মিষ্টি, গাজী নজরুল, আখতারুজ্জামান— এরপর কে?

দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা অভিযোগের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপে তিনটি নাম সামনে এসেছে— বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং দলটির নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত হলেও গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন, আর আখতারুজ্জামান একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন রিমান্ডে। তবে তিনজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, ব্যবস্থা ও আইনি অবস্থান এক নয়।
মিষ্টির বিরুদ্ধে রাড্ডা সেন্টারে হামলা-ভাঙচুরে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তাধীন। গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে, যে মামলায় তিনি এখন কারাগারে। আর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও দায়িত্বরত এক কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ কোনো একটি ঘটনা বা কয়েকজন নেতাকর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয় বা পদ-পদবি বিবেচনায় না নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
সরকারের পক্ষ থেকেও দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। মিষ্টি, গাজী নজরুল ও আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর তাই সামনে এসেছে নতুন প্রশ্ন— এরপর কে?
রাড্ডাকাণ্ড: মিষ্টির পদত্যাগ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেছেন। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর আলোচনায় আসে তার নাম।
শপথ নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে— এ ধরনের অভিযোগ বা ঘটনায় দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে কীভাবে এগোবে? প্রশ্নটি এখন শুধু বিএনপির ভেতরে নয়, বিরোধী দল ও সামাজিক পরিসরেও আলোচিত হচ্ছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। কেন্দ্রটির জমি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে দুই শতাধিক লোক ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডে’র সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ওই সমিতির সঙ্গে কেন্দ্রটির জমি নিয়ে পুরোনো বিরোধ ছিল।
২০০৬ সালে ওয়ার্ড কমিশনার থাকাকালে মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। জমি বরাদ্দের আবেদনেও তার সই ছিল। হামলার ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াও রয়েছেন। এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি শুরু থেকেই ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, ওই সমিতির সঙ্গে বর্তমানে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় মিষ্টির সম্পৃক্ততা নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তার ভূমিকা তদন্তাধীন এবং সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না।
এর মধ্যে গত বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়, যে কমিটিতে মিষ্টি ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক। একই দিনে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এ ছাড়া বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসে।
পরদিন দুপুরেই ছালেহ শিবলী জানান, মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুরের দিকে মিষ্টি সংসদ সচিবালয়ে গিয়ে স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন। পরে বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক জরুরি ব্রিফিংয়ে জানান, মিষ্টি তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সংসদ সচিবালয় সেদিনই তার সংসদ সদস্যপদটি শূন্য ঘোষণা করে। ওই আসনে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
মিষ্টির পদত্যাগ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের জন্য অবিলম্বে আত্মশুদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ উদ্যোগ যেন শুধু এ ঘটনায় জড়িতদের ঘিরে সীমিত না থাকে।’
রাড্ডাকাণ্ডের পর সরকারের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ড. ইফতেখারের মূল্যায়ন, ‘প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটা ঠিকই আছে। যাদের নাম আলোচনায় এসেছে, যারা সরাসরি জড়িত, তাদের অপসারণ করা হচ্ছে বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর ওপর ভিত্তি করে আরও কৌশলগতভাবে দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে।’
কারাগারে থেকেও এমপি গাজী নজরুল
মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনাকে তুলনা করা হচ্ছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটির সঙ্গে। গত জুলাইয়ে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তে’র একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াত সাংগঠনিক তদন্ত করে। তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে ২২ জুলাই তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরদিন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে বহিষ্কারের তথ্য জানিয়ে চিঠি দেয় জামায়াত।
এরপর ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে।
আট দিনের রিমান্ড শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর করেন। একই দিন মামলার বাদী আপসনামা দেন। তিনি বলেন, ‘সন্দেহবশত’ মামলা করেছিলেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, এ ধারার মামলা আপসযোগ্য নয়। আদালতও আপসনামা আমলে নেননি। বয়স ও নারী বিবেচনায় গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা জামিন পেয়েছেন।
মামলায় কারাবন্দি হলেও গাজী নজরুল ইসলাম এখনো সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল আছেন। এ প্রসঙ্গে সাংবিধানিক নিয়ম উদ্ধৃত করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, দল বহিষ্কার করলে সংসদ সদস্যপদ যায় না। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও ব্যাখ্যা করেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সদস্যপদ হারানোর কারণ দুটি— দল থেকে পদত্যাগ এবং সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট। গাজী নজরুল এর কোনোটিই করেননি।
গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানের সমালোচনা করে ড. ইফতেখার রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে সেক্সটর্শনের মতো অভিযোগ এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে দলটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চুপ। অথচ তিনি এখন সাবেক হলেও দলটির এমপি ছিলেন এবং এখনো সেই হিসেবে তার একটি পদ আছে। এ অবস্থায় জামায়াতের উচিত আরও স্পষ্টভাবে নিজেদের অবস্থান খোলসা করা। তারা তা করছে না। এতে মনে হচ্ছে, একদিকে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে নির্বাচনি এলাকার রাজনীতিকেও হাতের কাছে রাখতে চাওয়া হচ্ছে।’
এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতারও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। বলেন, ‘বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় নৈতিক স্খলনের কারণে কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয় না। দুই বছর বা তার বেশি সশ্রম কারাদণ্ড হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়। এর আগে নির্বাচিত সংসদ সদস্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে কেউ তাকে পদত্যাগ করাতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটিই আমাদের আইনি সীমাবদ্ধতা। এর মাধ্যমে নৈতিকতার সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া আমি গ্রহণযোগ্য মনে করি না।’
বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা: রিমান্ডে আখতারুজ্জামান
বৃহস্পতিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট ও লাগেজ পেতে দেরি নিয়ে যাত্রীদের ক্ষোভের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় আলোচনায় আসেন জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। তিনি কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন। গত ডিসেম্বরে তিনি জামায়াতে যোগ দেন।
বিমানবন্দরের ওই ঘটনায় হওয়া মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে প্রকাশ্যে হুমকি দেন, বিমানমন্ত্রী সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করেন এবং ভিডিও ধারণে নিষেধ করায় এক নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে লাঞ্ছিত করেন।
শুক্রবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন শনিবার তাকে আদালতে তুলে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলাটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে তা প্রত্যাহার এবং তাকে অবিলম্বে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিযোগের ধরন ও আইনি অবস্থান এক নয়
তিনটি ঘটনাকে একই ধারায় দেখার সুযোগ নেই। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে রাড্ডাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না হলেও রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াত নেতা ও সংসদ সদস্য গাজী নজরুল দল থেকে বহিষ্কৃত। তার এবং মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা দুটি এখনো বিচারাধীন। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘ঘটনাগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।’
তার ভাষ্য, বিএনপির সাবেক এমপি মিষ্টির বিষয়টি ‘ব্যক্তিগত ও পার্শ্বস্থ সন্ত্রাস বা দখলবাজি’র কারণে পদ হারানোর ঘটনা, আর আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের ঘটনায় ‘কিছু বাড়াবাড়ি’ করেছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ড. আবদুল লতিফ মাসুমের মতে, ‘বাড়াবাড়ি করার কারণেই সরকার আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ ভিন্ন বিষয়। রাড্ডার ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান। ফলে ঘটনা দুটি মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না।’
এরপর কে?
মিষ্টি, গাজী নজরুল ও আখতারুজ্জামান ছাড়া আর কোনো সংসদ সদস্য বা রাজনীতিকের বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ‘এরপর কে’— এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো নাম এখন সামনে নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কেউ চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ফলে আগাম করে কোনো ব্যক্তির নাম বলার সুযোগ নেই।
এই আলোচনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নামও এসেছে, তবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ডিএমপির এক যুগ্ম কমিশনার বলেন, ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের কারণ জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর মিছিল শেষে পাটওয়ারী বলেছিলেন, সরকার তিন দাবি মানলে ঢাকায় আর ককটেল বিস্ফোরণ ঘটবে না।
পরে ২৮ সেপ্টেম্বর ডিএমপির ওই যুগ্ম কমিশনারের বক্তব্যের প্রতিবাদে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতা নিয়ে এমন মন্তব্য পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। একই দিন তিনি রাড্ডা প্রসঙ্গ তুলে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যর্থ বলেন।
এদিকে এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গত ২৭ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সমালোচনা করেন। পরে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পদের উৎস জানতে চেয়ে আরেক পোস্ট দেন।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক মুখ্য সংগঠক সারজিস এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান ‘সমকামী ট্রান্স অ্যাক্টিভেস্টদের সাথে মঞ্চ শেয়ার করছেন’ অভিযোগ তুলে ফেসবুকে কড়া সমালোচনা করেছেলেন। পরে তার সেই দাবি ‘মিসলিডিং’ প্রমাণিত হয়েছে।
এনসিপি নেতাদের এসব ‘ফেসবুক অ্যাক্টিভিজিম’কে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হিসেবেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এসব বক্তব্য নিয়ে কোনো মামলা বা তলবের তথ্যও নেই। তবে গত জুলাইয়ে এনসিপি নেতা নুরুজ্জামান কাফির বিরুদ্ধে স্কুলের জমি দখল ও চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। আদালত থানাকে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। অন্যদিকে কাফি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এনসিপি নেতারা এই নজরদারির আওতায় আসবেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘সরকার যদি কখনো অসহিষ্ণু হয়ে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, তবে তা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে।’
‘তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দলগুলোকে তাদের অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তার স্বার্থেই এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে সামাল দিতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আর এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ,’— যোগ করেন তিনি।
চাপ কোথা থেকে আসছে?
মিষ্টির পদত্যাগের পেছনে সামাজিক ও গণমাধ্যমের চাপের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। একই সপ্তাহে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ইসিবি এলাকার স্টুডিওতেও হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির সঙ্গে জমি-বিরোধের বিষয়টি রয়েছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘সেখানে চাঁদাবাজির প্রমাণ নেই।’ এ ঘটনায় ১৩ জনের নামে মামলা হয়েছে এবং কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে কয়েকজন রিমান্ডে আছেন। তবে রাড্ডার ঘটনার সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ নেই।
এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রচলিত নাগরিক পরিসরের আলোচনার সঙ্গে ইনফ্লুয়েন্সার ও ডিজিটাল পরিসরের চাপ যুক্ত হয়ে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ ও চাহিদা তৈরি করছে।’ তার মতে, ‘এতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে, যা ইতিবাচক।’
চলমান পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের পুরনো দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, পরিস্থিতি এখন এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে যে সংসদ সদস্য ও সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধির জন্য নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ হওয়া উচিত। এ কথা শুধু সরকারি দলের জন্য নয়, সব রাজনৈতিক দলের জন্য প্রযোজ্য।’
উত্তর এখনো নেই
আপাতত পরিস্থিতি এ রকম— মিষ্টি সংসদ সদস্য পদ ছেড়েছেন, তবে রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগের তদন্ত শেষ হয়নি। গাজী নজরুল কারাগারে থাকলেও সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল আছেন। আর আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ড শেষে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি।
তিনটি ঘটনায় তিন ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কারও ক্ষেত্রে এসেছে পদত্যাগ, কারও ক্ষেত্রে দলীয় বহিষ্কার, আবার কারও ক্ষেত্রে হয়েছে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড। কিন্তু এর পরের ধাপ কী হবে, তা নির্ভর করছে তদন্ত, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
তাই ‘এরপর কে?’— এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে এই প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়?
সেই উত্তরই হয়তো ঠিক করবে, মিষ্টি, গাজী নজরুল ও আখতারুজ্জামানের পরের অধ্যায় কোথায় গিয়ে থামে— আর ‘এরপর কে?’ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি নামের খোঁজে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি রাজনৈতিক জবাবদিহির আরও বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে।









-adbf69.jpg)


















