প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কি চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য?

জাকির আহমদ খান কামাল

বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি বিষয় হলো—

  • প্রধান শিক্ষকদের রিট পিটিশন নম্বর ৩২১৪/২০১৮-এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন;
  • সদ্য জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের জন্য অর্থম ন্ত্রণালয় থেকে ১২ আগস্ট ২০২০ তারিখে জারি করা টাইমস্কেল সংক্রান্ত চিঠি প্রত্যাহারসহ তিন দফা দাবি;
  • সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডসহ শতভাগ পদোন্নতি; এবং
  • সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি পদ হিসেবে ধরে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি।

এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতারা পৃথক পৃথক প্ল্যাটফর্ম থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির হাত ধরেই শুরু হয়েছিল।

১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে এক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি’ রাখা হয়। অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশের ৩৬ হাজার ১৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ ১ লাখ ৫৫ হাজার ২২৩ জন শিক্ষককে জাতীয়করণ করা হয়। তখন তিনি ছিলেন শিক্ষকদের নেতৃত্বে। এরপর থেকে ন্যায্য বিভিন্ন দাবি নিয়ে সমিতি কাজ করে এসেছে।

২০০৮ সালে আদালতের রায়ে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সভাপতির পদ হারান। সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ নুরুল আবছার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কাজী আ কা ফজলুল হক তখন পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

২০০৮ সালের ১ মে ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মো. নুরুল আবছার সভাপতি এবং মো. সিদ্দিকুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

চার বছর পর ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে পরবর্তী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আবুল বাসার সভাপতি ও মো. আনোয়ারুল ইসলাম তোতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সময় ১০ দফা দাবিনামা গ্রহণ করা হয়।

২০১৩ সালে শিক্ষকরা ১০ দফার ভিত্তিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এর ফলে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ সরকার প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণি এবং সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীত করে।

এরপর থেকেই মূলত বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির অস্তিত্ব সংকট শুরু হয়। একই নামে একাধিক বিভক্ত সংগঠনের আবির্ভাব ঘটতে থাকে। সবার নাম আমার জানা নেই, আর যাদের নাম জানা আছে, তাদের নাম উল্লেখ করে কাউকে ছোট করতে চাই না। তবে কেউই সংগঠনের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দাঁড়াতে পারেনি।

সবাই নেতৃত্বের শীর্ষে থাকতে মরিয়া। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাইনবোর্ডের সামনে সেলফি তুলে বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কোনো না কোনো সংগঠনের পদবি যোগ করে ‘নেতা’ হয়ে যায়। কখনো আবার গভীর রাতে ফেসবুক লাইভে এসে বক্তব্য রেখে সমকালীন সমস্যার ‘সমাধান’ দিয়ে নিজের নেতৃত্ব জাহির করে।

এসব ‘নেতা’ কখনো সাধারণ শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। কারণ সাধারণ শিক্ষকদের মনোনয়নের মাধ্যমে কাউকে নেতৃত্বে পাঠানো হয়নি। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ চাঁদাবাজির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েও নির্লজ্জভাবে নেতৃত্বের আসনে বসে রয়েছেন। লজ্জা-শরম কিছুই স্পর্শ করে না তাদের।

এসব ফেসবুকনির্ভর, কথিত ‘নেতৃত্বে’র কারণেই আজ পুরো শিক্ষক সমাজকে চাঁদাবাজির অপবাদ সইতে হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম এনডিসি (পলিসি ও অপারেশন) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, ৪৫ জন প্রধান শিক্ষককে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনবিভাগ রিট পিটিশন নম্বর ৩২১৪/২০১৮-এর রায় বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছে এবং অবশিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি/আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছে— এমন বিশ্বস্ত সূত্রের খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া এ ধরনের লেনদেন ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় এমন সুবিধা গ্রহণকারী চাঁদাবাজদের নিকটস্থ থানায় সোপর্দ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তাহলে কি আন্দোলনের নামে চলছে নীরব চাঁদাবাজি?

প্রাথমিক শিক্ষকরা আজ বিপর্যস্ত। তাদের ন্যায্য দাবির তালিকা ক্রমাগত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না। এর পেছনে মূল কারণ— বিভক্ত সংগঠন, স্বঘোষিত নেতৃত্ব, শিক্ষক সংগঠনের অনৈক্য, নেতৃত্বের অহংকার ও অসহিষ্ণু মনোভাব।

সব মিলিয়ে যেন ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ বা ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার’ প্রবাদের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মানসিকতা না থাকলেও দালালি ও চামচামির বেলায় এদের মধ্যে কোনো ঘাটতি নেই। স্বঘোষিত এইসব প্রাথমিক শিক্ষক নেতারা এখন চাঁদাবাজি ও তেলবাজির চূড়ায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সংগ্রাম, সাফল্য ও প্রেরণার ৫৩ বছরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই হতাশাজনক মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।

লেখক: প্রধান শিক্ষক ও কলাম লেখক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

১৬ দিন আগে

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

১৮ দিন আগে

পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আ

১৯ দিন আগে

আমরা যা দেখাই, আমরা কি সত্যিই তাই?

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন

২০ দিন আগে
Advertisement