নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে আপত্তি, সুনামগঞ্জে বন্ধ বাউল গানের আসর

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে আপত্তি, সুনামগঞ্জে বন্ধ বাউল গানের আসর

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে স্থানীয় কয়েকজনের আপত্তির মুখে বন্ধ হয়ে গেছে বাউল গানের আসর। মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী। এতে স্থানীয় দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নিলার গান পরিবেশনের কথা ছিল। তবে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্য রক্ষার যুক্তিতে অনুষ্ঠানটি বন্ধের দাবি জানিয়ে থানায় লিখিত আবেদন করেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।

এর আগে একই উপজেলায় বিরোধিতার কারণে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও স্থগিত করা হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নারীদের খেলাধুলা নিয়ে এমন দুটি ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে।

বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন শওকত আলী। এ জন্য পোস্টার লাগানোর পাশাপাশি পাশের আকিলশা বাজারের একটি ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান থেকে মাইকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনা হয়েছিল।

তবে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানিয়ে বুধবার (২১ অক্টোবর) দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু। তারা স্থানীয় গ্রামবাসীর পক্ষে আবেদনটি করেন। এরপর অনুষ্ঠানটি আর আয়োজন করা হয়নি এবং বাড়ি থেকে মাইকসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

আবেদনে বলা হয়, হাতিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। সেখানে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর অলির মাজার এবং অনেক আলেম-ওলামার বসবাস রয়েছে। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের অনুষ্ঠান হলে এলাকায় উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আবেদনকারীরা। গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তারা।

আবেদনকারী কামরুল হাসান মিটু বলেন, তাদের গ্রামে আগে গানবাজনার আয়োজন হলেও বর্তমানে এ ধরনের অনুষ্ঠান হয় না। গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসা রয়েছে এবং প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল হয়। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের আয়োজনকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ কারণে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে থানায় আবেদন করা হয়।

আয়োজক শওকত আলী বলেন, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে সীমিত পরিসরে বাড়িতে গানের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এ নিয়ে আপত্তি ওঠার পর এবং থানা থেকে ফোন পাওয়ার পর সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিবেচনা করে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

ঘটনাটিতে উদ্বেগ জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় উদীচীর সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত দিরাইয়ে বাউল গানের আসর বন্ধ এবং মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ স্থগিত হওয়ার মতো ঘটনা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নারীদের খেলাধুলার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জাহাঙ্গীর আলমের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার যুক্তিতে কোনো পক্ষ আপত্তি জানাতে পারে। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিও আলোচনায় থাকা জরুরি। মতপার্থক্যের কারণে যেন কোনো আয়োজন বন্ধ না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ ও আইনসম্মত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, গান, সাহিত্য, খেলাধুলা ও শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে সমাজের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়। এসব কর্মকাণ্ড বারবার বাধার মুখে পড়লে মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতা প্রকাশে নিরুৎসাহিত হতে পারে। কোনো আয়োজন নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, তবে আলোচনা ও যুক্তির পরিবর্তে চাপ প্রয়োগ করে অন্যের মতপ্রকাশ বন্ধ করার প্রবণতা বাড়লে স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাউল গানকে বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কমে গেলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ঐতিহ্যটির পরিচয় ও সংযোগ দুর্বল হতে পারে। বিরোধ এড়াতে কোনো পক্ষকে নিজের অধিকার বা পছন্দ ছেড়ে দেওয়ার বদলে পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ ও আইনের শাসনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন।

দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, গানের অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি ওঠার পর পুলিশ আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে। পরে আয়োজকেরা নিজেরাই গানবাজনা করবেন না বলে আশ্বস্ত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগের বিষয়টি মীমাংসা হয়।

এর আগে গত ৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থানীয় একটি পক্ষের বিরোধিতায় স্থগিত করা হয়। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের নারী খেলোয়াড়দের মধ্যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল।

স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া তখন জানিয়েছিলেন, ম্যাচের আগের রাতে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে খেলা বন্ধের দাবি জানান। পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়।

ম্যাচের বিরোধিতাকারী মাওলানা শরিফ উদ্দিন নিজেকে ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র সভাপতি পরিচয় দিয়ে নারীদের মাঠে খেলাধুলার আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বাইরে থেকে মেয়েদের এনে খেলার আয়োজন এবং মাঠে তাদের উপস্থিতি তিনি মেনে নিতে পারেন না বলে জানান। এ ধরনের খেলা দেখলে যুবকদের চরিত্রের অবনতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে, আয়োজকদের বক্তব্য ছিল, মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতেই সাধারণ প্রীতি ম্যাচটির আয়োজন করা হয়েছিল।

দিরাইয়ে পরপর বাউল গানের অনুষ্ঠান বন্ধ ও মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ স্থগিত হওয়ার ঘটনা ঘিরে এখন ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজন কীভাবে নির্বিঘ্নে করা যায়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad