চক্রের নেতৃত্বে সাবেক সেনা সদস্য, অপহৃতকে রাখত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে: পুলিশ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের ঘটনায় কক্সবাজার থেকে সাবেক র‍্যাব সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের ঘটনায় কক্সবাজার থেকে সাবেক র‍্যাব সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে অপহৃত এক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীকে কক্সবাজারের টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্য পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে তার দোকান থেকে তুলে নিয়ে যায় একটি চক্র। পরে তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

পুলিশের দাবি, চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সেনা ও র‍্যাব (বর্তমানে এসআরবি) সদস্য সুমন মুন্সি। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২১ সালে তাকে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কারাগারে থাকার সময় বিভিন্ন অপরাধীর সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। পরে তাদের নিয়ে ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন তিনি।

বাঁশখালীর পুঁইছড়ির প্রেমবাজার এলাকা থেকে গত ১৭ অক্টোবর অপহৃত হন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। গতকাল বুধবার সকালে তাকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনের বিষয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

পুলিশের ভাষ্য, চক্রটি কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে তারা অপহৃত ব্যক্তিদের আটকে রাখার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করত।

যেভাবে অপহৃত হন ব্যবসায়ী

পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর প্রেমবাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের দোকান মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজে ছিলেন হাসান। এ সময় কালো কটি পরা, মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ দেওয়া চার ব্যক্তি দোকানে আসেন। তাদের কটিতে এসআরবি লেখা ছিল।

ওই চার ব্যক্তি হাসানকে বলেন, “আমরা এসআরবি থেকে এসেছি। আপনার নামে মামলা আছে। আপনাকে যেতে হবে।” এরপর তাকে হাতকড়া পরিয়ে দোকান থেকে নিয়ে যান তারা।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অপহরণের প্রায় দুই ঘণ্টা পর হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ২০ লাখ টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।

পুলিশ সুপার জানান, অপহরণকারীরা যেসব নম্বর থেকে ফোন করেছিল, সেগুলো ছিল ভিওআইপি নম্বর। ফলে সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে ঘটনাস্থল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপহরণকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়।

মাসুদ আলম বলেন, “এসআরবি পরিচয়দানকারী চার ব্যক্তি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ব্যবসায়ী হাসানের দোকানে আসে। তাকে নিয়ে ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কিছুটা পথ গিয়ে একটা মাইক্রোবাসে ওঠে। এসব ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ।”

সংবাদ সম্মেলনে অপহরণের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাসান বলেন, “কয়েকটি গাড়ি পরিবর্তন করে আমাকে নিয়ে একটি বাড়িতে রাখা হয়। আমার পেটে অস্ত্র ধরে বলে, কোনো কথা বললে মেরে ফেলব। চোখ বন্ধ ছিল। হাত বন্ধ ছিল। যেদিন নিয়ে যায় সেদিন বলেছে, তোর বাড়িতে ফোন কর। আমাকে অনেক মারছে। আমি ম্যানেজারকে ফোন করে বলি, তোমার ভাবির কাছে ফোন নিয়ে যাও। টাকা জোগাড় কর।”

শারীরিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসান। তিনি জানান, অপহরণের দুই দিন পর রাতে তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অন্য একটি বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানেও তার চোখ ও হাত বেঁধে রাখা হয়, পায়ে পরানো হয় শিকল। পাঁচ দিনে মাত্র একবার তাকে খাবার দেওয়া হয়েছিল। চোখ ও হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে তাকে মারধর করা হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে যেভাবে উদ্ধার

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পর কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। মঙ্গলবার প্রথমে জয়নাল উদ্দিন জুনু নামের একজনকে আটক করা হয়। পরে কক্সবাজার থেকে সুমন মুন্সিসহ অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তারা একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে ছিলেন বলে জানান পুলিশ সুপার।

অপহরণে ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া কালো রঙের এসআরবি লেখা পাঁচটি কটি, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হাতকড়া উদ্ধার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হাসানকে টেকনাফের লেদা এলাকার ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়েই সেখানে থাকা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

মাসুদ আলম আরও বলেন, “তাদের দিয়ে ফোনে বলাই যে, মুক্তিপণের টাকা সব পেয়েছি এবং ভিকটিমকে এখন ফেরত দিতে চাই, তোমরা তাকে বের করে নিয়ে আস। আমরা গেইটে অবস্থান করছি। নিয়ে আসার পরে হাসানকে আমাদের (পুলিশের) মাইক্রোতে উঠানো হয়। তখন তার মুখ-চোখ বাঁধা ছিল।”

তিনি বলেন, অপহরণকারীরা হাসানকে তুলে নেওয়ার পর থেকে তার চোখের বাঁধন খোলেনি। উদ্ধারের সময়ও তার চোখ বাঁধা ছিল এবং হাত পেছনে বাঁধা ছিল।

সাবেক সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে ১৩ মামলা

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, চক্রটি অপহৃত ব্যক্তিদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রাখত। তাদের ধারণা, ক্যাম্পের ভেতরে নিয়ে গেলে পুলিশ বা অন্য কেউ সহজে উদ্ধার করতে পারবে না। তিনি বলেন, “অপহরণ করে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাখে। তারা মনে করে যে, ওখান থেকে তো পুলিশ বা কেউ গিয়ে নিয়ে আসতে পারবে না। সেটা তাদের জন্য সেইফ জায়গা।”

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক সেনা সদস্য সুমন মুন্সি অতীতে কক্সবাজারের উখিয়ায় র‍্যাবে কর্মরত ছিলেন। বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২১ সালে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর তিনি একাধিকবার কারাগারেও যান।

মাসুদ আলম বলেন, “জেলে যাওয়ার পরে অপহরণকারী গ্রুপের সাথে তার সখ্যতা হয়। সেখান থেকে তাদের একটা বড় চক্র তৈরি হয়। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর স্থায়ী বাসিন্দা হলেও সুমন মুন্সি থাকেন কক্সবাজারে। তার নেতৃত্বাধীন চক্রটি কক্সাবাজার থেকে পরিচালিত হয়।”

পুলিশ সুপার আরও জানান, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ অভিযান চালাতে এলে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। এ ধরনের ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করার পাশাপাশি প্রয়োজনে স্থানীয় থানার পুলিশের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad