এনসিপির সমাবেশে ২ মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, প্রধানমন্ত্রীকে ‘ঘেরাও’য়ের হুমকি

দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। দুই মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে দেশ জুড়ে মিছিল করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘ঘেরাও’ করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এনসিপির গণবিক্ষোভ সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দলটির প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই দুজন মন্ত্রীই তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে দেশের সর্বত্র আমরা মিছিল করব। সেই মিছিল নিয়ে আমরা জনাব তারেক রহমানকে (প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান) ঘেরাও করে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ।’

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাহাজানিতে সবার জীবন আজ নাজেহাল। দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। দেশের সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা দিতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি বর্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওপর।
‘তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। গণভোটের গণরায় বাদ দিয়ে তিনি সংবিধান কাটাছেঁড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। চলমান নৈরাজ্য ও গুম–খুনের দায় নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, দুজনই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন,’— বলেন নাহিদ ইসলাম।
‘নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশ পরিচালনায় সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, ‘কীভাবে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব কায়েম করা হবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। আমরা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। কিন্তু জনগণের সামনে আমাদের প্রতিশ্রুতি, পতিত স্বৈরাচার এবং এই নব্য স্বৈরাচার— এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশা আল্লাহ।’

আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে শুনছি পতিত স্বৈরাচার নাকি আসবে দেশে! আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না।...তাই বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
সীমান্তে হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নির্যাতন এবং দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার ভারতের চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারবে না। জাপান সফরে গিয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতকে অবৈধ করিডর দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নাহিদ বলেন, এ ধরনের কোনো করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।
গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আগামী ডিসেম্বরে চুক্তিটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে নতুন করে করা না হলে বাংলাদেশের জনগণ আবারও মাঠে নামবে। ‘এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না’।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলের প্রার্থী আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা–৮ আসনে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল। ইনশা আল্লাহ, এবার আমরা তাকে হারতে দেব না। আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পনা করে নির্বাচনের বাইরে রেখে যারা ভেবেছিল, গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেবে, তারাও ইনশা আল্লাহ এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজিত হবে।’
জ্বালানির দাম নিয়ে প্রশ্ন আখতারের
সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এলপিজির দাম এক হাজার টাকা হলেও বাংলাদেশে তা কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কলকাতায় কি ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না? এ বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে জবাব চান তিনি।
আখতার হোসেন সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান। পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার। বক্তব্য দেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আকরাম হুসাইন, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদারসহ অন্য নেতারা।
শাহবাগে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর জমায়েত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিকে মাঠপর্যায়ে এনসিপির অন্যতম বড় কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাবেশে যোগ দিতে বেলা তিনটার আগে থেকেই বাংলামোটরে দলীয় কার্যালয়ের নিচে ও শাহবাগে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। তাদের অনেকে বাসে করে আসেন। কর্মসূচির আগে সপ্তাহজুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। পরে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা যোগ দেন। পৌনে চারটার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং সোয়া চারটার দিকে আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে উত্তর শাখার বড় দুটি মিছিল সমাবেশে প্রবেশ করে।
বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি।
















-0c9ef7-256x144.webp)
-483af6-256x144.webp)

-68ed53-256x144.webp)