টিআইবির গবেষণা নিয়ে জামায়াতের বিবৃতি ‘বিভ্রান্তিমূলক ও সত্যের অপলাপ’

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯: ৫৪
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। লোগো
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। লোগো

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিবৃতিকে ‘বিভ্রান্তিমূলক ও সত্যের অপলাপ’ বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। টিআইবি বলছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর নামমাত্র প্রতিপালনের মাধ্যমে নারীদের স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে দলের সর্বস্তরে নারীর অন্তর্ভুক্তি দাবি করা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতির বিপরীতে টিআইবি তাদের অবস্থান তুলে ধরে। বিজ্ঞপ্তিতে ‘বাস্তবতা অস্বীকার করে’ টিআইবির গবেষণার তথ্যকে ‘অসত্য’ আখ্যা দিয়ে জামায়াতের বিবৃতি প্রদানের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তবে গবেষণা প্রতিবেদনটি ‘গুরুত্বসহকারে’ পর্যালোচনা করায় জামায়াতকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে।

গত ১ নভেম্বর টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ৯০খ(১)(খ)(আ) ধারা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের জন্য ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। তবে দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব পর্যালোচনায় এ বিধান পালনে বড় ধরনের ঘাটতি পাওয়া গেছে।

টিআইবি বলেছে, গবেষণায় সব দলের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি, নির্বাহী পরিষদ কিংবা কার্যনির্বাহী সংসদের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। সংস্থাটির মতে, এটি আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলের রুকন বা সদস্যদের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। তবে টিআইবির বক্তব্য, তাদের গবেষণায় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বা কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি পর্যালোচনা করা হয়েছে; জাতীয় কাউন্সিল, সম্মেলন কিংবা মজলিসে শুরায় নারীর সংখ্যা নয়।

সংস্থাটি আরও বলেছে, আরপিও, ১৯৭২-এ কোনো রাজনৈতিক দলের মোট সদস্যের কত শতাংশ নারী হতে হবে, সে বিষয়ে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। বরং নারী কর্মীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে কতজন অন্তর্ভুক্ত হবেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারের দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, মজলিসে শুরা বা দলের মোট সদস্যের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলে ধরে গবেষণার সমালোচনা করাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ’ এবং সত্যের অপলাপ’ বলে মনে করেছে টিআইবি।

নারীদের পৃথক কমিটি নিয়ে আপত্তি

টিআইবি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি সাংগঠনিক স্তরে সাধারণত একটি কমিটি থাকে, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে শুধুমাত্র নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্তরে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি স্তরে পুরুষদের জন্য একটি কমিটি এবং নারী কর্মীদের জন্য স্বতন্ত্র একটি কমিটি রয়েছে। একইভাবে নারী কর্মীদের স্বতন্ত্র মজলিসে শুরা বা কর্মপরিষদ রাখা হয়েছে। তবে নারীদের জন্য পৃথক কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য রাখা হয়নি।

সংস্থাটি বলছে, জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো নেতৃত্বস্থানীয় পদেও নারীদের অন্তর্ভুক্তি না করা চর্চা দেখা যায়। শুধুমাত্র নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি গঠনকে দলীয় কার্যক্রমে নারীদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি বোঝায় না। বরং এক্ষেত্রে নারীদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নারীদের এই স্বতন্ত্র কমিটিগুলোকে দলে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করা এক ধরনের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।

টিআইবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোনো আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। জামায়াতে ইসলামীর দাবি অনুযায়ী তাদের দলের ৪৩ শতাংশ নারী সদস্য থাকলে তাদের মধ্যে থেকে একজন নারী সদস্যকেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যদিও এ বিষয়ে জামায়াত তাদের বিবৃতিতে কোনো মন্তব্য করেনি।

গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারাও ‘সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’

জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারাও বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ বলে মনে করে টিআইবি।

সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে মেনে না নেওয়া; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য সকল নিয়মনীতি ও পন্থাকে প্রত্যাখ্যান করা; ইসলামি আকিদা পরিপন্থি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা; দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত পোষণ সাপেক্ষে অমুসলিম নাগরিকদের জন্য সহযোগী সদস্য বা সদস্যপদ দেওয়া; গঠনতন্ত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের জন্য ‘’সদস্য বা সহযোগী সদস্য’ পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত আরোপ; নারীকর্মীদের জন্য পৃথক বিভাগ বা কমিটি ও পৃথক কার্যক্রম পরিচালনা করা ইত্যাদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের (সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ - ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম, লিঙ্গ প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

টিআইবির মতে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সংস্থাটির গবেষণালব্ধ তথ্যকে ‘অসত্য’ বা ‘বিভ্রান্তিমূলক’ বলার সুযোগ নেই। সংস্থাটির বলছে, বিবৃতির মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী গবেষণা তথ্যকে অস্বীকার এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে দলের মধ্যকার প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি আরও জানায়, তাদের প্রতিটি গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সমাজবিজ্ঞানে অনুসৃত গবেষণাপদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং গবেষণায় তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত তথ্য বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বিধান, বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ে ক্রসচেকিংসহ সম্ভাব্য সব সূত্র থেকে যাচাই-বাছাই করে গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

একইভাবে, আলোচ্য গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বা মনোনীত প্রতিনিধি ও দলের নেতাকর্মী, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক ও গবেষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ও দলীয় দপ্তর থেকে সংগৃহীত তথ্য, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, গবেষণা প্রবন্ধ ও পুস্তক থেকে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad