এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ ‘বাধ্য হয়ে’— বললেন জামায়াত আমির

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় সরকার ‘বাধ্য হয়ে’ সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘রাতের অন্ধকারে রাড্ডা ক্লিনিক দখলের ঘটনায় অবশেষে সরকার ও সরকারি দল বাধ্য হয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।’

পোস্টে তিনি আরও লেখেন, শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলেই হবে না, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এত বড় অপকর্মের জন্য শুধু সাংগঠনিক পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়। কালপ্রিটদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দেশবাসী দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য আইনি পদক্ষেপ দেখতে চায় উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির আরও লেখেন, ‘একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও লুণ্ঠিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের দায়িত্বও সরকারকে পালন করতে হবে।’

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ছালেহ শিবলী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, লিখিত নির্দেশনার মাধ্যমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে মিষ্টিকে বলা হয়েছে।

পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মিষ্টি। দুপুর দেড়টার পর স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে কয়েক মিনিট অবস্থানের পর বেরিয়ে আসেন তিনি। তবে সেখানে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্পিকারের কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মিষ্টি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই। স্পিকারের দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে আগামীকাল সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সংসদ ভবনের টানেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মিষ্টি বলেন, ‘আমাকে স্পিকার ডেকেছেন, তার সঙ্গে দেখা করেছি।’ পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে বলেন, ‘তদন্ত হোক। বিএনপির সিদ্ধান্ত যেটা হবে, তা হবে।’

গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন। পরে মূল ফটক ভেঙে ভারী যন্ত্র দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনের বিভিন্ন অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআইয়ের টিকা, টিকা প্রদানের রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার সরঞ্জাম, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন মালপত্র নিয়ে যায়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ লেখা ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার অভিযোগ করেন, ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে ওই ভাঙচুর চালানো হয়েছে। তার দাবি, এতে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি শাহ আলী থানায় মামলা করেন।

ওই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা এলাকায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিষ্টি।

মামলায় হানিফ মিয়া (৫০) নামে একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য। এ ঘটনায় করা মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হামলা ও ভাঙচুরে মিষ্টির সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। তার স্বামী প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকার একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মিষ্টি ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

এর আগে বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে তিনি ফেরদৌসী আহমেদের নাম উল্লেখ করেননি।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় নির্মোহ তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলে যারা অপরাধী হিসেবে উপস্থিত ছিল, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তা আমলে নেওয়া হবে না।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতেও সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বুধবার সংগঠনটির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে যুবদলসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকটি পর্যায়েও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের গরিব ও অসহায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। হামলা ও ভাঙচুরের পরও সীমিত পরিসরে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা চালুর চেষ্টা চলছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement