বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন সম্ভব নয়: নাহিদ ইসলাম

রাজবাড়ী প্রতিনিধি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন সম্ভব নয়: নাহিদ ইসলাম

বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের দলীয়করণ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অবাধ নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হবে।

বুধবার দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভার রজনীগন্ধা মিলনায়তনে পাঁচ জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আগে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে, এমনটা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে না। এই কয়েক দিনে সরকারদলীয় অন্তঃকোন্দলে কয়েকশ মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন দলীয়করণ হয়েছে এবং ক্রমাগত হচ্ছে।’ তাঁর ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়া হয়েছে এবং কমিশনকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দেওয়া হবে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে দলটি পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতা জীবন ও রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করেছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই আদর্শিক। দলটি পরাজিত হলেও বিভিন্ন জায়গায় ফ্যাসিবাদের দোসররা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকবে বলেও জানান এনসিপির আহ্বায়ক।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ একদিকে, স্বৈরাচার একদিকে, আরেক দিকে নতুন চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজ শক্তি—এরা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।’ তাঁর মতে, এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।

আইজিপির মন্তব্যের সমালোচনা

সাংবাদিকদের নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের আপত্তিকর মন্তব্যের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পুলিশ এ ধরনের কথা বলতে পারে না। পুলিশের দায় সাংবাদিকদের ওপর চাপানোর বদলে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা উচিত।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের তথ্যে ভুল থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে পুলিশের প্রধান দায়িত্বশীল পদে থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়।

মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একটি অংশ এর সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মাদক সিন্ডিকেট টিকে থাকতে পারে না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগে আওয়ামী লীগ এবং এখন বিএনপি এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। সিন্ডিকেট ভেঙে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে মাদক নির্মূল সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ

দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের ওপর গুলি চালানো ও মারধরের ঘটনা ঘটছে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করেনি। এতে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে এবং সত্য তুলে ধরতে গিয়ে সাংবাদিকেরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের সমালোচকদের বের করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের পাশে রয়েছেন তাঁরা। এসব বিষয় সংসদেও তুলে ধরা হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতে সংস্কার হয়নি

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এ খাতে কার্যকর কোনো সংস্কার হয়নি। ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থাও এখনো ফিরে আসেনি। মানুষ কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে আমানত রাখতে আস্থা পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়নি। ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর সিদ্ধান্তও আসেনি। বরং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঋণখেলাপিরা রয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াবে না এবং জনগণের আস্থাও ফিরবে না। রাজনৈতিক সহযোগিতায় ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে এ খাতের সংকট কাটবে না।

স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়বে এনসিপি

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ১১ দলীয় জোট জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে সংসদে বিরোধী দলীয় জোট হিসেবে কাজ করছে। গণভোটের দাবি ও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে জোটগত কর্মসূচি থাকলেও এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি, নীতি-আদর্শ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আলাদা।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় স্বার্থে এবং সরকারের গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা একসঙ্গে থাকতে পারেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নিয়ে সারা দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলাই এনসিপির লক্ষ্য।

প্রেস ব্রিফিং শেষে পাঁচ জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন এনসিপির নেতারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা বিভাগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান অপু এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইয়েদ জামিলসহ পাঁচ জেলার নেতারা।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad