাঙ্গনের বাস্তবতায় এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর মানসিক মৃত্যু ও যৌথ ব

১৫ ডিসেম্বর ২০২৫