ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রে জিম্মি রাষ্ট্রসংস্কার: টিআইবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রসংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, রাষ্ট্রসংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা ও সৎসাহসের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপসের কারণে কাঙ্ক্ষিত ভিত্তি তৈরি হয়নি। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাবে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পক্ষে বিবৃতিতে সই করেছেন আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
বিবৃতিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের চর্চা কেবল হাতবদল হয়েছে। সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রসংস্কারের বিষয়টি ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোট জনস্বার্থে রাষ্ট্রসংস্কারে সহায়ক ভূমিকা রাখার পরিবর্তে দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলো ও আমলাতন্ত্র শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারে রাষ্ট্রসংস্কার এবং জুলাই জাতীয় সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে নির্বাচনে জয়ী দলটির সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এ অবস্থান রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন এবং আইন প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগ এখন ক্ষমতাসীন জোটের একচ্ছত্র ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বর্তমান সরকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে, সেগুলো পাস করা হয়েছে। অন্যদিকে, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক অধ্যাদেশগুলো রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক শক্তির যোগসাজশে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রধান রাজনৈতিক দলের দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণে ‘এবার আমাদের পালা’ নীতির লাগামহীন চর্চা রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকার রাষ্ট্রসংস্কারের বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে।
বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সব রাজনৈতিক দল একমত হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে বিল পাস না করে সরকার ২০০৪ সালের আইনে ফিরে গেছে। এতে দুদকের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট থেকে উত্তরণের পথ রুদ্ধ হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ রহিত করে সম্প্রতি যে আইন পাস করা হয়েছে, তা প্রকৃত স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ঘটনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দিয়ে আইন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তার ভাষ্য, র্যাব বিলুপ্ত করার কথা বলা হলেও নতুন নামে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাশালী করা হয়েছে। অথচ দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সিংহভাগের জন্য সংস্থাটি দায়ী বলে পরিচিত। অন্যদিকে, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে সবাই একমত হলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের বিষয়েও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। বিবৃতিতে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সম্পদের বিবরণী প্রকাশ এবং নিয়মিত হালনাগাদের বিধান নিয়ে মতৈক্য হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর এ ধরনের নির্দেশনা বা চর্চার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনসহ ক্ষমতাকাঠামোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিণতি ভোগ করার পরও সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো এত অল্প সময়ের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে ভুলে গেল।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলসহ অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রণীত হয়েছিল। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে সরকারি দলসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তখন ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চার মোহে সরকারি দল সেই অভিজ্ঞতার বিপরীত পথে হাঁটছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটও দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।
গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নজিরবিহীন মতৈক্যের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল বলে মনে করে টিআইবি। রাষ্ট্রসংস্কারের লক্ষ্য অর্জনেও সব রাজনৈতিক দলের প্রতি একই ধরনের সদিচ্ছা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

















