‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়ে ভুক্তভোগী’— সাথী আক্তার কারাগারে, মামলা নিয়ে প্রশ্ন

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
ফেসবুক লাইভের পর সাথী আক্তারের দোকানের সামনে বিক্ষোভ হলে তাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে তাকে। ছবি: সংগৃহীত
ফেসবুক লাইভের পর সাথী আক্তারের দোকানের সামনে বিক্ষোভ হলে তাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে তাকে। ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে বিএনপি সরকার ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা ময়মনসিংহে নারী ব্যবসায়ী সাথী আক্তারকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বাদী হয়ে পুলিশের করা মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা।

সাথী আক্তারকে হেফাজতে নেওয়ার পর তাকে ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছিল পুলিশ। ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান জানিয়েছেন, সোমবার রাতে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতে সাথী আক্তারের পক্ষ থেকে জামিনের আবেদন করা হয়নি। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মোস্তাছিনুর রহমান জানিয়েছেন, এ মামলার শুনানির জন্য বুধবার দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।

গ্রেপ্তার সাথী আক্তার ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাসিন্দা। সেখানকার একটি মার্কেটে পার্লার রয়েছে তার। তার দুটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আনুমানিক ২৪ হাজার টাকা মূল্যের কারেন্টের তার চুরি হওয়ায় গত রোববার ফেসবুকে দুটি লাইভ করেন সাথী। দুটি ভিডিওতেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বাড়ি থেকে মোবাইল, স্যান্ডেলসহ নানা জিনিস চুরির অভিযোগও করেন তিনি।

‘দেশে কেউ নিরাপদে নেই’ বলে ক্ষোভ জানিয়ে সাথী লাইভে বলেন, এখন আমাদের কিছু করার নাই, ব্যবসায়ীদের কোনো নিরাপত্তা নাই। কোনো মানুষই নিরাপদ না এখন। এই ২৬ সালেই এতো কিছু ঘটনা ঘটল। জুতা দিয়া কপালে মারি। কারণ এই ২৬ সালে আইসা আমরা যে ভুক্তভোগী হইছি তা বলার মতো না।

সাথী আক্তার আরও বলেন, ২৬ সালে সরকাররে আমি এই হাত দিয়া ভোট দিছিলাম না, এই আঙুলে বাইড়াই, এই যে এইরকম। বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে এই ভুক্তভোগী। ২০২৬ সালের আগে কখনো এমন ভুক্তভোগী হইনি।

লাইভের পর সাথী আক্তারের প্রতিষ্ঠানের সামনে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ও প্রতিবাদ জানান। এ সময় সাথী আক্তারের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। খবর পেয়ে ভালুকা মডেল থানা পুলিশের একটি দল সেখানে পৌঁছে সাথী আক্তারকে হেফাজতে নেয়।

ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাথী ইসলামের লাইভের প্রতিবাদ করতে যারা গিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে সাথী আক্তার মারমুখী আচরণ করেছেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেছেন। তিনি কোনো আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।

এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ জনতা সাথী আক্তারের দোকান ভাঙচুর করতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয় বলে জানান ওসি জাহিদুল। তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারা মূলত প্রতিরোধমূলক। সাথী আক্তারের আচরণের কারণে লোকজন আরও উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিল এবং একপর্যায়ে সেখানে ভাঙচুর-সড়ক অবরোধের মতো ঘটনা ঘটতে পারত। এ কারণেই তার বিরুদ্ধে ১৫১ ধারায় মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার মাধ্যমে সাথী আক্তারকে ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রক্ষা করেছে দাবি করেছে। লাইভে তার দেওয়া বক্তব্য নয়, বরং তার বক্তব্য ঘিরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠতে পারত— এমন আশঙ্কা থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১৫১ ধারায় মামলা করার কথা জানিয়েছে। তবে পুলিশের এমন দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীসহ মানবাধিকার কর্মীরা।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট বার্তা এসেছে— সরকারের বিপক্ষে হলে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অবারিত নয়। পুলিশও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে কাজ করতে আগ্রহী— এ ঘটনা থেকে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

মনজিল মোরসেদ বলেন, পুলিশের এই কার্যক্রম মবকারীদের পক্ষেই গেল। ওখানে যারা মব করতে গিয়েছিল, পুলিশের তাদের ধরার কথা ছিল, থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারত, কারা কেন সেখানে গেছেন। তা না করে বরং সাথী আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ ‘সম্পূর্ণ বেআইনি’ কাজ করেছে বলে মনে করছেন তিনি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad