স্বাস্থ্য

নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, অবহেলা করবেন না

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
প্রতিকী ছবি। ছবি : এআইয়ের তৈরি।

নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা ‘নাক রক্তপাত’ (নাক ব্লিডিং) এমন এক অবস্থা, যা অনেককে হঠাৎ করে ভয় পাইয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন রক্তপাত বেশি হয় বা থামতে চায় না, তখন মানুষ ধরেই নেয়—বড় কিছু হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিষয়টি সবসময়ই ভয় পাওয়ার মতো নয়। তবে, এমনও হয়, যখন এটা কোনো গুরুতর রোগের পূর্বাভাস হতে পারে। তাই নাক দিয়ে রক্ত পড়া কখন সাধারণ, আর কখন তা চিন্তার বিষয়—তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণভাবে নাকের ভেতরে অনেক ক্ষুদ্র রক্তনালী থাকে। এই নালীগুলো খুবই সংবেদনশীল এবং সহজেই ফেটে যেতে পারে। এর পেছনে কারণ হিসেবে থাকতে পারে পরিবেশের শুষ্কতা, অতিরিক্ত নাক খোঁচানো, সর্দি-কাশির কারণে ভেতরের চাপ বেড়ে যাওয়া, এমনকি হালকা চোট লাগাও। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মায়ো ক্লিনিক’ জানিয়েছে, ‘‘নাক রক্তপাতের প্রায় ৯০ শতাংশই সামনের অংশের কেশলবাখ প্লেক্সাস নামের একটি জায়গা থেকে হয়, যা সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধরনের রক্তপাত সাধারণত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায় এবং গুরুতর নয়।’’

কখেনো কখনো এটি হয়ে উঠতে পারে ভয়ানক অসুখের সংকেত। বিশেষ করে যদি কেউ বারবার নাক রক্তপাতের শিকার হন, যদি রক্ত থামতে চায় না বা যদি রক্ত পড়ার সঙ্গে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তা হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, রক্তকণিকার ঘাটতি কিংবা এমনকি ক্যানসা

যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ জানায়, ‘‘যদি কেউ দিনে কয়েকবার নাক রক্তপাতের শিকার হন, তাহলে এটি নাসারন্ধ্রের ভেতরে থাকা কোনো গঠনগত সমস্যার কারণে হতে পারে, যেমন পলিপ বা টিউমার। আবার কখনও তা লিউকেমিয়া বা হেমোফিলিয়ার মতো রক্তবাহিত রোগের লক্ষণ হতে পারে।’’

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার আরও একটি পরিচিত কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ বা ‘হাই ব্লাড প্রেসার’। জার্মান গবেষক ড. হেলগে শোফার, যিনি বার্লিনের ‘চারিতে ইউনিভার্সিটি হসপিটাল’-এ কাজ করেন, তিনি জানান, ‘‘বয়স্ক রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নাকের ভেতরের রক্তনালীগুলো অতিরিক্ত চাপে ফেটে যেতে পারে, এবং এর ফলে রক্তপাত হয়। এটা অনিয়মিত হলে চিকিৎসা করানো জরুরি।’’

শীতকালে, যখন বাতাস শুষ্ক হয় এবং ঘরে গরম হিটার চলে, তখনও নাক শুকিয়ে গিয়ে রক্তপাত হতে পারে। শিশুদের মধ্যে অনেকসময় দেখা যায়, তারা নাক খোঁচাতে খোঁচাতে নিজেরাই ভেতরের নরম জায়গাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার সর্দি-জ্বর বা অ্যালার্জির কারণে অতিরিক্ত হাঁচি-কাশি হলেও নাকের ভেতর চাপে রক্তনালী ফেটে যেতে পারে।

বিশ্বখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক’ তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘‘ধূমপান, কিছু বিশেষ ওষুধ যেমন অ্যাসপিরিন বা ব্লাড থিনার, এবং অ্যালকোহল গ্রহণও নাক রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। অনেকসময় যকৃতের সমস্যাও রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’’

তবে প্রশ্ন হলো, যদি হঠাৎ করে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে, তখন কী করবেন?

প্রথমত, ভয় না পেয়ে মাথা ঠান্ডা রাখা জরুরি। পুরোনো ধারণা অনুযায়ী অনেকে মাথা পেছনে ঝুলিয়ে দেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। এতে রক্ত গলায় চলে যেতে পারে, ফলে বমি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। বরং মাথা সামান্য নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে বসে পড়ুন এবং নাকের নরম অংশ (নাকের ঠিক নিচের দিকটা) দুই আঙুল দিয়ে চেপে ধরুন। এটি একটানা ১০ মিনিট ধরে রাখতে হবে। মুখ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে থাকুন। নাকে বরফ বা ঠাণ্ডা পানির সেঁক দিলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়, ফলে রক্তপাত থামে।

নাক রক্তপাত সাধারণত ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। যদি না থামে, বা আবার শুরু হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বিশেষ করে যদি কেউ রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, ডেঙ্গু বা টাইফয়েডের মতো সংক্রমণে ভুগে থাকেন, কিংবা আগে কখনও ক্যানসার হয়েছে, তাহলে এটি হালকাভাবে নেওয়া চলবে না।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (UCLA)-এর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. নিনা রোমানো বলেন, ‘‘নাক রক্তপাত বারবার হলে রোগীকে নাকের এন্ডোস্কপি করে দেখতে হয়, ভেতরে কোনো টিউমার, ঘা বা অস্বাভাবিক গঠন আছে কি না। আবার রক্ত পরীক্ষাও করতে হয় জমাট বাঁধার ক্ষমতা ঠিক আছে কি না বুঝতে।’’

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নাক সবসময় পরিষ্কার ও স্নিগ্ধ রাখা জরুরি। শুষ্ক মৌসুমে ঘরে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করলে ভালো। নাকে পেট্রোলিয়াম জেলি বা ‘স্যালাইন স্প্রে’ দেওয়া যেতে পারে যাতে নাক ভেতর থেকে শুকিয়ে না যায়। শিশুদের নাক খোঁচাতে না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন এসব পরিহার করাই ভালো।

শেষ কথা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া অনেক সময়ই সাধারণ একটি বিষয়, যা হালকাভাবে নিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে যদি এটি ঘন ঘন হয় বা গুরুতর মনে হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ, শরীর কখনও কখনও ছোট উপসর্গের মাধ্যমেই বড় কোনো বার্তা দেয়। সেই বার্তাকে গুরুত্ব না দিলে আমরা বড় বিপদে পড়তে পারি। বিজ্ঞান ও সচেতনতা মিলিয়ে জীবনকে সুরক্ষিত রাখাটাই শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার আর নেই

লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় গত কয়েক দিন ধরে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন কারিনা। প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যোগে তাকে ভারতের চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

১১ দিন আগে

সেবা প্রকাশনীতে অনিয়ম-দুর্নীতি, কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা

১৪ দিন আগে

নায়িকার অভিযোগ, মুক্তি পাচ্ছে না ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’

নানা সমালোচনার পর মুক্তির দুই দিন আগেই স্থগিত করা হলো চিত্রনায়িকা মৌসুমী অভিনীত সিনেমা ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’-এর সেন্সর সনদপত্র। অভিনেত্রী জেবা জান্নাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিনেমার সেন্সর সনদপত্রটি বাতিল করা হয়।

১৪ দিন আগে

যুদ্ধ-ক্ষুধা-অবিনাশী সৌন্দর্য— মারাহ খালেদের ক্যানভাসে গাজার দিনলিপি

মারাহর কাজগুলো নিয়ে আমি যখন পড়ালেখা করছিলাম, আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল তার সেই ছোট্ট তাঁবুর গল্প। এক শরণার্থী শিবিরের ভেতরে, যেখানে মানুষের নিজের জন্য জায়গা নেই, সেখানে একটি তাঁবুকে গ্যালারি বানিয়ে ফেলল সে। এ যেন সেই প্রবল ধ্বংসযজ্ঞ ও অসহায়ত্বের মধ্যেও এক নীরব বিদ্রোহ।

১৪ দিন আগে