বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে ৪ বছরে কার্বন নিঃসরণ ১৮% কমাতে হবে: জাতিসংঘ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে আগামী ৪ বছরে কার্বন নিঃসরণ অন্তত ১৮ শতাংশ কমানোর তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে আগামী ৪ বছরে কার্বন নিঃসরণ অন্তত ১৮ শতাংশ কমানোর তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী চার বছরে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড ন্যাশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনইপি) নতুন এক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে তাপমাত্রার এই সীমা যতটাসম্ভব কম ও অল্প সময়ের জন্য যেন অতিক্রম করে, সেই চেষ্টা এখনো সম্ভব।

নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব নীতির মধ্যে ব্যবধান নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারকে স্বল্পমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে দেশগুলো।

ইউএনইপির হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। এতেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেখা রেকর্ড তাপপ্রবাহের মতো ঘটনা ঘন ঘন ঘটতে পারে, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার ঝুঁকি কমবে।

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় ‘বাড়তি প্রচেষ্টা’র জন্য দেশগুলোকে বহু বছর ধরে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা নেওয়া হয়নি। সময়ক্ষেপণের কারণে লক্ষ্যটি অর্জনের সুযোগ এখন বন্ধ হয়ে গেছে।

তারপরও দেশগুলোকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কেন্দ্রীয় এই লক্ষ্য পরিত্যাগ না করার আহ্বান জানান অ্যান্ডারসেন। তার ভাষায়, ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। যত দ্রুতসম্ভব, যত অল্প সময়ের মধ্যে পারা যায়, আমাদের ফিরে আসার পথ খুঁজতে হবে।’

চীন বিশ্বের সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ, যে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে এসেছে। এতে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ আবার বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, সব সরকারেরই দায়িত্ব রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারীদের রাজনীতি বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। বিশ্বে উৎপাদিত জীবাশ্ম জ্বালানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আসে এই দুই দেশ থেকে। অথচ তাদের নাগরিকরাই তীব্র তাপ, দাবানল ও জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য প্রভাবে ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

গত বছরের নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকারগুলোও দুর্বল ছিল বলে জানিয়েছে ইউএনইপি। গত নভেম্বরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলোর নতুন অঙ্গীকার করার কথা থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ছিল।

ইউএনইপি বলছে, সব অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেও তাপমাত্রা প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। আর বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে তা বেড়ে ২.৮ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে।

বর্তমান হারে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ চলতে থাকলে প্রতি পাঁচ বছরে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও ০.১ ডিগ্রি করে বাড়ে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ১.৫ ডিগ্রির সীমা যত বেশি অতিক্রম করবে, জলবায়ুব্যবস্থায় অপরিবর্তনীয় বিপর্যয়কর পরিবর্তন বা ‘টিপিং পয়েন্ট’ সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে।

পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেন, সংকটের সমাধান মানুষের হাতের নাগালেই রয়েছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত বাড়ছে, অথচ সরকারগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট দ্রুত কমাতে পারছে না। প্রযুক্তি এগিয়ে গেলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব পিছিয়ে রয়েছে।

প্যারিস চুক্তির আওতায় ২০২৮ সালে নির্ধারিত ‘গ্লোবাল স্টকটেক’ প্রক্রিয়ায় দেশগুলোর অঙ্গীকার ও অগ্রগতি পর্যালোচনার কথা রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) চলতি সপ্তাহে তাদের পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সূচি নির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে। এতে সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দেশগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক ইয়োহান রকস্ট্রম বলেন, বর্তমান জাতীয় অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলেও ২০৩৫ সালে বৈশ্বিক নিঃসরণ বছরে প্রায় ৫০ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্যে পৌঁছাতে পারে। অথচ তা ৩৫ গিগাটনের নিচে থাকা প্রয়োজন। তার মতে, এই ব্যবধান কমানো বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাবের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রশ্ন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad