আকাশ চাদরে ঘেরা পলিথিনের চাল

কাজী আহমেদ শামীম
ছোটগল্প আকাশ চাদরে ঘেরা পলিথিনের চাল। প্রচ্ছদ: রাজনীতি ডটকম
ছোটগল্প আকাশ চাদরে ঘেরা পলিথিনের চাল। প্রচ্ছদ: রাজনীতি ডটকম

ঝালকাঠির এই ছোট্ট গ্রামের আকাশে সেদিন দুপুর থেকেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছিল। মেঘগুলো পশ্চিম থেকে পূর্বে যাচ্ছিল, যেমনটা সাধারণত যায় না। মনে হচ্ছিল, তারা কোথাও যাওয়ার আগে কারও জন্য অপেক্ষা করছে।

আজমত আলী প্রথম ব্যাপারটা লক্ষ করেছিলেন দুপুরে, উঠানের তেঁতুলগাছটার নিচে বসে। তার বয়স সত্তরের কাছাকাছি। ঠিক কত, তা তিনি নিজেও জানেন না। জন্মের কোনো কাগজপত্র নেই। তবে তার ধারণা, যে বছর এই তেঁতুলগাছটায় প্রথম ফল ধরেছিল, সে বছরই তার প্রথম ছেলে নবীনের জন্ম।

গাছটার বয়স এখন প্রায় পঞ্চাশ বছর। মানুষের বয়সের হিসাব ভুল হতে পারে, গাছের হয় না।

আজমত আলী লক্ষ করলেন, তেঁতুলগাছের পাতাগুলো বাতাস ছাড়াই নড়ছে। একেকটা পাতা নড়ছে একেক দিকে। অথচ চারপাশের কলাগাছ, সুপারিগাছ, এমনকি পাশের বাড়ির টিনের চালও নিশ্চুপ।

আজমত আলী গাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী রে, তোরও কি মন খারাপ?’

তেঁতুলগাছ উত্তর দিল না। তবে তার সবচেয়ে পুরোনো ডালটা একটু নিচু হয়ে এল।

আজমত আলী অবাক হলেন না। এই গাছটার সঙ্গে তার বহুদিনের পরিচয়। মানুষ বয়স হলে যেমন পুরোনো কথা বেশি বলে, গাছও তেমনি বয়স হলে মানুষের কথা শুনতে শেখে— এ কথা তার বাবা বলতেন।

ঘরের ভেতর থেকে সাফিয়া বেগমের গলা শোনা গেল, ‘ও বুড়া, আসমানের লগে গল্প কইরা লাভ নাই। তেরপলডা দেখো। আইজ বৃষ্টি নামলে ঘরের মধ্যে মাছ চাষ করা লাগব!’

আজমত আলী হেসে উঠলেন। তাদের ঘর বলতে চারদিকে বাঁশের বেড়া, মাথার ওপর পুরোনো পলিথিন আর ছেঁড়া তেরপলের জোড়াতালি। একসময় ছন ছিল। তারপর টিন। মরিচা ধরে টিন ঝরে গেছে বহু বছর আগে। শেষ পর্যন্ত পলিথিনই হয়েছে তাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়।

ঘরের চালটা এমন যে রোদ উঠলে সূর্য ভেতরে ঢোকে, বৃষ্টি নামলে নদী। তবু আজমত আলী একে ঘরই বলেন। কারণ ঘর শুধু ইট, কাঠ আর টিনে তৈরি হয় না। কিছু ঘর তৈরি হয় অপেক্ষা দিয়ে।

এই ঘরে তার তিন সন্তানের জন্ম। এই ঘরের মাটিতে নবীন প্রথম হাঁটতে শিখেছে। মেয়ে রাবেয়া একদিন কাদামাটি দিয়ে রান্নাবাটি খেলতে গিয়ে সত্যি সত্যি আগুন ধরিয়ে ফেলেছিল। ছোট ছেলে সোহেল বর্ষাকালে ঘরের চালের ফুটো দিয়ে আকাশ দেখত আর জিজ্ঞেস করত, ‘বাবা, আসমানে কি মানুষের বাড়ি আছে?’

আজমত আলী বলতেন, ‘আছে রে বাপ। তবে সেই বাড়ির চাল ফুটো হয় না।’

সোহেল তখন বলত, ‘আমি বড় হইয়া তোমারে ওই রকম একটা বাড়ি বানাইয়া দিমু।’

আজমত আলী আজও কথাটা মনে রেখেছেন। কথারও বোধহয় বয়স হয়। কিছু কথা পুরোনো হতে হতে একসময় প্রতিশ্রুতি থেকে স্মৃতিতে, স্মৃতি থেকে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়।

সেদিন বিকেলে আকাশ আরও কালো হয়ে এল। সাফিয়া বেগম ঘরের কোণে রাখা পুরোনো কাঁথাগুলো গুটিয়ে উঁচু জায়গায় তুলছিলেন। আজমত আলী একটা বড় প্লাস্টিকের বোতল মাঝখান থেকে কেটে পানি সেচার মগ বানিয়েছেন। ঘরের তিন কোণে তিনটি হাঁড়ি ঝুলিয়েছেন দড়ি দিয়ে।

‘দেখছস বুড়ি, নতুন বুদ্ধি বাইর করছি। তিন কোণায় তিনটা হাঁড়ি। পানি পড়ব, গান বাজব। আমাগো ঘরে বাদ্যযন্ত্রের অভাব থাকব না!’

সাফিয়া বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তোমার সবকিছুতেই হাসি! ঘরে পানি পড়ে, তোমার হাসি পায়। পেটে ভাত নাই, তোমার হাসি পায়। একদিন দেখবা, হাসতে হাসতে আসমানেই উইঠা গেছ!’

আজমত আলী গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আসমানে উঠতে পারলে মন্দ কী? অন্তত চালের চিন্তা থাকব না।’

সাফিয়া হাসি চেপে ফেললেন।

বিয়ের পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেছে। এত দিনে তিনি বুঝেছেন, এই মানুষটার হাসি আসলে এক ধরনের বেড়া। দুঃখ যেন সরাসরি ঘরে ঢুকতে না পারে, সে জন্য আজমত আলী হাসির বেড়া তুলে রাখেন। কিন্তু সব বেড়া সব ঝড় আটকাতে পারে না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই বৃষ্টি শুরু হলো। প্রথমে কয়েক ফোঁটা।তারপর ঝমঝম। তারপর এমন এক বৃষ্টি, যেন আকাশের ওপরে বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা কোনো নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে।

ঘরের তিনটি হাঁড়ি একসঙ্গে বাজতে লাগল। টুপ-টাপ-টুপটাপ। কিছুক্ষণ পর আজমত আলী খেয়াল করলেন, শব্দগুলো আর এলোমেলো নেই।একটা নির্দিষ্ট ছন্দে বাজছে।

টুপ—টাপ—টুপ।

টুপ—টাপ—টুপ।

এই সুর তিনি আগে কোথায় যেন শুনেছেন। হঠাৎ তার মনে পড়ল। সাফিয়া যখন নবীনকে ঘুম পাড়াতেন, ঠিক এই ছন্দে কাঁথার ওপর হাত চাপড়াতেন। আজমত আলী চমকে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

— বুড়ি, শুনছস?

— কী?

— হাঁড়িগুলা গান গাইতাছে।

— বুড়া বয়সে মাথাডাও গেছে তোমার!

কিন্তু সাফিয়া কথা শেষ করতে পারলেন না। কারণ এবার তিনিও শুনলেন। হাঁড়ির ভেতর বৃষ্টির পানি পড়ছে, অথচ সেই শব্দের আড়াল থেকে ভেসে আসছে এক শিশুর হাসি।

খিলখিল-খিলখিল। সাফিয়ার হাত থেকে কাঁথাটা পড়ে গেল।

— নবীন!

তিনি প্রায় ফিসফিস করে ডাকলেন। সেই মুহূর্তে ঘরের উত্তর দিকের পলিথিনের ফুটো দিয়ে একটা অদ্ভুত আলো নেমে এল। আলোটা বিদ্যুতের নয়, চাঁদেরও নয়। অনেকটা পুরোনো দিনের কুপিবাতির মতো হলুদ।

সেই আলোর মধ্যে সাফিয়া দেখতে পেলেন, মাটির ওপর হামাগুড়ি দিচ্ছে এক শিশু। তার গায়ে লাল রঙের ছোট্ট জামা। নবীনের সেই জামা। যেটা তিনি নিজের পুরোনো শাড়ি কেটে সেলাই করেছিলেন।

শিশুটি একবার মুখ তুলে হাসল। তারপর বৃষ্টির পানির মধ্যে মিলিয়ে গেল। সাফিয়া দৌড়ে গিয়ে জায়গাটায় হাত রাখলেন। কেবল ঠান্ডা পানি।

আজমত আলী স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন, ‘কী দেখলা?’

সাফিয়া অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তারপর বললেন, ‘আমাগো নবীনডারে দেখলাম।’

আজমত আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘বৃষ্টিরও মনে হয় স্মৃতি আছে, বুড়ি।’

বাইরে তখন ঝড় বেড়েছে। ঘরের চালের ফুটোগুলো একে একে বড় হতে লাগল। আজমত আলী বোতলের মগ দিয়ে পানি সেচছেন। কিন্তু যত পানি সেচেন, তার দ্বিগুণ পানি ঢোকে।

হঠাৎ পলিথিনের মাঝখানের জোড়াটা খুলে গেল। একসঙ্গে এত পানি নামল যে বিছানার ওপর রাখা কাঁথাগুলো ভেসে উঠল।

সাফিয়া চিৎকার করে উঠলেন, ‘ও বুড়া, আর থাকা যাইব না!’

আজমত আলী বাঁশের লাঠিটা হাতে নিলেন, ‘চল বুড়ি। ঘরের ইজ্জত আর রাখা গেল না।’

— কোথায় যামু এই রাইতে?

— বাইরে চল। অন্তত খোলা আসমানের পানি সোজা মাথায় পড়ব। ঘরের চালের ফুটো দিয়া ঘুরপথে আইসা কানের ভিতর ঢুকব না!

সাফিয়া এই বিপদের মধ্যেও একটু হেসে ফেললেন। দুজন বেরিয়ে এলেন উঠানে। তেঁতুলগাছটার নিচে এসে দাঁড়ালেন।

চারপাশে বৃষ্টি। পুকুর আর উঠানের সীমানা মুছে গেছে। দূরের বাড়িগুলোর টিনের চাল থেকে পানি পড়ছে। বিদ্যুতের আলোয় পাকা দালানগুলো চকচক করছে।

আজমত আলীদের ঘরটা অন্ধকারের মধ্যে পড়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ডুবে যাওয়া একটা নৌকা।

সাফিয়া কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘নবীনের বাপে, তিন-তিনডা পোলামাইয়া জন্ম দিলাম। মানুষ করলাম। ঢাকায় তারা কত সুখে থাকে! বড় পোলার ঘরে এসি, মাইয়ার জামাইয়ের গাড়ি, ছোট পোলার নাকি নতুন ফ্ল্যাট হইছে। অথচ বাপ-মায়ের মাথার ওপর একখান টিনের চাল নাই!’

আজমত আলী চুপ করে রইলেন।

— একটা ফোনও দেয় না। ঈদে আসে না। আমাগো খবর লওয়ারও সময় নাই তাগো।

আজমত আলী এবার আকাশের দিকে তাকালেন। বৃষ্টি তার চোখ বেয়ে নামছে। চোখের পানিও হয়তো তার সঙ্গে মিশেছে। কিন্তু বৃষ্টির একটা সুবিধা আছে— এতে মানুষ কাঁদলেও কেউ সহজে বুঝতে পারে না।

— কান্দিস না বুড়ি। পোলাপানের কাছে আমাগো চাওয়া তো একটাই আছিল, ওরা যেন সুখে থাকে।

সাফিয়া এবার একটু রেগে গেলেন।

— সুখে থাকুক। কিন্তু সুখে থাকলে কি বাপ-মায়েরে ভুইলা যাইতে হয়?

আজমত আলী কোনো উত্তর দিলেন না। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই। ঠিক তখনই তেঁতুলগাছটা কথা বলল।

— মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী, আজমত।

আজমত আলী মাথা তুললেন। সাফিয়া কিছু শুনলেন না। তিনি তখন ভেজা শাড়ির আঁচল নিংড়াচ্ছিলেন।

গাছটা আবার বলল, ‘তোমরা সন্তানদের বড় করো যেন তারা দূরে যেতে পারে। তারপর তারা দূরে গেলে তোমরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাও।’

আজমত আলী ধীরে ধীরে বললেন, ‘তুইও বুঝি আমারে উপদেশ দিবি?’

তেঁতুলগাছের পাতাগুলো কেঁপে উঠল, ‘উপদেশ না। আমি তো সব দেখেছি।’

আজমত আলী গাছের কাণ্ডে হাত রাখলেন। সত্যিই তো। এই গাছটা দেখেছে নবীনের জন্ম। রাবেয়ার বিয়ে। সোহেলের শহরে চলে যাওয়া। দেখেছে সাফিয়ার যৌবন, আজমতের শক্ত দুই হাত। দেখেছে কীভাবে একসময় ঘরের উঠান ভরা থাকত মানুষের পায়ের শব্দে। এখন সেখানে কেবল বৃষ্টির শব্দ।

গাছটা বলল, ‘তোমার ঘরের চাল ফুটো হয়েছে আজমত, কিন্তু আকাশের চাল ফুটো হয়নি। আকাশ সব মনে রাখে।’

আজমত আলী একটু হেসে বললেন, ‘তাইলে আসমানরে ক আমাগো জন্য একখান চালের ব্যবস্থা করতে।’

তেঁতুলগাছ আর কথা বলল না। কিন্তু তার পাতাগুলো একসঙ্গে উলটো দিকে ঘুরে গেল। তারপর ঘটল সেই ঘটনা, যা পরদিন গ্রামের কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি।

বৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেল। পুরো গ্রামে নয়। শুধু তেঁতুলগাছটার নিচে।

আজমত আলী অবাক হয়ে দেখলেন, তাদের চারপাশে বৃষ্টি পড়ছে, উঠানে পানি জমছে, দূরের পুকুরে ঢেউ উঠছে। অথচ তাঁরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে এক ফোঁটাও পানি পড়ছে না।

মাথার ওপর যেন অদৃশ্য কোনো ছাদ। সাফিয়া প্রথমে বুঝতে পারলেন না। তারপর হাত বাড়িয়ে দেখলেন, গাছের ছায়ার বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে শুকনো বাতাস।

— ও বুড়া! এইডা কী হইল?

আজমত আলী আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মনে হয় আসমান আমাগো লাইগা ছাতা ধরছে।’

সাফিয়া ভয় পেলেন না। মানুষ যখন সারা জীবন অভাবের মধ্যে থাকে, তখন অলৌকিক ঘটনাকেও কখনো কখনো স্বাভাবিক মনে হয়। কারণ তার জীবনে স্বাভাবিক ঘটনাগুলোই অনেক সময় অবিশ্বাস্য রকম নিষ্ঠুর।

কিছুক্ষণ পর সাফিয়া লক্ষ করলেন, তাদের ভেজা কাপড় শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনো আগুন নেই, রোদ নেই, বাতাসও নেই। তবু শাড়ির আঁচল শুকনো। আজমত আলীর দাড়ি থেকে আর পানি ঝরছে না।

তেঁতুলগাছের ডাল থেকে তখন একে একে তিনটি পাতা খসে পড়ল। কিন্তু মাটিতে পড়ল না। তিনটি পাতা বাতাসে ভাসতে ভাসতে তাদের সামনে এসে থামল।

প্রথম পাতাটার গায়ে ফুটে উঠল একটা ঘরের ছবি। পাকা বাড়ি। কাচের জানালা। দেয়ালে রঙিন ঘড়ি।

আজমত আলী চিনতে পারলেন। নবীনের ঢাকা শহরের ফ্ল্যাট। ঘরের মধ্যে এসি চলছে। নবীন নরম বিছানায় শুয়ে আছে। তার পাশে মোবাইল ফোন। ফোনের পর্দায় বাবার নাম লেখা। সে নামটা দেখে একবার পাশ ফিরল। তারপর ফোনটা উলটো করে রাখল।

আজমত আলী দেখলেন, নবীনের ঘরের দেয়াল থেকে অদৃশ্য পানি ঝরছে। কিন্তু সেই পানি মেঝেতে পড়ছে না। সরাসরি তার বুকের ভেতর জমা হচ্ছে।

দ্বিতীয় পাতায় দেখা গেল রাবেয়াকে। সে নিজের মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছে। মেয়েটা জিজ্ঞেস করছে, ‘মা, নানুবাড়ি কবে যাব?’

রাবেয়া বলছে, ‘সময় হলে যাব।’

মেয়েটা আবার জিজ্ঞেস করছে, ‘সময় কি কোনোদিন আসে না, মা?’ রাবেয়া চুপ করে গেল।

তৃতীয় পাতায় সোহেল। নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে বৃষ্টি দেখছে। হঠাৎ তার মনে পড়ছে ছোটবেলার সেই কথা— ‘আমি বড় হইয়া তোমারে আসমানের মতো চালওয়ালা বাড়ি বানাইয়া দিমু।’

সোহেল চোখ বন্ধ করল। তারপর ঘরের ভেতরে চলে গেল। তিনটি পাতা একসঙ্গে ঝরে পড়ল আজমত আলীর পায়ের কাছে।

সাফিয়া বিস্ময়ে বললেন, ‘তুমি কী দেখলা?’

আজমত আলী বললেন, ‘আমাগো পোলামাইয়ারে।’

— কী করে?

— পাতার মধ্যে।

সাফিয়া এবার তার হাত শক্ত করে ধরলেন, ‘তাগো কইয়া দাও, আমাগো আর কিছু লাগে না। খালি একবার যেন আসে।’

আজমত আলী পাতাগুলোর দিকে তাকালেন। কিন্তু ততক্ষণে পাতাগুলো সাধারণ তেঁতুলপাতা হয়ে গেছে। তিনি সেগুলো কুড়িয়ে পকেটে রাখলেন। সেই রাতে বৃষ্টি আর থামল না। তবে তেঁতুলগাছের নিচে তাদের মাথায় আর এক ফোঁটাও পানি পড়ল না।

রাত যত গভীর হলো, চারপাশের শব্দ তত বদলাতে লাগল। ব্যাঙের ডাকের মধ্যে ভেসে এল পুরোনো দিনের মানুষের কথা। বৃষ্টির শব্দের মধ্যে শোনা গেল হাসি, কান্না, শিশুর দৌড়ঝাঁপ।

সাফিয়া হঠাৎ বললেন, ‘নবীনের বাপে, ওই যে দেখো! উঠানের পানির ওপর দিয়ে একটা ছোট্ট ছেলে দৌড়ে যাচ্ছে। তার হাতে কাগজের নৌকা। তার পেছনে একটা মেয়ে। আরও একটু দূরে আরেকটা ছোট ছেলে। তিনজনই হাসছে। তাঁদের পা পানিতে ডুবছে না।’

সাফিয়া চিনতে পারলেন। নবীন, রাবেয়া আর সোহেল। তাদের ছোটবেলার রূপ।

সাফিয়া দুহাত বাড়িয়ে ডাকলেন, ‘ও নবীন! ও রাবেয়া! সোহেল রে!’

শিশুগুলো একবার ফিরে তাকাল। তারপর তিনটি কাগজের নৌকা পানিতে ভাসিয়ে দিলো। নৌকাগুলো ধীরে ধীরে আজমত আলীদের ঘরের দিকে চলে গেল। সাফিয়া কাঁদতে লাগলেন।

আজমত আলী তাকে থামালেন না। কারণ তিনি জানতেন, সব কান্না থামাতে নেই। কিছু কান্না বুকের ভেতর বহু বছর আটকে থাকে। একদিন বৃষ্টি এসে তার দরজা খুলে দেয়।

রাতের শেষ প্রহরে সাফিয়া ঘুমিয়ে পড়লেন। তেঁতুলগাছের নিচে, আজমত আলীর কাঁধে মাথা রেখে। আজমত আলী জেগে রইলেন। তিনি লক্ষ করলেন, তাদের ঘরের পলিথিনের চালটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ছেঁড়া পলিথিনের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য ছোট ছোট তারা।

প্রথমে তিনি ভাবলেন, হয়তো আকাশের প্রতিফলন। কিন্তু না, তারাগুলো পলিথিনের গায়ে আটকে আছে। একটা তারা ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে নবীন জন্মেছিল। আরেকটা রাবেয়ার শোওয়ার জায়গার ওপর। তৃতীয়টা সোহেলের ছোটবেলার কাঠের বাক্সের কাছে।

আজমত আলী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। সাফিয়ার ঘুম ভাঙল না। তিনি ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখলেন, পলিথিনের চালের প্রতিটি ফুটো দিয়ে এখন বৃষ্টি নয়, আলো নামছে। সেই আলোয় ঘরের মাটিতে ফুটে উঠছে বহুদিনের হারানো দৃশ্য।

তরুণী সাফিয়া চুলায় ভাত বসাচ্ছেন। ছোট্ট নবীন বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরছে। রাবেয়া মাটিতে আলপনা আঁকছে। সোহেল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘর বানাচ্ছে। আর একজন যুবক আজমত আলী দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়। তার কাঁধ চওড়া, পিঠ সোজা, চোখে স্বপ্ন।

যুবক আজমত বৃদ্ধ আজমতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী রে, ঘরটা বানাইতে পারলি না?’

বৃদ্ধ আজমত মৃদু হাসলেন, ‘পারলাম না রে।’

— এত বছর খাটলি?

— হ।

— তবু?

আজমত আলী একটু ভেবে বললেন, ‘ঘর বানাইতে পারি নাই। কিন্তু তিনডা মানুষ বানাইছি।’

যুবক আজমত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘মানুষ বানানোও তো এখনো শেষ হয় না, আজমত।’

কথাটা বলে তিনি আলোর মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। আজমত আলী অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, তিনি হয়তো নিজের সন্তানদের বড় করতে গিয়ে একটা ভুল করেছিলেন। তিনি তাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে অভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। কিন্তু শেখাতে পারেননি, অভাবের ভেতর যারা থেকে যায়, তাদের দিকে ফিরে তাকাতে হয় কীভাবে।

আজমত আলীর মনে হলো, কথাটা সন্তানদের জানানো দরকার। কিন্তু কীভাবে? তার নিজের কোনো মোবাইল ফোন নেই। থাকলেও এত রাতে কাকে ফোন করতেন?

ঠিক তখনই তেঁতুলগাছের সবচেয়ে পুরোনো ডালটা নড়ে উঠল। গাছটা বলল, ‘সব খবর ফোনে যায় না, আজমত। কিছু খবর পৌঁছায় স্বপ্নে।’

সেই রাতে ঢাকার তিনটি আলাদা বাড়িতে তিনজন মানুষ একই স্বপ্ন দেখল। নবীন দেখল, তার এসির ঠান্ডা বাতাস হঠাৎ বৃষ্টির পানিতে পরিণত হয়েছে। বিছানা ভিজে যাচ্ছে। সে উঠে বসে দেখে, তার বাবা ঘরের কোণে একটা প্লাস্টিকের মগ দিয়ে পানি সেচছেন।

নবীন বলল, ‘বাবা, তুমি এখানে?’

আজমত আলী উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, ‘তোর ঘরের চাল তো ভালোই আছে রে বাপ। আমারে একটু শুকনা জায়গা দিবি?’

নবীন ঘুম ভেঙে উঠে বসল। তার বুক ধড়ফড় করছে।

রাবেয়া স্বপ্ন দেখল, তার মা ভেজা শাড়ি পরে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। রাবেয়া বলল, ‘মা, তুমি ভিজছ কেন?’

সাফিয়া বললেন, ‘তোর ছোটবেলার কাঁথাডা শুকাইতে আইছি মা। তোর ঘরে কি একটু রোদ আছে?’

রাবেয়া ঘুম ভেঙে উঠে কাঁদতে লাগল।

আর সোহেল দেখল, তার নতুন ফ্ল্যাটের ছাদটা ধীরে ধীরে পলিথিন হয়ে যাচ্ছে। সেই পলিথিনের ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। আকাশের মধ্যে তার বাবা দাঁড়িয়ে। সোহেল ডাকল, ‘বাবা!’

আজমত আলী বললেন, ‘আসমানের বাড়িডা ভালোই তো বানাইছস রে বাপ?’

সোহেল ঘুম ভেঙে উঠে বসে রইল।

তিনজনই ভোরের আগে বাবার পুরোনো নম্বরে ফোন করল। নম্বরটি বহুদিন ধরে বন্ধ। তারা কেউ জানত না, সেই নম্বরের সিমটাও আর নেই। তবু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, তিনজনের ফোনেই একবার করে রিং হলো।

তারপর ওপাশ থেকে ভেসে এল বৃষ্টির শব্দ। আর খুব দূর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ, ‘ভালো আছস তোরা?’

তিনজনই একই সঙ্গে বলল, ‘বাবা!’ কিন্তু লাইন কেটে গেল।

পরদিন সকালে ঝালকাঠির আকাশ পরিষ্কার। গ্রামের লোকজন দেখল, আজমত আলীদের ঘরের চালের পলিথিনে কোথাও কোনো ফুটো নেই। অথচ আগের দিন পর্যন্ত চালটা ছিল শতছিন্ন। পলিথিনের গায়ে অসংখ্য ছোট ছোট সাদা দাগ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ রাতের অন্ধকারে সেখানে তারা এঁকে দিয়েছে।

সাফিয়া বিস্ময়ে বললেন, ‘ও বুড়া, এইডা কী কাণ্ড?’

আজমত আলী গম্ভীর মুখে বললেন, ‘রাইতে আসমানের মিস্ত্রি আইছিল মনে হয়।’

সাফিয়া হেসে ফেললেন। কিন্তু আজমত আলীর হাসি সেদিন অন্যরকম। তার মধ্যে বহুদিন পর একটুখানি শান্তি। দুপুরের দিকে গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি এলো। তারপর আরেকটা। তারপর একটা মোটরসাইকেল। প্রথম গাড়ি থেকে নামল নবীন। দ্বিতীয় গাড়ি থেকে রাবেয়া। মোটরসাইকেল থেকে সোহেল।

তিনজনই প্রায় একসঙ্গে উঠানে ঢুকল। আজমত আলী তেঁতুলগাছের নিচে বসে ছিলেন। তাদের দেখে প্রথমে কিছু বললেন না। শুধু চোখ কুঁচকে তাকালেন।

নবীন এগিয়ে এসে বলল, ‘বাবা, কেমন আছ?’

আজমত আলী হাসলেন, ‘ভালা আছি রে। তোরা কেমন আছস?’

রাবেয়া মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। সোহেল ঘরের চালের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘বাবা, তোমার ঘরের এই অবস্থা?’

আজমত আলী বললেন, ‘অবস্থা তো বহুদিনের। তোর চোখে আইজ পড়ল?’

কথাটা খুব আস্তে বলা। কিন্তু তিন সন্তানের কেউ উত্তর দিতে পারল না।

সাফিয়া তাড়াতাড়ি বললেন, ‘ওদের বকো না। এত দূর থেইকা আইছে।’

আজমত আলী মাথা নাড়লেন, ‘বকতাছি না বুড়ি। খালি কইতাছি, মানুষ দূরে গেলে দূরত্ব বাড়ে না। খবর না নিলে দূরত্ব বাড়ে।’

সোহেল ঘরের ভেতরে ঢুকল। ভাঙা খাট। পুরোনো কাঁথা। মাটির মেঝে। দেয়ালে ঝুলছে তার ছোটবেলার একটা ছবি। প্রায় বিবর্ণ। সে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বাইরে এসে বলল, ‘বাবা, আমরা তোমাদের একটা পাকা ঘর বানিয়ে দেবো।’

আজমত আলী কোনো উত্তর দিলেন না।

নবীন বলল, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শুরু করব।’

রাবেয়া বলল, ‘তোমরা আর এভাবে থাকতে পারবে না।’

আজমত আলী এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, ‘ঘর বানাবি, ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস। ঘরের চাল পাকা করলেই ঘর পাকা হয় না।’

তিন সন্তান চুপ করে রইল। আজমত বলতে লাগলেন, ‘ঘরের ভিতরে মানুষের জন্য জায়গা রাখতে হয়। সময় রাখতে হয়। খোঁজখবর রাখতে হয়। নাইলে পাকা ঘরও একদিন পলিথিনের মতো হইয়া যায়।’

সোহেল মাথা নিচু করল। সাফিয়া তখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। আজমত আলী তাকে ডাকলেন, ‘বুড়ি, আইজ একটু বেশি ভাত চড়াইস।’

সাফিয়া ঘুরে তাকালেন, ‘চাইল কই?’

আজমত আলী একটু থমকালেন। তারপর হাসলেন, ‘দেখ, পোলাপান আইছে। চাইলের ব্যবস্থাও হইব।’

নবীন তাড়াতাড়ি বলল, ‘আমি বাজার থেকে সব নিয়ে আসছি, বাবা।’

আজমত আলী বললেন, ‘তাইলে আগে তোর মায়ের লগে বস। বাজার পরে হইব।’

সেদিন দুপুরে বহু বছর পর আজমত আলীদের উঠানে একসঙ্গে পাঁচজন মানুষের খাবার বসেছিল। খাবার খুব সাধারণ। ভাত, ডাল, আলুভর্তা আর ছোট মাছের ঝোল। কিন্তু সাফিয়ার মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর তার রান্নাঘরে সত্যিকারের আগুন জ্বলছে। শুধু চুলায় নয়। মানুষের ভেতরেও।

বিকেলে সোহেল তেঁতুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, এই গাছটা কাটতে হবে না তো? নতুন ঘর বানাতে গেলে জায়গা লাগবে।’

আজমত আলী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না রে। ঘর ছোট করিস, তবু গাছ কাটিস না।’

সোহেল বলল, ‘কেন বাবা?’

আজমত আলী গাছের গায়ে হাত রাখলেন, ‘এই গাছটা আমাগো সব কথা জানে।’

সোহেল হেসে বলল, ‘গাছ আবার কথা জানে নাকি?’

আজমত আলীও হাসলেন, ‘সবাই সব কথা শুনতে পায় না রে বাপ।’

সেদিন সন্ধ্যায় তিন সন্তান ফিরে যাওয়ার আগে ঠিক করল, পরের সপ্তাহেই ঘরের কাজ শুরু হবে। শুধু টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে না, পালা করে এসে বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটাবে।

আজমত আলী তাদের কথায় খুশি হলেন। তবে খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখালেন না। তিনি জানেন, প্রতিশ্রুতি বৃষ্টির মেঘের মতো। সব মেঘ থেকে পানি নামে না। তবু মেঘ দেখলে মানুষ আকাশের দিকে তাকায়।

সন্তানেরা চলে যাওয়ার পর সাফিয়া বললেন, ‘ও বুড়া, দেখলা? আল্লাহ শেষ পর্যন্ত আমাগো দিকে চাইছেন।’

আজমত আলী মাথা নাড়লেন, ‘হ বুড়ি। তবে একটা কথা বুঝলাম।’

— কী?

— আসমানের ছাদ অনেক বড়। কিন্তু মানুষের মনের ছাদ ছোট হইলে সেই আসমানেও জায়গা হয় না।

সাফিয়া কিছু বললেন না। তিনি শুধু বুড়োর পাশে এসে বসলেন।

রাত নামল। আকাশে তারা উঠল। সেদিন আর বৃষ্টি হলো না। তবু আজমত আলী ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার ঘরের চালের দিকে তাকালেন। দেখলেন, পলিথিনের গায়ে সাদা দাগগুলো আবার জ্বলজ্বল করছে। ঠিক আকাশের তারার মতো।

তিনি মৃদু স্বরে বললেন, ‘ভালো থাকিস রে।’

কাকে বললেন, তা সাফিয়া বুঝতে পারলেন না। সন্তানদের? তেঁতুলগাছকে? নাকি সেই আকাশকে, যে এক রাতের জন্য তাদের মাথার ওপর নিজের চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল?

এরপর গ্রামে নতুন ঘর তৈরির কাজ শুরু হলো। ইট এলো, বালু এলো, সিমেন্ট এলো। রাজমিস্ত্রিরা পুরোনো ঘরের পলিথিন খুলতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল, তার গায়ে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র। অথচ প্রতিটি ছিদ্রের চারপাশে এমনভাবে সাদা দাগ জমে আছে, যেন কেউ সুঁই দিয়ে আকাশের নক্ষত্রমণ্ডল এঁকেছে।

একজন মিস্ত্রি বলল, ‘চাচা, এই পলিথিন ফালাইয়া দিই?’

আজমত আলী তাড়াতাড়ি বললেন, ‘না বাবা, ওইডা রাখো।’

— এই ছেঁড়া জিনিস দিয়া কী করবেন?

আজমত আলী একটু হেসে বললেন, ‘একদিন আসমান এইডার নিচে নামছিল।’

মিস্ত্রি হেসে উঠল। আজমত আলীও হাসলেন। কিন্তু তেঁতুলগাছটা হাসল না। তার পাতাগুলো সেদিন অকারণে কেঁপে উঠেছিল।

নতুন ঘর তৈরি হলো। টিনের চাল, পাকা মেঝে, জানালা, দরজা। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে আর ঘরের ভেতর পানি পড়ল না।

সাফিয়া আনন্দে কেঁদে ফেললেন। আজমত আলী বিছানায় বসে বৃষ্টির শব্দ শুনলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, নতুন টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ খুব জোরে হয়। কিন্তু সেই শব্দের মধ্যে তিনি আর নবীনের শিশুকালের হাসি শুনতে পেলেন না। রাবেয়ার পায়ের নূপুরের শব্দ নেই। সোহেলের কাগজের নৌকার ছলছল শব্দ নেই।

শুধু বৃষ্টি। নিছক বৃষ্টি।

সেই রাতে পুরোনো পলিথিনটা বের করলেন আজমত আলী। সযত্নে ভাঁজ করা ছিল। তেঁতুলগাছের নিচে নিয়ে গিয়ে মেলে ধরলেন। সাফিয়া পেছন থেকে বললেন, ‘ও বুড়া, নতুন ঘর হইছে, আবার ওই ছেঁড়া পলিথিন নিয়া কী করো?’

আজমত আলী বললেন, ‘দেখি, আসমানডা এখনো আছে কি না।’

পলিথিনটা মেলে ধরতেই অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। তার শত শত ছিদ্র দিয়ে আকাশের তারাগুলো দেখা গেল। কিন্তু সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। একটিও তারা থাকার কথা নয়। আজমত আলী অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে পলিথিনটা ভাঁজ করলেন।

সাফিয়া জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দেখলা?’

আজমত আলী বললেন, ‘পুরোনো ঘরডা।’

— পুরোনো ঘরে আবার কী আছে?

তিনি স্ত্রীর দিকে তাকালেন, ‘আমাগো জীবনটা আছে, বুড়ি।’

সাফিয়া আর কিছু বললেন না। শুধু এসে তার পাশে দাঁড়ালেন।

তেঁতুলগাছের পাতাগুলো তখন অদ্ভুত এক সুরে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, বহুদিন আগে কোনো মা তার শিশুকে ঘুম পাড়াচ্ছেন।

টুপ, টাপ, টুপটাপ।

সেই রাতে ঝালকাঠির আকাশে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। গ্রামের লোকজন বলেছিল, মৌসুমি নিম্নচাপ। কেউ কেউ বলেছিল, জলবায়ুর পরিবর্তন।

শুধু আজমত আলী জানতেন, সব বৃষ্টির ব্যাখ্যা আবহাওয়ার খবর দিয়ে হয় না। কিছু বৃষ্টি নামে মেঘ থেকে। কিছু বৃষ্টি নামে স্মৃতি থেকে। আর কিছু বৃষ্টি নামে মানুষের বুকের এমন এক জায়গা থেকে, যেখানে কোনোদিন রোদ পৌঁছায় না।

সেই জায়গাটুকু শুকনো রাখার জন্য পৃথিবীর সমস্ত টিন, ইট আর সিমেন্টও যথেষ্ট নয়। সেখানে প্রয়োজন আরেক মানুষের হাত। সেই হাতের উষ্ণতা। আর একটু মনে রাখা।

কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় কোনো পাকা ঘর নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো— কারও মনে নিজের জন্য একটুখানি জায়গা থাকা।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement