অ্যান কারসন: পুরোনো পৃথিবীর ভেতর নতুন মানুষের সন্ধান

সাঈদ বারী
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ০৬
অ্যান কারসন: পুরোনো পৃথিবীর ভেতর নতুন মানুষের সন্ধান

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রতিবছর একজন লেখককে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রের দিকে নিয়ে আসে। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পর কোনো লেখককে বোঝা যায় না, যদি তার লেখার নিজস্ব ভূগোলটি বোঝা না যায়। কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সত্য। তার সাহিত্যকে শুধু কবিতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তিনি একই সঙ্গে কবি, ক্লাসিকস-গবেষক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক এবং সাহিত্যিক পরীক্ষক। তার লেখায় প্রাচীন গ্রিসের পুরাণ ও দর্শন যেমন আছে, তেমনি আছে আধুনিক মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও শোক।

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অ্যান কারসনকে দেওয়ার ঘোষণায় তার এই বৈশিষ্ট্যটিই বিশেষভাবে সামনে এসেছে। ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যে নতুন সাহিত্যিক রূপ নির্মাণের জন্য তার কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নোবেল কমিটির মূল্যায়নের সঙ্গে তার দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কারসনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কোনো একটি বিষয় নিয়ে লেখায় নয়, বরং পুরোনো সাহিত্যকে নতুন চোখে পড়ার এবং নতুন সাহিত্যিক ভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতায়।

অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে। স্কুলজীবনে একজন লাতিন শিক্ষক তাকে প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেন। সেই আগ্রহ পরে তাকে ক্লাসিকস নিয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে নিয়ে যায়। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ক্লাসিকস, সাহিত্য ও সৃজনশীল লেখালেখি পড়িয়েছেন।

এই শিক্ষাগত পটভূমি অ্যানের সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে তার বিশেষত্ব হলো— তিনি গবেষণার বিষয়কে গবেষণার টেবিলে ফেলে রাখেননি। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য তার কাছে কোনো মৃত ঐতিহ্য নয়। বরং সেটি বর্তমানকে বোঝার একটি জীবন্ত উপাদান।

এখানেই অ্যান কারসনের সাহিত্যিক অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা সাধারণত অতীতকে দূরের একটি সময় হিসেবে দেখি। গ্রিক পুরাণ, প্রাচীন কবিতা কিংবা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো দর্শন আমাদের কাছে ইতিহাসের অংশ। কারসন সেই দূরত্বকে ভেঙে দেন। তিনি দেখান, সময় বদলালেও মানুষের কিছু মৌলিক অভিজ্ঞতা বদলায় না। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, ঈর্ষা, একাকিত্ব, হারানোর বেদনা কিংবা নিজের পরিচয় খোঁজার চেষ্টা প্রাচীন মানুষের যেমন ছিল, আধুনিক মানুষেরও তেমনই আছে।

তাই অ্যানের কাছে পুরাণ অতীতের গল্প নয়, বর্তমানেরও আয়না।

কারসনের এই দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে দেখা যায় তার ‘Autobiography of Red’ বইয়ে। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইকে একদিকে উপন্যাস, অন্যদিকে কবিতা বলা যায়। এর ভিত্তি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের খণ্ডিত রচনা ‘Geryoneis’, যেখানে হেরাক্লেস ও লাল ডানাওয়ালা দানব গেরিয়নের কাহিনি ছিল। কারসন সেই পুরাণকে আধুনিক সময়ে এনে সম্পূর্ণ নতুন এক আখ্যান নির্মাণ করেন।

এখানে গেরিয়ন আর শুধু পুরাণের দানব নয়। সে একজন সংবেদনশীল কিশোর। তার নিজের শরীর, পরিচয় ও অনুভূতি নিয়ে সংকট আছে। তার প্রেম আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় আছে। ফলে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো একটি পৌরাণিক চরিত্র আধুনিক মানুষের মানসিক জগতে প্রবেশ করে।

এই পুনর্নির্মাণই কারসনের বড় শক্তি। তিনি পুরাণকে আধুনিক করার জন্য শুধু চরিত্রের পোশাক বদলাননি। তিনি পুরাণের গভীরে থাকা মানবিক প্রশ্নগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।

‘Autobiography of Red’-এর গেরিয়নকে তাই কেবল পুরাণের পুনর্লিখিত চরিত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সে আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটেরও প্রতীক। পুরাণের দানব এখানে হয়ে ওঠে একজন মানুষ, আর তার অস্বাভাবিকতা শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাভাবিক একাকিত্বের সঙ্গে মিশে যায়।

কারসনের সাহিত্যিক পদ্ধতিটি এখানেই চমৎকার। তিনি পুরোনো গল্পকে কেবল নতুন ভাষায় বলেন না। তিনি পুরোনো গল্পের ভেতর নতুন প্রশ্ন খুঁজে পান।

এই প্রবণতার সূত্র পাওয়া যায় তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘Eros the Bittersweet’-এ। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এই বইটি মূলত প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রেমের ধারণা নিয়ে তার গবেষণার বিকাশ। পরে সেটিই তার সাহিত্যিক ভাবনার একটি ভিত্তিতে পরিণত হয়।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী কানাডার অ্যান কারসন। ছবি: সংগৃহীত
২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী কানাডার অ্যান কারসন। ছবি: সংগৃহীত

প্রেম নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণা সাধারণত আবেগকেন্দ্রিক। ভালোবাসা মানে কাছে পাওয়া, সম্পর্ক, আনন্দ। কিন্তু কারসনের কাছে প্রেমের মধ্যে দূরত্বও গুরুত্বপূর্ণ। আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কারণ যা চাই, তা পুরোপুরি আমাদের কাছে নেই। অর্থাৎ প্রেমের ভেতরেই এক ধরনের অভাব কাজ করে।

এই ভাবনাটি অ্যানের পরবর্তী লেখাগুলোতেও নানা রূপে ফিরে এসেছে। প্রেম তার কাছে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, মানুষের চাওয়া এবং না-পাওয়ার একটি জটিল মানসিক কাঠামো। এ কারণেই তার সাহিত্যকে নিছক রোমান্টিক কবিতা বলা যায় না। প্রেমকে তিনি বিশ্লেষণ করেন, তার ভাষা পরীক্ষা করেন, তার ইতিহাস খোঁজেন।

এখানে আসে অ্যান কারসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য— শব্দ নিয়ে তার অনুসন্ধান। শব্দ তার কাছে শুধু বাক্য গঠনের উপাদান নয়। একটি শব্দ কোথা থেকে এসেছে, তার পুরোনো অর্থ কী ছিল, সময়ের সঙ্গে তার অর্থ কীভাবে বদলেছে, একটি সংস্কৃতি কীভাবে সেই শব্দকে ব্যবহার করেছে, এসবও তার আগ্রহের বিষয়। কিশোর আলোর প্রতিবেদনে তার সাহিত্যকর্মের এই দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণেই তার সাহিত্য একসঙ্গে কবিতা এবং ভাষাতত্ত্বের অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

তবে কারসনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, এই একাডেমিক জ্ঞান কখনো তার কবিতাকে ভারী করে দেয়নি। বরং তিনি জ্ঞানকে কবিতার উপাদানে পরিণত করেছেন। তার লেখা কখনো কবিতা, কখনো প্রবন্ধ, কখনো গদ্য, কখনো অনুবাদ, কখনো নাটকীয় সংলাপের মতো এগিয়েছে। সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগের প্রচলিত দেয়াল তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এ কারণেই তার লেখাকে প্রায়ই ‘genre-defying’ বা প্রচলিত সাহিত্যধারার সীমা অতিক্রমকারী বলা হয়। তার সাহিত্যকর্মে কবিতা, গদ্য, সমালোচনা, অনুবাদ ও নাট্যরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে— সাহিত্যের রূপ কি বিষয় থেকে আলাদা? কারসনের কাজের উত্তর সম্ভবত, না।

একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য যদি প্রচলিত কবিতার কাঠামো যথেষ্ট না হয়, তাহলে কেন নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে না? যদি কোনো পুরাণকে নতুন করে বলতে হয়, তাহলে কেন তাকে শুধু কবিতা বা শুধু গদ্যের মধ্যে আটকে রাখতে হবে? যদি শোককে ধরে রাখতে হয়, তাহলে কেন শুধু স্মৃতিচারণের ভাষা ব্যবহার করতে হবে?

কারসনের সাহিত্য এই প্রশ্নগুলো থেকেই যেন নিজের রূপ তৈরি করে।

‘Nox’ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১০ সালে প্রকাশিত এই কাজটি তার প্রয়াত ভাইয়ের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এটি প্রচলিত অর্থে শুধু কবিতার বই নয়। ব্যক্তিগত স্মৃতি, শোক, ভাষা, অনুবাদ ও নথির সমন্বয়ে এটি এক ধরনের শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।

‘Nox’-এর গুরুত্ব এখানেই যে, কারসন শোককে শুধু অনুভূতি হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছেন স্মৃতি কীভাবে কাজ করে। একজন মৃত মানুষ কীভাবে জীবিত মানুষের মনে থেকে যান। ভাষা একজন মানুষকে কতটা ধরে রাখতে পারে। আর কোথায় গিয়ে ভাষা ব্যর্থ হয়।

এই প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগত হলেও শেষ পর্যন্ত সর্বজনীন।

অ্যান কারসনের কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত
অ্যান কারসনের কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত

প্রিয়জনের মৃত্যু পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেই এমন কিছু অনুভূতি আছে, যা পৃথিবীর প্রায় সব মানুষেরই পরিচিত। কারসন সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে নির্মাণ করেন যে পাঠক সেখানে নিজের হারানোর অভিজ্ঞতার ছায়াও দেখতে পারেন। এ কারণেই তার সাহিত্য একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আবেগপ্রবণ।

অ্যানের অনুবাদকসত্তাও এই সাহিত্যিক প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্যাফো, সফোক্লিস, ইউরিপিদিসসহ প্রাচীন গ্রিক লেখকদের অনুবাদ করেছেন তিনি। কিন্তু তার অনুবাদকে কেবল এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় শব্দ স্থানান্তর হিসেবে দেখলে তার কাজের পরিধি বোঝা যাবে না। তিনি অনুবাদকে একটি সৃজনশীল পুনর্পাঠ হিসেবেও ব্যবহার করেন।

এই জায়গায় কারসনের সাহিত্যিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। তিনি অতীতকে অনুবাদ করেন, আবার সেই অতীতকে নিজের সময়ের সঙ্গে কথোপকথনে বসান।

একজন লেখক যখন অন্য সময়ের সাহিত্যকে নিজের সময়ের ভাষায় নিয়ে আসেন, তখন তিনি শুধু অতীতকে পাঠকের সামনে হাজির করেন না। তিনি বর্তমান পাঠককেও নতুনভাবে অতীতের দিকে তাকাতে শেখান।

অ্যান কারসনের সাহিত্য এই দ্বিমুখী কাজটি করে।

তার লেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো পাঠকের সঙ্গে তার সম্পর্ক। তিনি পাঠককে সহজ উত্তর দিতে চান না। তার লেখার অর্থ অনেক সময় একবার পড়লেই পুরোপুরি ধরা পড়ে না। একটি শব্দ, একটি ইঙ্গিত, একটি পুরাণের প্রসঙ্গ কিংবা একটি বাক্য পাঠককে আবার ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারে।

এই জায়গায় তার সাহিত্য আজকের দ্রুতগতির পাঠাভ্যাসের বিপরীত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা দ্রুত পড়ি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাই, দ্রুত ভুলেও যাই। কারসনের লেখা সেই তাড়াহুড়োর সঙ্গে যায় না। তার লেখা পড়তে হয় থেমে থেমে।

এটি তার দুর্বলতাও হতে পারে, আবার শক্তিও।

যে পাঠক সরল কাহিনি ও সরাসরি বক্তব্য প্রত্যাশা করেন, তার কাছে কারসনের লেখা কঠিন মনে হতে পারে। তার সাহিত্য সব সময় পাঠককে হাত ধরে এগিয়ে নেয় না। অনেক সময় পাঠককে নিজেকেই অর্থের সন্ধানে যেতে হয়। কিন্তু আধুনিক সাহিত্যে এই কঠিন পাঠেরও প্রয়োজন আছে। কারণ সাহিত্য সব সময় আরাম দেওয়ার জন্য নয়, কখনো কখনো পাঠকের চিন্তার অভ্যাসকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্যও সাহিত্য দরকার।

অ্যান কারসনের সাহিত্য সেই অস্বস্তিকে মূল্য দেয়।

তার এই সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ, টিএস এলিয়ট প্রাইজ, গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার তার দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গেল।

তবে অ্যান কারসনের গুরুত্ব শুধু পুরস্কারের তালিকায় নয়। তার প্রকৃত গুরুত্ব সম্ভবত এই যে, তিনি দেখিয়েছেন সাহিত্যকে কোনো নির্দিষ্ট ঘরে আটকে রাখতে হয় না। একজন লেখক একই সঙ্গে কবি, গবেষক, অনুবাদক ও শিল্পী হতে পারেন। একটি কবিতার মধ্যে ইতিহাস থাকতে পারে, একটি প্রবন্ধে কবিতা থাকতে পারে, একটি পুরাণের মধ্যে আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, অতীতকে নতুন করে পড়া মানে অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া নয়। বরং নিজের বর্তমানকে আরও গভীরভাবে বোঝার একটি পথ তৈরি করা। অ্যান কারসনের সাহিত্য সেই পথ তৈরি করেছে।

প্রাচীন গ্রিস তার কাছে কোনো দূরবর্তী সভ্যতা নয়। সেটি বর্তমানের সঙ্গে কথোপকথনের একটি জায়গা। পুরাণ তার কাছে মৃত গল্প নয়। সেটি মানুষের চিরন্তন অনুভূতির ভাণ্ডার। শব্দ তাঁর কাছে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। তারও আছে ইতিহাস, স্মৃতি ও পরিবর্তনের নিজস্ব জীবন।

তাই অ্যান কারসনকে শুধু কবি হিসেবে পড়া হয়তো তার সাহিত্যিক পরিসরকে ছোট করে দেখা হবে। তাকে পড়তে হয় এমন একজন লেখক হিসেবে, যিনি সাহিত্যকে একটি অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

অ্যান উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন তুলতে বেশি আগ্রহী। অতীতকে পুনরাবৃত্তি করার চেয়ে পুনরায় আবিষ্কার করতে চান। পরিচিত গল্পকে নতুন আলোয় দেখতে চান। আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে খুঁজে আনতে চান এমন কিছু মানবিক সত্য, যা ব্যক্তির সীমানা ছাড়িয়ে যায়। এই জায়গাতেই অ্যান কারসনের নোবেল স্বীকৃতির তাৎপর্য।

এটি শুধু একজন কানাডীয় কবির আন্তর্জাতিক সাফল্য নয়। এটি এমন এক সাহিত্যিক পদ্ধতির স্বীকৃতি, যা একই সঙ্গে পুরোনো ও নতুন, গবেষণামূলক ও কাব্যিক, ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন।

পুরোনো পৃথিবীর ভেতর থেকে নতুন মানুষকে আবিষ্কার করার যে কাজ অ্যান কারসন দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন, নোবেল পুরস্কার তাকে বিশ্বসাহিত্যের আরও বড় পাঠকের সামনে নিয়ে এল। শেষ পর্যন্ত তার সাহিত্য আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর কথা মনে করিয়ে দেয়— মানুষের পৃথিবী বদলায়, ভাষা বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু মানুষকে বোঝার প্রশ্নটি থেকে যায়।

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কখনো কখনো আমাদের কয়েক হাজার বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement